Last Updated on 3 days by zajira news
অনলাইন ডেস্ক, জাজিরা নিউজ: ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সম্প্রতি নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্তের পর থাইল্যান্ড, নেপাল ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিবেশী দেশ তাদের বিমানবন্দরে উচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভারত সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিলেও এ রোগ নিয়ে বাড়ছে জল্পনা।
ব্রিটিশ পত্রিকা গার্ডিয়ান লিখেছে, গত ডিসেম্বরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে প্রাণঘাতী নিপা ভাইরাসে দুজন আক্রান্ত হয়েছেন। ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় নিজেদের বিমানবন্দরগুলোতে যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুরু করেছে থাইল্যান্ড, নেপাল ও ভিয়েতনামসহ বেশ কিছু দেশ।
ভাইরাসটি পশু থেকে মানুষের দেহে ছড়ায় ও এতে মৃত্যুর হার বেশি। পশ্চিমবঙ্গে ওই দুইজনের দেহে এ ভাইরাস পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছে ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তবে তারা বলেছে, ভাইরাসটিকে ‘সময়মতো নিয়ন্ত্রণ’ করা সম্ভব হয়েছে।
আক্রান্ত রোগীদের সম্পর্কে ভারত সরকার বিস্তারিত তথ্য দেয়নি। তবে দেশটির সরকার বলেছে, ওই দুই জনের সংস্পর্শে আসা প্রায় ২০০ জনের পরীক্ষা করে নতুন কারো সংক্রমণের খবর পাওয়া যায়নি।
নিপা ভাইরাস কী এবং এটি কেন এত ভয়াবহ?
নিপা ভাইরাস মূলত শূকর ও ফলখেকো বাদুড়ের মতো প্রাণী থেকে মানবদেহে ছড়ায়। এসব প্রাণীর সরাসরি সংস্পর্শে এলে বা এদের লালা বা মলমূত্রের মাধ্যমে মানুষ আক্রান্ত হতে পারেন। মানুষের দেহে প্রবেশের পর এ ভাইরাস সাধারণত চার থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। সংক্রমণের প্রাথমিক বিভিন্ন লক্ষণ হচ্ছে, তীব্র জ্বর, বমি বমি ভাব, বমি ও শ্বাসকষ্ট, যা পরবর্তীকালে নিউমোনিয়ায় রূপ নিতে পারে।
গুরুতর ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে বিপজ্জনক প্রদাহ বা ফোলা তৈরি করে এই রোগ। যার ফলে তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব ও খিঁচুনির মতো স্নায়বিক সমস্যা দেখা দেয়। এ ভাইরাস একজন থেকে অন্য কারো দেহে ছড়ানোর হার কম হলেও একে মহামারীর জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
কারণ, এ ভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিন নেই। এর মৃত্যুর হার প্রায় ৪০ শতাংশ থেকে ৭৫ শতাংশ, যা কোভিড-১৯-এর তুলনায় বেশি।
এ রোগের প্রাদুর্ভাব হয়েছিল কবে ?
১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ার শূকর খামারিদের মধ্যে নিপা ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয়। ওই সময় এ ভাইরাসে ১০০ জনেরও বেশি মারা যান। যে গ্রামে প্রথম ভাইরাসটির খোঁজ মেলে, সেই নাম অনুসারেই এর নামকরণ হয়েছে।
এরপর থেকে প্রায় প্রতি বছরই এশিয়াজুড়ে ভারত, ফিলিপিন্স, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় এ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। বাংলাদেশে তা নিয়মিতভাবে দেখা দিয়েছে। ভারতে প্রথম নিপা রোগী শনাক্ত হয়েছিল ২০০১ সালে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে। ভারতের এ রাজ্যটির সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত রয়েছে।
বাংলাদেশে এ ভাইরাস সংক্রমণের কারণ হিসেবে কাঁচা খেজুরের রস সংগ্রহকে দায়ী করা হয়, কারণ ফলখেকো বাদুড়রা সাধারণত খেজুর গাছে বাস করে। ২০১৮ সালে ভারতের কেরালা রাজ্যে নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে অন্তত ১৭ জন মারা গিয়েছিলেন। এরপর ২০২৩ সালেও সেখানে দুইজনের মৃত্যু হয়।
কীভাবে কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে?
পশ্চিমবঙ্গে ২০০৭ সালের পর এ প্রথম নিপা রোগী শনাক্ত হওয়ায় বর্তমান পরিস্থিতিকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে ভারত কতৃপক্ষ। ভারতের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ বলেছে, “নজরদারি বাড়ানো, ল্যাবরেটরি পরীক্ষা ও মাঠ পর্যায়ে তদন্তের মাধ্যমে আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত ও ভাইরাসটিকে সময়মতো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে।”
গত ডিসেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত কেবল দুইজন রোগী শনাক্ত হয়েছে ভারতে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, “পরিস্থিতির সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে ও জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।”
তবে ভারতের বাইরে অন্যান্য দেশ বিমানবন্দর ও সীমান্তে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা জোরদার করেছে। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ায় ভারত থেকে আসা যাত্রীদের শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য জমা দেওয়ার কড়াকড়ি শুরু করেছে।
এদিকে, জরুরি প্রয়োজন ছাড়া পশ্চিমবঙ্গ সফর এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে মিয়ানমার। নিজেদের সীমান্ত এলাকায় রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরও জোরদার করেছে চীন। তবে ভারতে সংক্রমণের হার অনেক বেড়ে গেছে বলে যে খবর ছড়িয়েছে তা ‘কাল্পনিক ও ভুল’ বলে নাকচ করে দিয়েছে ভারত সরকার।


