Last Updated on 2 hours by zajira news
অনলাইন ডেস্ক, জাজিরা নিউজ: ‘মাথার ওপর দিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে মিসাইল আর ড্রোন ছুটে যায়। কখনো আকাশেই সেগুলো ধ্বংস হচ্ছে, কখনো বিকট শব্দে আঘাত হানছে। শব্দ পেলেই আমরা দৌড়ে জাহাজের সুরক্ষিত কক্ষে আশ্রয় নিচ্ছি।’
পারস্য উপসাগরে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) জাহাজ বাংলার জয়যাত্রা থেকে যুদ্ধের দিনলিপি জানালেন জাহাজটির প্রধান প্রকৌশলী রাশেদুল হাসান। জাহাজে থাকা ৩১ জন নাবিকের মধ্যে তিনি ১ জন।
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সংঘাত শুরুর আগে থেকেই জাহাজটি পারস্য উপসাগরে রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর কীভাবে তাদের প্রতিদিন কাটছে, তা তুলে ধরেছেন গনমাধ্যমের কাছে।
রাশেদুল হাসান জানান, ২৭ ফেব্রুয়ারি কাতার থেকে স্টিল কয়েল নিয়ে জাহাজটি জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছায়। সেদিন বন্দরে ছিল অস্বাভাবিক নীরবতা।

পরদিন ভোরে ইরানে হামলার খবর আসে। তখনো তাঁরা বুঝতে পারেননি, যুদ্ধের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়বে মধ্যপ্রাচ্যেও। যুদ্ধ শুরুর পরের রাত। ঘুমাতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন রাশেদুল। হঠাৎ রাত দেড়টার দিকে বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে চারপাশ। তিনি বললেন, ‘আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। কিন্তু কী করতে হবে, সেটা জানা ছিল।’ দ্রুত জাহাজের জরুরি প্রস্তুতি নেওয়া, একটি অতিরিক্ত জেনারেটর চালু, ইমার্জেন্সি ফায়ার পাম্প প্রস্তুত, ওয়াকি–টকিতে সবাইকে নির্দেশনা। এরপর সবাই জাহাজের সবচেয়ে সুরক্ষিত কক্ষে আশ্রয় নেন।
কিছুক্ষণ পর বাইরে গিয়ে দেখেন, কাছাকাছি একটি তেল ডিপোর নিয়ন্ত্রণকক্ষে হামলা হয়েছে। আগুন জ্বলছে। দুটি টাগবোট আগুন নেভানোর চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, ‘তেলের ট্যাংকে আগুন ছড়িয়ে পড়লে ভয়াবহ কিছু হতে পারত।’
নরসিংদীর মাধবদীতে বেড়ে ওঠা রাশেদুল হাসান বাংলাদেশ মেরিন একাডেমির ৪৭তম ব্যাচের ক্যাডেট। ২০২৪ সালে তিনি বিএসসিতে প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব নেন। বর্তমানে তিনি সংস্থাটির বহরের সর্বকনিষ্ঠ প্রধান প্রকৌশলী।
যুদ্ধের মধ্যে আটকা পড়ার খবর পৌঁছে যায় তাঁর পরিবারে। ‘বাবা-মা খুব ভয় পেয়েছিলেন। ফোন করেছিলেন। আমি তাঁদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছি,’ বলেন তিনি।
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক দফায় দফায় যোগাযোগ করেন। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিযুক্ত বাংলাদেশের দূতাবাস থেকেও নিয়মিত খোঁজ নেওয়া হয়। তবে জাহাজ ছেড়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। তাই নাবিকেরা জাহাজে থেকেই সতর্কতা জোরদার করেন।
পরবর্তী কয়েক দিনে পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়ে ওঠে। রাশেদুল বলেন, মোবাইলে সতর্কবার্তা এলেই তাঁরা নিরাপদকক্ষে চলে যান। বন্দরের কর্মীরা আকাশে ছুটে যাওয়া মিসাইল-ড্রোনের ভিডিও ধারণ করেন, পরে সেগুলো দেখেন তাঁরা।
‘জাহাজ থেকে আকাশে তাকিয়ে দেখি, ইরান থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে মিসাইল-ড্রোন দুবাইয়ের দিকে ছুটে যাচ্ছে। অনেকগুলো আকাশেই ধ্বংস হচ্ছে। আবার কিছু গিয়ে আঘাত করছে—শব্দ শুনেই বোঝা যায়,’ বলেন রাশেদুল। একপর্যায়ে বন্দরের একটি টার্মিনালেও আঘাত হানে মিসাইল। তবে সেখানে কোনো জাহাজ না থাকায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো যায়।
১১ মার্চ জেবেল আলী বন্দরে পণ্য খালাস শেষ হয়। এর আগে কয়েক দিন নিরাপত্তার কারণে খালাস কার্যক্রম ব্যাহত হয়। জাহাজটিতে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় আলাদা কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়। পণ্য খালাস শেষে কুয়েতে যাওয়ার সূচি ছিল। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ছেড়ে জাহাজটি নিরাপদে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
১২ মার্চ জাহাজটি হরমুজ প্রণালির দিকে যাত্রা শুরু করে। রাশেদুল জানান, পারস্য উপসাগর থেকে বের হওয়ার একমাত্র পথ এই প্রণালি। প্রবেশমুখ থেকে প্রায় ৬৬ নটিক্যাল মাইল দূরে পৌঁছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড (আইআরজিসি) কর্তৃপক্ষকে বেতার বার্তা পাঠানো হয়, তবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
এ সময় প্রণালি এলাকায় মিসাইল দেখা যায়। ওই দিন প্রণালি অতিক্রমের সময় ছয়টি জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটে। এরপর সংযুক্ত আরব আমিরাতের কোস্টগার্ডের একটি টহল দল নিরাপত্তার কারণে এগোতে নিষেধ করে। নির্দেশনা অনুযায়ী জাহাজটি নিয়ে আবার শারজাহ নোঙর এলাকায় ফিরে যাই। এখানেও মাথার ওপর কয়েকবার ইরান থেকে মিসাইল ও ড্রোন ছুটে যাওয়ার দৃশ্য দেখছি।
মিসাইল-ড্রোনের শব্দ এখন নিত্যকার ঘটনা হয়ে গেছে। এখনো কি ভয় লাগে? হোয়াটসঅ্যাপে করা এই প্রশ্নের উত্তরে পারস্য উপসাগর থেকে রাশেদুল হাসান শোনালেন, ‘অভ্যস্ত হয়ে গেছি ভাই। প্রথম দিকে ভয় লাগত। দুজন নাবিক তো কান্নাকাটি করত। এখন সবাই অনেকটা সাহসী হয়ে গেছে। মনোবল ধরে রাখার যুদ্ধে নেমে পড়েছি সবাই।’ রাশেদুল বলেন, ‘যুদ্ধ এলাকায় মনোবল হারালে চলবে না। আমরা অন্য রকম এক যুদ্ধে আছি—এটা মনোবল ধরে রাখার যুদ্ধ।


