সময়ের জনমাধ্যম

ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত কাতারের এলএনজি স্থাপনা মেরামতে ৫ বছর লাগবে, সংকটের মুখে বাংলাদেশ-পাকিস্তান

কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটি।

Last Updated on 13 hours by zajira news

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, জাজিরা নিউজ: ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটিতে তেহরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দেশটির তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানি সক্ষমতার ১৭ শতাংশ ধ্বংস হয়ে গেছে।

বিশ্বের বৃহত্তম এই এলএনজি উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে পুনরায় স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে ৩ থেকে ৫ বছর সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন কাতারএনার্জির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সাদ আল-কাবি।

বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই তথ্য নিশ্চিত করেন। আল-কাবি অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে জানান, পবিত্র রমজান মাসে একটি মুসলিম ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের কাছ থেকে এমন ভয়াবহ হামলা তার কাছে ছিল অকল্পনীয়। এই পরিস্থিতির কারণে কাতার তাদের দীর্ঘমেয়াদী এলএনজি চুক্তির গ্রাহকদের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পেরে ‘ফোর্স মেজেওর’ বা অনিবার্য কারণবশত সরবরাহ স্থগিতের ঘোষণা দিতে বাধ্য হচ্ছে।

কাতারের এই স্থাপনাটি অচল হয়ে পড়ায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো, বিশেষ করে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারত বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিপর্যয় ও শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার চরম ঝুঁকিতে পড়েছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, রাস লাফান থেকে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই দেশগুলোতে শিগগিরই ভয়াবহ জ্বালানি সংকট দেখা দিতে পারে। বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘কেপলার’-এর তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তান তাদের প্রয়োজনীয় এলএনজির ৯৯ শতাংশ এবং বাংলাদেশ ৭০ শতাংশ কাতার থেকে আমদানি করে থাকে।

বর্তমানে এই দুই দেশের হাতে মাত্র এক থেকে দুই সপ্তাহের এলএনজি মজুত রয়েছে। ফলে সরবরাহ শৃঙ্খল দীর্ঘ সময় বিচ্ছিন্ন থাকলে দেশ দুটির বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ও গ্যাসচালিত শিল্পকারখানাগুলো অচল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় নীতিনির্ধারকরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।

জ্বালানি খাতের তথ্য অনুযায়ী, ভারতও তাদের মোট এলএনজি চাহিদার ৪০ শতাংশের বেশি কাতার থেকে সংগ্রহ করে, যার ফলে দেশটিতেও বড় ধরনের লোডশেডিংয়ের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়, পূর্ব এশিয়ার তাইওয়ানও এই সংকটের বাইরে নেই। দেশটি তাদের চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ কাতার থেকে আমদানি করে এবং বর্তমানে তাদের হাতে মাত্র ১১ দিনের মজুত অবশিষ্ট রয়েছে।

যদিও তাইপে দাবি করেছে যে তারা এপ্রিল পর্যন্ত সরবরাহ নিশ্চিত করেছে, তবে মে মাস থেকে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া তাদের জন্য কঠিন হবে। ইরানের হামলার ফলে রাস লাফান কমপ্লেক্সের একাংশে আগুন লেগে উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে এলএনজির প্রাপ্যতা কমে গেছে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর।

সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে ইরানের পক্ষ থেকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার কারণে। বর্তমানে লিব্রেথা নামক একটি ট্যাংকার ৬২ হাজার টন এলএনজি নিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা থাকলেও সেটি পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলেই আটকে আছে। কাতারএনার্জি চলতি মাসের শুরুর দিকেই উৎপাদন সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিল, তবে সাম্প্রতিক এই বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে।

এই দীর্ঘমেয়াদী অনিশ্চয়তা দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর প্রবৃদ্ধিকে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকরা। বর্তমান যুদ্ধাবস্থা নিরসন না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ব জ্বালানি বাজারে এই অস্থিরতা বজায় থাকার সম্ভাবনা প্রবল। সূত্র: রয়টার্স, সিএনএন