সময়ের জনমাধ্যম

কিংবদন্তি আশা ভোঁসলেকে ভারত রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিদায় জানাল

Last Updated on 2 hours by zajira news

বিনোদন ডেস্ক, জাজিরা নিউজ। যুগ যুগ ধরে যার জাদুকরী কণ্ঠে সৃমদ্ধ হয়েছে ভারতের প্লেব্যাক মিউজিক ইন্ড্রাস্ট্রি, সেই কিংবদন্তি গায়িকা আশা ভোঁসলেকে ফুলেল শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় আর চোখের জলে শেষ বিদায় জানিয়েছে মুম্বাইয়ের সর্বস্তরের মানুষ।

সোমবার বিকাল ৪টা থেকে শিবাজী পার্ক শ্মশানে তার শেষকৃত্যানুষ্ঠান শুরু হয়। ভারতের সংগীত, চলচ্চিত্র আর রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে নানা পেশার মানুষ তাকে বিদায় জানান। কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় আচারে তাকে দাহ করা হয়।

বছর চারেক আগে এই শিবাজি পার্ক শ্মশানেই শেষকৃত্যানুষ্ঠান হয়েছিল আশা ভোঁসলের বড় বোন আরেক কিংবদন্তী শিল্পী লতা মঙ্গেশকরের। চার বছরের ব্যবধানে ভারতীয় এ দুই কিংবদন্তীকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ তাদের ভক্ত অনুরাগীরা।

মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে রোববার (১২ এপ্রিল) জীবনাবসান ঘটে ৯২ বছর বয়সী আশা ভোঁসলের। সেখান থেকে শিল্পীর মরদেহ লোয়ার প্যারেলে আশা বাসভবন কাসা গ্রান্দেতে নেওয়ার পর শ্রদ্ধা নিবেদনে করা হয়। শেষকৃত্যের জন্য সোমবার সেখান থেকে মরদেহ নেওয়া হয় শিবাজি পার্ক শ্মশানে।

এনডিটিভি লিখেছে, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় তার ছেলে আনন্দ ভোঁসলে, বোন ঊষা মঙ্গেশকর ও ভাই হৃদয়নাথ মঙ্গেশকরসহ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

ভারতের সংগীত, চলচ্চিত্র, রাজনীতি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তার শেষকৃত্যানুষ্ঠানে যোগ দেন। সংগীতশিল্পী অনুপ জলোটা ও শান শেষকৃত্যানুষ্ঠানে গান গেয়েছেন।

আশা ভোঁসলের শেষকৃত্যে যোগ দেন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফদনবিস। সংগীত শিল্পী এ আর রহমান সকালেই পৌঁছান। এরপর জ্যাকি শ্রফ, রিতেশ দেশমুখ, রেণুকা শাহানে, রাণবীর সিং, আমির খান এবং রাকেশ রোশনের মত অভিনেতা ও নির্মাতারাও উপস্থিত হন। প্রবীণ তারকা হেলেন, পুনম ধিলন এবং মীনাক্ষী শেষাদ্রিও হাজির হন। শচীন টেন্ডুলকার ও অঞ্জলি টেন্ডুলকারও ছিলেন শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানে।

আট দশকের বেশি সময় ধরে ২০টি ভিন্ন ভাষায় ১১ হাজারেরও বেশি গান গেয়ে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে স্থান পাওয়া শিল্পী আশা ভোঁসলে। ১৯৩৩ সালে মহারাষ্ট্রের সাংলিতে এক সংগীত পরিবারে আশা ভোঁসলের জন্ম। তিনি থিয়েটার অভিনেতা ও শাস্ত্রীয় সংগীত শিল্পী দীনানাথ মঙ্গেশকরের মেয়ে এবং কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী লতা মঙ্গেশকরের ছোট বোন।

জীবনের শুরু থেকেই তার ওপর ছিল পারিবারিক উত্তরাধিকারের গুরুভার, তবে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরির সংকল্পে তিনি ছিলেন অটল। লতা মঙ্গেশকরের হাত ধরে সংগীতজীবনে পা রেখেছিলেন আশা ভোঁসলে। সময়টা ছিল ১৯৪৩ সাল। প্রথম প্লেব্যাক করেন মারাঠি সিনেমায়।

এরপর ১৯৪৮ সালে ‘চুনারিয়া’ সিনেমায় ‘খাতু আয়া’ গানের মধ্য দিয়ে হিন্দি চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক জগতে তার যাত্রা শুরু। তিনি প্রথম এককভাবে হিন্দি গানে কণ্ঠ দেন ১৯৪৯ সালে। শাস্ত্রীয়, লোকসংগীত, পপ, গজলসহ বিভিন্ন ঘরানার গান গেয়ে ক্যারিয়ার সমৃদ্ধ তিনি। গত শতকের ১৯৫০-এর দশকের শেষভাগ থেকে ৭০ ও ৮০-র দশক পর্যন্ত আশা ভোঁসলে ছিলেন একপ্রকার অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়েই তার ভিন্ন মেজাজের কণ্ঠের কাজ শ্রোতাদের আকৃষ্ট করে। বিশেষ করে রাহুল দেব বর্মণের সঙ্গে তার কালজয়ী কাজগুলো ব্যাপক সাফল্য এনে দেয়। প্রাণবন্ত গজল থেকে শুরু করে ক্যাবারে কিংবা রক অ্যান্ড রোল—সবখানেই অবাধ বিচরণ তাকে ‘কুইন অব ভার্সেটাইল’ খেতাব এনে দেয়।

কিছুটা তীক্ষ্ণ কণ্ঠ তাকে এমন অনেক চরিত্রের জন্য গান গাওয়ার সুযোগ এনে দেয়, যেগুলো ছিল প্রচলিত ধারার বাইরে। হিন্দি সিনেমার নায়িকাদের জন্য বরাদ্দ প্রচলিত কণ্ঠধারাকে তিনি বদলে দেন, যা হয়ে ওঠে আধুনিক ভারতীয় নারীর প্রতীক। আর এভাবেই জন্ম হয় এক প্লেব্যাক সুপারস্টারের।

পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতি অদম্য ঝোঁকের কারণেই গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে সবচেয়ে বেশি গান রেকর্ড করা শিল্পী হিসেবে জায়গা করে নেন আশা ভোঁসলে। তার দীর্ঘ সংগীতযাত্রা কোনো একটি নির্দিষ্ট শিখরে আটকে থাকেনি, বরং বারবার নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন তিনি।

‘রিদমের রাজা’ হিসেবে পরিচিত ওপি নায়ার থেকে শুরু করে বৈপ্লবিক আরডি বর্মণ—আশা ভোঁসলে প্রতিটি সুরকারের চাহিদা অনুযায়ী নিজের গায়কশৈলীকে বদলে নিয়েছেন।

নির্দিষ্ট কোনো প্লেব্যাক গানের ছাঁচে নিজেকে আটকে না রেখে আশা ভোঁসলে ক্যাবারে, লোকগীতি, রোমান্টিক সুর, এমনকি পরে গজলেও নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন সাবলীলভাবে। সিনেমার গানের পাশাপাশি নানা ধরনের নিরীক্ষামূলক গানেও পারঙ্গমতার স্বাক্ষর রেখেছেন আশা ভোঁসলে।

আরডি বর্মণের সঙ্গে তিনি জ্যাজ রিফ এবং ল্যাটিন বিটের সংমিশ্রণে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেন। তাদের দীর্ঘ সৃষ্টিশীল অংশীদারত্ব এবং পরে বিয়ে আশা ভোঁসলের শিল্পীসত্তাকে আরও বিস্তৃত করে। ১৯৬৬ সালে ‘তিসরি মঞ্জিল’ (১৯৬৬) সিনেমায় ‘আজা আজা ম্যায় হুঁ পেয়ার তেরা’র মত চার্টবাস্টার গান উপহার দেন আশা, যা ছিল সেই সময়ের বিচারে এক দুঃসাহসী পশ্চিমা নিরীক্ষা।

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে আশা ভোঁসলে শর্মিলা ঠাকুর, আশা পারেখ, রেখা, উর্মিলা মাতণ্ডকর, কারিশমা কাপুর, ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন থেকে শুরু করে শমিতা শেঠি পর্যন্ত আরও বহু অভিনেত্রীর জন্য গান গেয়েছেন।

আশা ভোঁসলের সর্বশেষ প্লেব্যাক করেন ২০২২ সালের জ্যাকি শ্রফ অভিনীত ‘লাইফ’স গুড’ সিনেমায়। ‘রুত ভিগে তন’ গানটি গেয়েছিলেন তিনি। এছাড়া ৯১ বছর বয়সে তার প্রয়াত স্বামী সংগীত পরিচালক রাহুল দেববর্মণকে উৎসর্গ করে ‘সাইয়াঁ বিনা’ নামে একটি একক গান প্রকাশ করেন।

ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মান ‘দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার’-এ ভূষিত হয়েছেন আশা ভোঁসলে এবং ‘পদ্মবিভূষণ’ও অর্জন করেছেন।

এসব সম্মাননার পাশাপাশি ১৯৮১ সালে ‘উমরাও জান’ সিনেমার তিনি প্রথমবার জাতীয় পুরস্কার পান, দ্বিতীয় জাতীয় পুরস্কার তার ঘরে আসে ১৯৮৮ সালে ‘ইজাজত’ সিনেমার জন্য। পেয়েছিলেন গ্র্যামিতে মনোনয়নও। এছাড়া তিনি ফিল্মফেয়ার পুরস্কারও জিতেছেন ।

Reendex

Must see news