সময়ের জনমাধ্যম

‘মেজবান’ রেস্তোরাঁয় বিক্রি হওয়ার পণ্য নয়!

Last Updated on 3 months by zajira news

কুয়ালালামপুরে পরিচিত কেউ কেউ মাঝেমাঝে অভিযোগ করেন, ‘ভাই, আপনার বাসায় কোনদিন মেজবানি খাওয়ালেন না! ‘ কখনও বলেন, ‘ভাই আমাদেরকে কখনো চট্টগ্রামের মেজবান খাওয়ালেন না।’ সেদিন খুলনার মেয়ে মালয়েশিয়া প্রবাসী আমাদের আরবিনা ভাবিও এই অভিযোগ করে বসলেন। পাশে বি-বাড়িয়ার আশরাফুল মামুন ভাইও ছিলেন।মামুন ভাই সবচেয়ে বেশি বলেন মেজবান খাওয়ার কথা। আমি তাকে উদ্দেশ্য করে বললাম, মেজবান খাওয়াতে গেলে আপনাকে মরতে হবে! উনি বললেন, কেন ভাই? আমি বললাম, জ্বি, এটাই নিয়ম।

‘মেজবান’ চট্টগ্রামের একটি ঐতিহ্য। বিষয়টা সারা বাংলাদেশের মানুষ জানেন। চট্টগ্রামের বাইরের বহু মানুষ দেশে-বিদেশে মেজবানের দাওয়াত খেয়েছেন। মেজবানের গরুর মাংস, ডাল, নলার ঝোলের স্বাদের সাথে চট্টগ্রামের মানুষের চিরকালের পরিচয়। অনান্য জেলার মানুষের মধ্যে যারা মেজবান খেয়েছেন তাদের মাধ্যমে দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী এই খাবার আয়োজনের কথা। লক্ষ্য করুন, ‘খাবার’র কথা বলি নাই, ‘খাবার আয়োজন’র কথা বলেছি।

এই লেখাটি লেখার জন্য মেজবান নিয়ে অনলাইন বা অফলাইনে কোনো লেখা পড়ি নাই। মেজবান নিয়ে কোনো গবেষণাও না। কেবল চাঁটগার ভূমিপুত্রা হিসেবে চিরচেনা মেজবান নিয়ে নিজের উপলব্ধিটুকু লিখছি।

শৈশব থেকে দেখা মেজবান হচ্ছে মূলত কুলখানি ও মৃতুবার্ষিকীতে খাবারের বড় আয়োজন। নব্বইয়ের দশকে দেখেছি মূলত সামর্থ্যবান-পয়সাওয়ালা-বড়লোকেরাই মেজাবান দিতেন। যাদের আর্থিক সামর্থ্য থাকতো তারা চেষ্টা করতেন দুনিয়ার পাঠ চুকিয়ে কবরে শায়িত হওয়া মুরুব্বিদের ইছালে ছওয়াবের জন্য বাৎসরিক মেজবানের আয়োজন করতে। আত্মীয়-স্বজনের পাশাপাশি সমাজের নারী-পুরুষ সকলের দাওয়াত থাকতো মেজবানে। সার্মথ্য ও আয়োজনের ওপর নির্ভর করে নিজ সমাজের বাইরে গিয়ে আশেপাশের সমাজের মানুষ ও পুরো গ্রামের মানুষ মেজবানের দাওয়াতের আওতায় আসতো। আরো বড়লোক হলে, আরো বড় আয়োজন হলে কয়েক গ্রামের মানুষ পেতেন সেই দাওয়াত। মেজবানের আরেক মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে , ধনী-গরিব, ফকির-মিসকিন সবাই যেন খেতে পারেন। একদিন একবেলা সবাই যেন পেট ভরে ভালো খেয়ে মন থেকে দোয়া করেন। সবার দোয়ায় আল্লাহ কবরবাসীর কাছে পৌঁছে দেন। গরিব, ফকির, মিসকিনসহ উপস্থিত সবার মনের তৃপ্তিতেই কবরবাসীরা যেনো শান্তি পান- সেটাই প্রধান চাওয়া মেজবানের।

নব্বইয়ের দশকে কোনো কোনো পরিবারের পারিবারিক ঐতিহ্য ছিল প্রতি বছর অমুক মাসে তাদের মেজবান। বাৎসরিক মেজবান ছাড়াও কেউ মারা গেলে চার দিন/পাঁচ দিন বা সাত দিনের মাথায় এই মেজবানের আয়োজন করা হয়। যথারীতি পারিবারিক আর্থিক সার্মথ্যের ওপর মেজবানের আয়োজন ছোট বড় হয়। ছেলে-মেয়েদের খৎনা, কান পুড়ানোর অনুষ্ঠান উপলক্ষেও মেজবান হতো। অর্থাৎ একসাথে দুই কাজ। মেজবানও হলো। ছেলেমেয়েদের জন্য আয়োজিত অনুষ্ঠানে আত্মীয় স্বজনেরাও আসলেন। সেই উপলক্ষে বড় আয়োজন হয়ে গেলো। দূরের কাছের আত্মীয় অনাত্মীয় অনেক মানুষের আগমনে মেজবান পারিবারিক ও সামাজিক মিলনমেলায় পরিণত হয়।

আগে সবাই মেজবানের আয়োজন করতে পারতেন না। শহরে কিংবা গ্রামে কোনো কোনো পরিবার এই আয়োজন করতেন। আমাদের শৈশবে চাটাইতে বসেও মেজবান খেয়েছি। বড় বড় মেজবানে অনেক মানুষের ভিড় হতো। এখনো বড় আয়োজনে মানুষের ভিড় হয়। লাইন ধরতে হয় খাবার টেবিল পর্যন্ত যাওয়ার জন্য। গরুর ঝাল মাংস , গরুর হাড় দিয়ে ডাল-লাউ অথবা ডাল-আলু বা ডাল-মুলার তরকারি, নলার ঝোল এই তিনটা মেজবানের প্রধান আইটেম। মূলত মজা করে, মন ভরে বেশি বেশি গরুর মাংস খেতে পারাটাই মানুষ কষ্ট করে মেজবান খেতে যাওয়ার অন্যতম কারণ। বড় আয়োজনের বড় ডেকসির খাবার এমনিতেই বেশি স্বাদ হয়– এ কথা চট্টগ্রামে প্রচলিত। কষ্টের কথা বললাম এই কারণে– আগে মানুষ মেজবান খাওয়ার জন্য পায়ে হেঁটে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যেতেন। আবার লাইন ধরে ভিড় ঠেলে খাবার টেবিলে পৌঁছানো কষ্টের ব্যাপারও বটে। বড় মেজবানে বাড়ির গেইটে মানুষের ঠেলাঠেলি ধাক্কাধাক্কি খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। বিয়ের আয়োজনের মতো নয় মেজবান। মেজবান গণমানুষের জন্য আয়োজন বলা যায়। আরো বলা যায় মেজবানে বৈষম্য কম– গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সবার জন্য সমান খাবার পরিবেশ করা হয়। অবশ্যই কিছু কিছু ব্যতিক্রম থাকে। আজকাল মেজবানেও নেতা-নেত্রী, জনপ্রতিনিধির আগমন ঘটে। তাদের টেবিলে একটু বেশি খাতিরযত্ন করতে হয়। তারা এটা আশা করেনও । এই অতিরিক্ত খাতিরযত্ন আশা করাটা যে অগণতান্ত্রিক– সেটা তারা বুঝলে তো দেশেও সঠিক গণতন্ত্রের চর্চা হতো। আরো একটা ঝামেলা হচ্ছে, এলাকার বড় নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের দাওয়াত দিলে তারা আসার সময় সদলবলে আসেন। নেতা যথেষ্ট সুবিবেচক হলে দল হালকা থাকে, অবিবেচক হলে তো কথাই নাই!

একুশ শতকের মেজবান অবশ্যই কিছুটা ভিন্ন। মানুষের টাকা-পয়সা আছে এখন। মেজবানের আগের স্বাদ নেই আর। এখন ঘনঘন মেজবান হয়। কারণ, মেজবান আয়োজন করার মতো আর্থিক সামর্থ্যবান পরিবারের সংখ্যা বেড়েছে বহুগুণে। তবে আগের মতো বড় মেজবান কম মনে হয় এখন। আর আগে মেজবানে গরুর ব্যবহার হতো বেশি। এখন মহিষের ব্যবহারও বেড়েছে। আমার কাছে তো মহিষের মাংস মোটেই পছন্দ না। কিন্তু গরুর মাংসের মেজবান হলে সেই হয়।

মেজবান নিয়ে লেখার আসল উদ্দেশ্যে ফেরত আসি। কুয়ালালামপুরে বি-বাড়িয়ার আশরাফুল মামুন ভাই, চাঁদপুরের শান্ত ভাই, যশোরের আরিফ ভাই , ফেনীর হিরন ভাই, খুলনার রাজু ভাই, চুয়াডাঙ্গার আমিন ভাই, শরিয়তপুরের সওকত হোসেন জনী– তারা আমার কাছে মেজাবানির দাওয়াত খেতে চান। আমি খাওয়াব বলেছি। তাই যতবার দেখা হয় ততবারই মনে করিয়ে দেন, তাদের মধ্যে কেউ না কেউ। ভাই মেজবান কখন খাওয়াচ্ছেন?

উনারা যে মেজবানি খেতে চান, কিন্তু কেন? তাঁরা কিন্তু কখনো আসল মেজবানের দাওয়াত খান নি। কিন্তু উনারা মেজবানি খেয়েছেন। কোথায় খেয়েছেন? দেশে বা বিদেশে কোনো রেস্তোরাঁয় মেজবানি খেয়েছেন, হয়ত। রেস্টুরেন্টে মেজবানের বিষয়টা লেখার জন্য এই দীর্ঘ লেখার দরকার পড়েছে।

মেজবান শুধু ঐতিহ্য নয়, এটা একটা ধর্মীয় আয়োজনও। আগেই উল্লেখ করেছি, মরহুম মুরুব্বি বা মৃত ব্যক্তির ইছালে ছওয়াবের জন্য ধনী গরিব অনেক মানুষের জন্য গরু/মহিষ জবেহ করে খাবারের বড় আয়োজনই মেজবান।

চট্টগ্রামের বাইরে রাজধানী ঢাকা ও বিভিন্ন দেশে চাটগাঁইয়ারা মেজবানের আয়োজন করে থাকেন। সেটা বেশি হয়ে থাকে চাটগাঁইয়া মানুষদের বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে। কখনো কখনো ব্যক্তি উদ্যোগেও। আপনি প্রশ্ন করতে পারেন সংগঠনের উদ্যোগে মেজবান হলে কার ইছালে ছওয়াবের জন্য মেজবান দেওয়া হয়? হ্যাঁ, এখানে সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানের মরহুম সদস্যদের ইছালে ছওয়াব ও সদস্যদের মরহুম মুরুব্বিদের ইছালে ছওয়াবের জন্য দোয়া করা হয়। আর সংগঠনের সদস্য ছাড়াও উক্ত স্থানে/উক্ত শহরে/উক্ত দেশে বসবাসকারী সকল চাটগাঁইয়াদের বছরে একবার হলেও বড় আয়োজনে খাওয়ানোর উদ্দেশ্যই হচ্ছে মেজবানের লক্ষ্য। সেই সাথে মেজবান উপলক্ষে বহু মানুষের জমায়েত ও দেখাসাক্ষাৎ হওয়াটাও একটা উদ্দেশ্য।

এই ধর্মীয় বিষয়টা, চট্টগ্রামের মানুষের অনুভূতির বিষয়টা, আমাদের বহুকালের মর্যাদার চর্চাটা, আত্মীয়-স্বজন, গ্রামবাসী, এলাকাবাসীর মিলনের চর্চা চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মেজবানটা রেস্তোরাঁয় কে নিয়ে আসলো? রেস্তোরাঁয় কীভাবে মেজবান হয়? টাকা কামানোর জন্য আমাদের আবেগের মেজবানকে বিবেকহীনতায় রেস্তোরাঁয় বেচাকেনার চর্চাটা আমি অন্তত অপছন্দ করি। শুধু অপছন্দ নয়, বরং চরম অপছন্দ করি। মানুষ টাকা-পয়সা খরচ করে অনেক মানুষকে দাওয়াত দিয়ে মেজবান খাওয়াবেন। দাওয়াত না পেয়েও অনেক মানুষ মেজবানে যান, খেয়ে আসেন। মেজবান তো ফ্রি খাওয়া। টাকা খরচ করবেন আয়োজনকারী পরিবার। অন্যরা খাবেন ফ্রি। কিন্তু রেস্তোরাঁয় তারা মেজবানি দেয়, খেয়ে টাকা দিতে হবে। এটা কীসের মেজবানি? আবেগ নিয়ে ব্যবসা? ধর্ম নিয়ে ব্যবসা– এসব কেবল বাঙালিরাই মনে হয় করে! কই? মালয়েশিয়ায় অনেক খোঁজেও আমি একটা ‘মক্কা’ স্টোর দেখি নাই, মদিনা হোটেল দেখি নাই, বিসমিল্লাহ ভাতঘর পেলাম না, আল্লাহর দান ট্রেডিং এর অস্তিত্বও দেখলাম না।

মেজবানি বেচাকেনা শেষ করে এবার তারা ধরেছে ‘ওরশ’! রেস্তোরাঁয় এখন ওরশ বিরিয়ানি বিক্রি হয়। কী আশ্চর্য মেজবান আর ওরশ কীভাবে রেস্টুরেন্টে হয়?

‘বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে’ তেমনি মেজবান সুন্দর কারো বাড়ির উঠোনে সামিয়ানার নিচে বা কোনো বড় কমিউনিটি সেন্টারে। বহু মানুষের ভিড়ে ঠেলাঠেলি ধাক্কাধাক্কি করে মেজবান খাওয়ার জন্য টেবিল পর্যন্ত পৌঁছানোরও একটা আলাদা মজা আছে বটে। আমাদের মেজবান আমাদেরই থাক– মানুষের বাড়ির উঠোনে, শহরে, নগরে, গ্রামের কমিউনিটি সেন্টারে। আপনাদের রেস্তোরাঁয় আপনারা নিজেদের নানা রকমের রেসিপি বিক্রি করেন, আমরা কিনে খাব। দোহাই লাগে, দয়া করে ‘মেজবান’ আর বিক্রি করিয়েন না। মেজবান বিক্রি করার জিনিস নয়। এটা আমাদের ধর্মীয় সংস্কৃতির অংশ কিংবা বহু বছরের সামাজিক ঐতিহ্য। ঐতিহ্য বিক্রি হয় না। ঐতিহ্য লালিত হয়।

লেখক : রফিক আহমদ খান
মালয়েশিয়া প্রবাসী সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক