Last Updated on 24 hours by zajira news
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, জাজিরা নিউজ: ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর এক সপ্তাহের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের সামরিক দিক থেকে কিছু অগ্রগতি থাকলেও এর রাজনৈতিক ও কৌশলগত পরিণতি নিয়ে এখন নানা প্রশ্ন উঠছে।
বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সংঘাতকে শেষ পর্যন্ত কীভাবে সামাল দেবেন তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনা বাড়ছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়া এবং স্থল, সমুদ্র, আকাশপথে বড় ধরনের হামলা চালানোর পরও পরিস্থিতি দ্রুত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সম্পৃক্ততার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
হোয়াইট হাউসে দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করা ট্রাম্প অতীতে সাধারণত দ্রুত ও সীমিত সামরিক অভিযানের কৌশল পছন্দ করতেন।
যেমন ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলায় আকস্মিক অভিযান অথবা জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় একবারের হামলা।
ওয়াশিংটনের জনস হপকিন্স স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের লরা ব্লুমেনফেল্ড বলেন, ইরান আক্রমণ একটি জটিল এবং সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান। এতে বৈশ্বিক অর্থনীতি, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির ফলাফলের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ক্ষমতায় এসে অর্থহীন সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে দূরে রাখার প্রতিশ্রুতি দিলেও এখন ট্রাম্প এমন একটি যুদ্ধ পরিচালনা করছেন, যাকে অনেক বিশেষজ্ঞ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উন্মুক্ত যুদ্ধ হিসেবে দেখছেন।
তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইরানের আসন্ন কোনো হুমকি না থাকলেও এই অভিযান শুরু হয়েছে। যদিও প্রেসিডেন্ট ও তার সহযোগীরা ভিন্ন দাবি করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, অপারেশন এপিক ফিউরি যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযানের একটি। তবে এর লক্ষ্য ও শেষপর্যায়ের পরিকল্পনা স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হিমশিম খাচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। যুদ্ধের যৌক্তিকতা এবং জয় বলতে কী বোঝাবে সে বিষয়ে তার বক্তব্যও বারবার বদলাচ্ছে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি এসব সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযানের লক্ষ্য স্পষ্ট। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও উৎপাদন সক্ষমতা ধ্বংস করা, নৌবাহিনী অকার্যকর করা, প্রক্সি বাহিনীকে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করা এবং ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা।
তবে যুদ্ধ দীর্ঘ হলে যুক্তরাষ্ট্রের হতাহতের সংখ্যা বাড়তে পারে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল সরবরাহ ব্যাহত হয়ে অর্থনৈতিক চাপও বাড়তে পারে। এতে রাজনৈতিকভাবে রিপাবলিকান পার্টিও চাপে পড়তে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
এখন পর্যন্ত ট্রাম্পের মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন আন্দোলনের অধিকাংশ সমর্থক ইরান ইস্যুতে তাকে সমর্থন দিচ্ছেন। তবে সমর্থনের ভেতরেও মতভেদ রয়েছে।
রিপাবলিকান কৌশলবিদ ব্রায়ান ডার্লিং বলেন, আমেরিকান জনগণ ইরাক, আফগানিস্তানের মতো দীর্ঘ যুদ্ধ আবার দেখতে চায় না। এমএজিএ সমর্থকদের মধ্যেও বিভক্তি রয়েছে। কেউ নতুন যুদ্ধ না করার প্রতিশ্রুতির ওপর ভরসা করেছিলেন, আবার কেউ ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছেন।
বিশ্লেষকদের আরেকটি উদ্বেগ ট্রাম্প প্রশাসনের বার্তায় অসামঞ্জস্যতা। বিশেষ করে তেহরানে শাসন পরিবর্তন চাওয়া হচ্ছে কি না সেই প্রশ্নে অবস্থান পরিষ্কার নয়।
সংঘাতের শুরুতে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ইরানের শাসকদের উৎখাত একটি লক্ষ্য হতে পারে। দুই দিন পর তিনি বিষয়টি অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেননি।
পরে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরানের পরবর্তী নেতা নির্বাচনে তিনি ভূমিকা রাখবেন এবং ইরানি কুর্দি বিদ্রোহীদের হামলা চালাতে উৎসাহ দেন। এরপর সামাজিক মাধ্যমে তিনি ইরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ দাবি করেন।
অন্যদিকে ইরান পাল্টা হামলা চালিয়ে ইসরায়েল এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর আঘাত হানছে। এর ফলে যুদ্ধের পরিধি আরও বাড়ছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ নতুন করে ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছে। ফলে সংঘাত আরেকটি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।
এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ছয়জন সেনা নিহত হয়েছেন। তবে ট্রাম্প ভবিষ্যতে আরও হতাহতের আশঙ্কাকে খুব একটা গুরুত্ব দেননি এবং স্থলবাহিনী পাঠানোর সম্ভাবনাও পুরোপুরি নাকচ করেননি।
মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক জাতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তা জনাথন পানিকফ বলেন, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়াতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের আরও বেশি হতাহত হওয়া। ইরানও এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইতে পারে।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, ট্রাম্প হয়তো ভেবেছিলেন ইরান অভিযান ভেনেজুয়েলার অভিযানের মতো সহজ হবে। সেই অভিযানে মার্কিন বিশেষ বাহিনী ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে এবং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান ছাড়াই দেশটির তেল সম্পদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে।
কিন্তু ইরান অনেক বেশি শক্তিশালী ও সুসজ্জিত প্রতিপক্ষ। সেখানে গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় ও নিরাপত্তা কাঠামো রয়েছে।
এছাড়া হরমুজ প্রণালি নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। এই সরু সমুদ্রপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয়। সেখানে ট্যাংকার চলাচল ব্যাহত হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় প্রভাব পড়তে পারে। অ্যাটলান্টিক কাউন্সিলের জশ লিপস্কি বলেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য একটি বড় চাপের জায়গা।
একজন সাবেক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা বলেন, যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব এত দ্রুত বাড়বে তা ট্রাম্প প্রশাসন পুরোপুরি অনুমান করতে পারেনি। কারণ হামলার আগে তেলবাজার বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যথেষ্ট আলোচনা হয়নি।
যুদ্ধ কতদিন চলবে তা এখনো অনিশ্চিত। ট্রাম্প বলেছেন, অভিযান চার বা পাঁচ সপ্তাহ বা যতদিন প্রয়োজন ততদিন চলতে পারে। তবে এরপর কী হবে সে বিষয়ে পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেননি।
অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন সেনা লেফটেন্যান্ট জেনারেল বেন হজেস বলেন, ইরানে মার্কিন সামরিক কৌশল কার্যকর হলেও রাজনৈতিক, কৌশলগত ও কূটনৈতিক দিকগুলো যথেষ্ট ভেবে দেখা হয়নি বলে মনে হয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ধনকুবের খালাফ আল হাবতুর এক খোলা চিঠিতে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করেন, আমাদের অঞ্চলকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে। সূত্র: রয়টার্স


