সময়ের জনমাধ্যম

‘মাত্র ৩০ কেজি ওজনের ১১ বছরের একটা শিশুর পেটে বাচ্চা, অভিযুক্ত মাদ্রাসা শিক্ষক গ্রেপ্তার

ছবি: প্রতিকি

Last Updated on 1 day by zajira news

অনলাইন ডেস্ক, জাজিরা নিউজ: নেত্রকোণার মদন উপজেলায় এক মাদ্রাসাছাত্রীকে ধর্ষণ এবং তাকে অন্তঃসত্ত্বা করার অভিযোগে অভিযুক্ত শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগরকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব।

বুধবার (৬ মে) ভোর ৪টার দিকে ময়মনসিংহের গৌরীপুর থেকে র‍্যাব-১৪ এর একটি অভিযানিক দল তাকে গ্রেপ্তার করে।

গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন র‍্যাব-১৪ মিডিয়ার দায়িত্বে থাকা কোম্পানি কমান্ডার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সামসুজ্জামান।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ভোর সোয়া ৪টার দিকে ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলা থেকে র‍্যাব-১৪ (ময়মনসিংহ) এর একটি দল অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে।

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন থেকে শিশুটির ঘটনা তুলে ধরা হল:

“মেয়েটা যখন আমার চেম্বারে আসলো আমি তাকে তাকে জিজ্ঞেস করি মা তোমার কী হইছে? মেয়েটা তখন খুব ভয় পাচ্ছিল। তখন মেয়েটির হাতে একটা কলম ও চকলেট দিয়ে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলাম। তারপর আবার জিজ্ঞেস করলাম, মা তোমার কি হয়েছে বলো?”

”মেয়েটা বলল- ‘ম্যাডাম আমার পেটটা ভারভার লাগে, পেটের মধ্যে কি জানি লড়েচড়ে। তারপর তার মার কাছ থেকে পুরো ঘটনাটা শুনলাম,” বিবিসি বাংলার কাছে কথাগুলো বলছিলেন নেত্রকোণার গাইনি চিকিৎসক সায়েমা আক্তার।

মিজ আক্তার যেই শিশুটির কথা বলছিলেন তার বয়স মাত্র ১১ বছর। তিনি পড়েন নেত্রকোণার মদন উপজেলার একটি কওমি মাদ্রাসায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে।

গত ২৩শে এপ্রিল ওই শিশু শিক্ষার্থীর পরিবার মদন উপজেলায় একটি মামলা দায়ের করেন। সেই মামলায় অভিযোগ করেন গত বছরের নভেম্বরে তার মাদ্রাসাটির শিক্ষক তাকে ধর্ষণের পর বিষয়টি জানাজানি না করতে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে।

পরে শিশুটির পরিবার বিষয়টি জানতে পারে গত এপ্রিলে। অভিযুক্ত শিক্ষক ও তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। শিশুটির পরিবারের সদস্যরা জানান, গত কয়েকদিন ধরে শিশুটির শারীরিক আকৃতিতে পরিবর্তন আসার পর তার পরিবার বিষয়টি নিয়ে জানতে চান। এক পর্যায়ে শিশুটি ঘটনাটি জানানোর পর তারা থানায় মামলা দায়ের করে।

গত বৃহস্পতিবার শিশুটির পেটে অস্বাভাবিক কিছু দেখতে পেয়ে মদন উপজেলার একটি হাসপাতালে নিয়ে যান পরিবারের সদস্যরা।

ওই শিশুটির আলাট্রাসনোগ্রাম করার পর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘটনাটির পরিস্থিতি তুলে ধরে ছোট একটি ভিডিও আপলোড করেন চিকিৎসক মিজ আক্তার।

মিজ. আক্তার বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, “ওই ভিডিওতে ঘটনার বর্ণনা তুলে ধরার পরই বিভিন্ন জায়গা থেকে নানা ধরনের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। মামলার ১৩দিন পর অভিযুক্ত ওই মাদ্রাসা শিক্ষককে পুলিশ আটক করতে না পারলেও তিনি ভিডিও বার্তায় বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে ওই শিশুটির পরিবার।

ধর্ষণের এই ঘটনাটিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা সমালোচনা তৈরির পর মঙ্গলবার দুপুরে ওই শিশুটির বাড়িতে গিয়ে কিছু ফল ও শুকনো খাবার দিয়ে এসেছে উপজেলা প্রশাসন।

মামলায় অভিযোগে জানানো হয়, তার একমাত্র মেয়ে নেত্রকোণার মদন উপজেলার ফাতেমা তুযযহরা মহিলা কওমি মাদরাসার দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল।

এজাহারে বলা হয়, ‘গত বছরের দোসরা নভেম্বর বিকেলে মাদ্রাসা ছুটির পর অভিযুক্ত শিক্ষক মেয়েটিকে ডেকে মাদ্রাসা সংলগ্ন মসজিদ ঝাড়ু দিতে বলেন। ওইদিন বিকেলে মাদ্রাসার অন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বাড়ি চলে যান। ঝাড়ু শেষে একটি কক্ষে মেয়েটিকে ডেকে নিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে ধর্ষণ করেন। এ ঘটনা কাউকে জানালে ওই শিশুকে এবং তাঁর মা ও ছোট ভাইদের মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়’।

অভিযোগে জানানো হয়, এর চার পাঁচদিন পর আবারো শিশুটিকে ধর্ষণ করেন ওই মাদ্রাসা শিক্ষক। সম্প্রতি শিশুটি অসুস্থ বোধ করছিল এবং তার মধ্যে শারীরিক পরিবর্তন দেখা যায়।

পরে তার মা সিলেট থেকে এসে মেয়েকে জিজ্ঞাসাবাদ করে বিষয়টি জানতে পারেন। পরে গত ১৮ই এপ্রিল শিশুটিকে মদন উপজেলা শহরে একটি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পরীক্ষা–নিরীক্ষা শেষে চিকিৎসক জানান, শিশুটি অন্তঃসত্ত্বা। পরে এ ঘটনায় ওই ছাত্রীর মা বৃহস্পতিবার বাদী হয়ে থানায় মামলা করেন’।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, মেয়ের কাছ থেকে এই ঘটনাটি জানতে পেরে ওই শিক্ষকের ভাইয়ের কাছে বিষয়টি নিয়ে নালিশ দেন ভুক্তভোগীর পরিবার। কিন্তু বিষয়টি কাউকে না জানাতে হুমকি প্রদান করা হয় বলেও জানানো হয় অভিযোগে।

মদন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওসি মো. তরিকুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, “ডাক্তারের রিপোর্ট অনুসারে ঘটনাটি ঘটেছে। আমরা মেয়েটির পরিবারের সাথেও কথা বলেছি। তারা মামলা দায়ের করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় পুলিশ মামলা নিয়েছে”।

ভুক্তভোগী ওই শিশুটির মামা বিবিসি বাংলাকে বলেন, “আমরা মামলা করেছি। কিন্তু পুলিশ এখনো কোন ব্যবস্থা নেয় নি। আমরা কোন টাকা পয়সা বা সাহায্য চাই না। আমরা এই ঘটনার বিচার চাই”।

মামলার এজাহার ও স্থানীয় সূত্রগুলো জানাচ্ছে, নেত্রকোণার মদন উপজেলার পাঁচহার গ্রামে ২০২২ সালে ‘হযরত ফাতেমাতুযযাহরা কওমি মহিলা মাদরাসা’ নামের এই মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠা হয়। অভিযুক্ত ওই শিক্ষক নিজেই প্রতিষ্ঠা করেন মহিলা মাদ্রাসাটি এবং নিজেই যার পরিচালক এবং তারই স্ত্রী মাদ্রাসাটির প্রধান শিক্ষক।

ওই মাদ্রাসার শিক্ষক মাহবুবুর রহমান বিবিসি বাংলাকে জানান, চার বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এই মাদ্রাসায় প্রায় একশোরও বেশি ছাত্র-ছাত্রী পড়াশোনা করতো। মাদ্রাসার পরিচালকের বিরুদ্ধে মামলার পর থেকে বতর্মানে মাদ্রাসাটি বন্ধ আছে। নেত্রকোণার মদন উপজেলা সদর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দুরে অবস্থিত এই মাদ্রাসাটি।

মাদ্রাসা পরিচালক ও অভিযুক্ত ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে গত ২৩শে এপ্রিল ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন মাদ্রাসার দ্বিতীয় শ্রেণির ওই ছাত্রীর পরিবার। মামলার পর থেকে মাদ্রাসা আর আসেননি অভিযুক্ত শিক্ষক। সেই থেকেই বন্ধ রয়েছে মাদ্রাসাটি আর পলাতক অবস্থায় আছেন ওই শিক্ষক।

সোমবার অজ্ঞাত স্থান থেকে ওই শিক্ষকের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। যাতে অভিযুক্ত ওই শিক্ষককে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বক্তব্য দিতে দেখা যায়।

মামলার এজাহারে অভিযুক্ত শিক্ষক ও তার আপন ভাইকে আসামি করা হয়। মাদ্রাসা শিক্ষক মি. রহমান বিবিসি বাংলাকে জানান, দুইদিন আগে মামলার আসামি অভিযুক্ত শিক্ষকের ভাই জামিনে বের হয়েছেন। তবে, আত্নগোপনে আছেন মুল অভিযুক্ত। মামলার এতদিন পরেও অভিযুক্তকে আটক করতে না পারায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন ভুক্তভোগীর পরিবার।

গত বৃহস্পতিবার নেত্রকোণার মদন উপজেলার একটি হাসপাতালে ওই শিশুটিকে নিয়ে যান তার মা। সেখানে তার আল্ট্রাসনোগ্রাম করিয়েছিলেন চিকিৎসক সায়েমা আক্তার। শারীরিক পরীক্ষা–নিরীক্ষার পর মেয়েটির অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা চিকিৎসক মিজ আক্তার।

তিনি জানান, শিশুটি প্রথমে ভয় পাচ্ছিলো। পরে তাকে স্বাভাবিক করার পর শিশুটি ধর্ষণের বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছে। শিশুটি তখন ধর্ষণের জন্য তার মাদ্রাসার হুজুরের কথা বলছিলেন।

বিবিসি বাংলাকে মিজ আক্তার বলেন, “বাচ্চাটা আমার পরিচিতও না। তার কোন আত্নীয়ও আমার পরিচিত না। অন্য আট দশটা রোগীর মতোই সে রোগী হিসেবে আমার কাছে এসেছে। আমি বিস্তারিত শোনার পরই এটা নিয়ে কথা বলেছি”।

ওই চিকিৎসক অভিযোগ করেন, ওই ঘটনার পরই দেশ ও দেশের বাইরে থেকে বিভিন্ন মানুষ তাকে নানা ধরনের হুমকি ও সাইবার বুলিং করছে। তাকে নানা ধরনের হুমকিও দিচ্ছে।

“ওরা বলতেছে আমি নাকি টাকা খাইছি, আমি নাকি ভুয়া, আমার সার্টিফিকেট ভুয়া, আমার নামে সব ধরনের মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে। এখন এমন একটা অবস্থা হইছে আমি আমার বাচ্চাকে স্কুলেও পাঠাতে পারবো না”, বলছিলেন মিজ আক্তার।

ভুক্তভোগীর স্বামী আসিফুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, এই ঘটনার পর আমাদের জীবনে চরম হুমকি নিয়ে আসছে। বুলিং থেকে শুরু করে নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। আমরা এক ধরনের ট্রমার মধ্যে আছি”। নেত্রকোণার মদন থানার ওসি মো. তরিকুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, ”আমাদের কাছে এ নিয়ে কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ দাখিল করলে আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবো”।

কী হবে এখন শিশুটির ?
মামলার এজাহারে শিশুটির পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে গত বছরের নভেম্বরে শিশুটিকে ধর্ষণের পর তাকে ঘটনাটি কাউকে না জানাতে হুমকি দিয়েছিল অভিযুক্ত শিক্ষক।

শিশুটির মামা বিবিসি বাংলাকে জানান, গত মাসখানেক আগে শিশুটির শরীরে তারা পরিবর্তন দেখতে পান। ওই শিশুটির পিতা তার মাকে ডিভোর্স দিয়ে চলে গেছেন। শিশুটির মা সিলেটে গৃহকর্মীর কাজ করেন। যে কারণে শিশুটি মদন উপজেলায় তার নানার বাড়িতে থাকেন।

তার মামা জানান, ওই ঘটনার পর মাদ্রাসার ওই শিক্ষক তাকে হুমকি দেওয়ার কারণে তাদের ভাগ্নি ঘটনাটি কাউকে বলেনি। পরিবারের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার পর শিশুটির মা আসেন সিলেট থেকে। পরে গত মাসে মামলা দায়ের করা হয়।

চিকিৎসক সায়েমা আক্তার বিবিসি বাংলাকে জানান, অন্তঃসত্ত্বা হওয়া শিশুটির বর্তমান বয়স ১১ বছর কিংবা তার চেয়ে একটু বেশি। শিশুটির ওজন মাত্র ৩০ কেজি।

তিনি বলেন, “মাত্র ৩০ কেজি ওজনের ১১ বছরের একটা শিশুর পেটে যে বাচ্চা সেটির ওজন ৯০০ গ্রামের বেশি। এই অবস্থায় ও কী করবে আমরা কল্পনা করতে পারছি না। এই বয়সের মেয়েটাকে যদি ডেলিভারি করানো হয় সে কী বাঁচবে? সিজার করলে বাঁচানো যাবে? আমরা জানি না। আমরা আসলে জানি না তার ভবিষ্যতটা আসলে কী?”

ভুক্তভোগী শিশুটির মা বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘আমরা জানি এখন কি করবো। আমরা এই ঘটনার বিচার চাই”।

মামলার ১৫ দিন পরে সোমবার থেকে ওই চিকিৎসকের বক্তব্য ভাইরাল হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। এমন পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার সকালে শিশুটির খোঁজ নিতে ফল ও শুকনো খাবার নিয়ে তার বাড়িতে যান উপজেলা প্রশাসন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বেদবতী মিস্ত্রী বিবিসি বাংলাকে বলেন, “মেয়েটির শারীরিক অবস্থা এখন খুব খারাপ। সে রক্তশূন্যতায় ভুগছে। হিমোগ্লোবিনের অভাব আছে। আমরা তার চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করবো”।

“আমরা পরিবারটিকে বলে এসেছি শিশুটির বাচ্চা প্রসব হওয়া পর্যন্ত তার চিকিৎসার দায়িত্ব সরকারের। আমাদের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা থাকবে”।