Last Updated on 19 hours by zajira news
অনলাইন ডেস্ক, জাজিরা নিউজ: রাজধানীর মাতুয়াইলে অবস্থিত দেশের সবচেয়ে বড় ল্যান্ডফিলটি (বর্জ্যের ভাগাড়) প্রায় ছয় দিন ধরে জ্বলছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) আওতাধীন এ ল্যান্ডফিল থেকে বর্জ্য পোড়া ধোঁয়া ডেমরা, কোনাপাড়া, যাত্রাবাড়ী, জুরাইনসহ পার্শ্ববর্তী এলাকা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে রাজধানীর মতিঝিল পর্যন্ত। এতে শ্বাস-প্রশ্বাসের কষ্টে ভুগছে ঐসব এলাকার বাসিন্দারা।
ডেমরার বাসিন্দা শফিউল বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে অবস্থা খুবই খারাপ। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। অক্সিজেন পাওয়া যাচ্ছে না ঠিকঠাক। সারাক্ষণ নাকে পোড়া গন্ধ লাগে। আসলে আমরা সাধারণ নাগরিকরা বিষে তিলে তিলে মরে যাচ্ছি, আমাদের কথা কোনো সরকারই ভাবছে না।’
ল্যান্ডফিলে কর্মরত শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক দিন ধরে অল্প অল্প করে ল্যান্ডফিলের বর্জ্যে আগুন লাগা শুরু হয়। গত শুক্রবার থেকে আগুনের তীব্রতা বাড়ে। এতে ধোঁয়ার পরিমাণও বেড়ে যায়। আশপাশ এলাকাগুলোতে তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে ময়লার স্তূপের ওপর ভারী ধোঁয়ার কুণ্ডলী। এর মধ্যেই অল্প অল্প করে আগুন জ্বলছে।
ল্যান্ডফিলের ভেতরে থাকা একজন বলেন, ‘আমরা এখানে ময়লা টোকাই। তিন দিন ধরে কাজে আসতে পারিনি। চোখ প্রচণ্ড জ্বালা করে। আজকে বাধ্য হয়ে কাজে এসেছি। একদিন কাজে না এলেই তো খাওয়ার মতো পয়সা জোগাড় হয় না।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, গত শনি ও রবিবার রাতে আগুনের তীব্রতা অনেক বেড়ে যায়। ১০-২০ কিলোমিটার দূর থেকেও মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলের বর্জ্যের দাউ দাউ আগুনের লেলিহান শিখা দেখা যাচ্ছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগুনের ছবি ও এলাকাবাসীর দুর্ভোগের কথা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন জন তাদের পোস্ট ও মন্তব্যে জানান, তাদের নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সালমান সাদ নামে একজন ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘পুরো যাত্রাবাড়ী এলাকা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। ঘরের ভেতর বসেও শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।’ ল্যান্ডফিলে বর্জ্য পোড়ানোর ধোঁয়া মাতুয়াইল, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, কোনাপাড়া, স্টাফ কোয়ার্টার, সাইনবোর্ড, মুগদা, মান্ডা, মানিকনগর, সায়েদাবাদ ও জুরাইন পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘সরকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ফেল করার কারণে সাধারণ মানুষ এখন ভুগছে। তারা ল্যান্ডফিলের আগুনের ধোঁয়ায় নিশ্বাস নিতে পারছে না। কিন্তু এ বর্জ্যের মধু খাওয়ার জন্য তো রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা, কাউন্সিলররা, সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা কাড়াকাড়ি করেন। এ বর্জ্য দিয়েই তো সবার পকেট ভরে। কিন্তু জনগণকে কেন সেবা দেওয়া হচ্ছে না, এটা আমাদের প্রশ্ন। সঠিকভাবে যদি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা যেত, যদি এখানে দুর্নীতি, লুটপাট না হতো, তাহলে কিন্তু আমাদের বর্জ্য সম্পদে রূপান্তরিত হতো অনেক আগেই। নতুন সরকার এসেছে। আমরা আশা করব তারা জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রতি বিশেষ নজর দেবে।’
পরিবেশবিদরা বলছেন, ল্যান্ডফিলে নিজ থেকে আগুন লাগার সুযোগ তেমন নেই। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট লোকেরা প্রথমে নিজেরা আগুন দেয় বর্জ্য পোড়ানোর জন্য। তারপর সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আর এ বিষয়ে তাদের কিছু জিগ্যেস করলে তারা বলেন যে, ‘আগুন নিজ থেকে লেগে গেছে। এটা অসম্ভব কথা। আমাদের দেশে ল্যান্ডফিলে পচনশীল আর শুকনো সব ধরনের বর্জ্য একসঙ্গে জমা হয়। সেখানে মিথেন গ্যাস উত্পন্ন হয়। কোনো সভ্য দেশে এভাবে জগাখিচুড়ি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নেই। ঐ দেশগুলোতে বাসা থেকে বর্জ্য সংগ্রহের সময়ই পচনশীল আর অপচনশীল বর্জ্য আলাদা করে ফেলা হয়। এটা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রাথমিক কাজ। আজ এত বছরেও এ কাজটাও করতে পারছে না সরকার। কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি।
ল্যান্ডফিলে আগুন ও ধোঁয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘ল্যান্ডফিলের আগুন নেভানো হয়েছে, ধোঁয়া এখনো আছে, আমরা কাজ করছি। আমরা বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এখনো অনেক পিছিয়ে। সোর্স থেকেই বর্জ্য পৃথক্করণ সম্ভব হচ্ছে না। বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করার জন্য আমরা এরই মধ্যে কোরিয়ান একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছি। কাজ শুরু হয়ে যাবে এক-দেড় মাসের মধ্যে।


