Last Updated on 18 hours by zajira news
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, জাজিরা নিউজ; যুক্তরাজ্যের রাজা তৃতীয় চার্লসের ছোট ভাই অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর সম্প্রতি সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়াত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে সম্পর্কের জেরে নিজের ৬৬তম জন্মদিনে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। আধুনিক ইতিহাসে ব্রিটিশ রাজপরিবারের কোনো জ্যেষ্ঠ সদস্যের গ্রেপ্তারের এটিই প্রথম ঘটনা।
গত বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) ভোরে স্যান্ড্রিংহামে অ্যান্ড্রুর নিজ বাসভবনে অভিযান চালায় পুলিশ। সেখান থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। সরকারি পদে থেকে অসদাচরণের অভিযোগ আনা হয় তাঁর বিরুদ্ধে।
অ্যান্ড্রুর এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রাজা তৃতীয় চার্লস। তবে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ‘আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে।’
ইংল্যান্ডের নরফোকের একটি পুলিশ স্টেশনে দীর্ঘ ১০ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর বৃহস্পতিবার রাতে অ্যান্ড্রুকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে তদন্তের স্বার্থে যেকোনো সময় তাঁকে আবারও তলব করা হতে পারে। পুলিশ স্টেশন থেকে তাঁর বেরিয়ে যাওয়ার ছবি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
এপস্টিনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিতর্কিত সম্পর্কের কারণে অ্যান্ড্রুর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি আগেই ধূলিসাৎ হয়েছে। ১৯৯৭ সালে প্রিন্সেস ডায়ানার মৃত্যুর পর তাঁর গ্রেপ্তারের ঘটনা ব্রিটিশ রাজপরিবারের জন্য এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইংল্যান্ডের নরফোকের একটি পুলিশ স্টেশনে দীর্ঘ ১০ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর বৃহস্পতিবার রাতে অ্যান্ড্রুকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে তদন্তের স্বার্থে যেকোনো সময় তাঁকে আবারও তলব করা হতে পারে। পুলিশ স্টেশন থেকে তাঁর বেরিয়ে যাওয়ার ছবি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
এপস্টিনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিতর্কিত সম্পর্কের কারণে অ্যান্ড্রুর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি আগেই ধূলিসাৎ হয়েছে। ১৯৯৭ সালে প্রিন্সেস ডায়ানার মৃত্যুর পর তাঁর গ্রেপ্তারের ঘটনা ব্রিটিশ রাজপরিবারের জন্য এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অ্যান্ড্রুকে গ্রেপ্তারের সুনির্দিষ্ট কারণ পুলিশ এখনো প্রকাশ করেনি। তবে যুক্তরাজ্যের বিশেষ বাণিজ্যদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনের এক দশকে তিনি কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক এপস্টিনকে কোনো গোপন তথ্য দিয়েছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখার কথা আগে জানিয়েছিল পুলিশ।

২০১১ সালে এপস্টিনের সঙ্গে বন্ধুত্বের কারণে রাজকীয় দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছিলেন অ্যান্ড্রু। তখন তিনি ‘ডিউক অব ইয়র্ক’ পদে ছিলেন। অ্যান্ড্রুর এ শাস্তির আগে ২০০৮ সালে এক অপ্রাপ্তবয়স্ক নারীকে যৌন সম্পর্কে বাধ্য করার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন এপস্টিন।
সাবেক প্রিন্স অ্যান্ড্রু তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, এপস্টিনের এমন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণা ছিল না। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের (ডিওজে) সর্বশেষ প্রকাশিত নথিতে তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি পদে থেকে অসদাচরণের নতুন অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে তিনি এখন পর্যন্ত মন্তব্য করেননি।
অ্যান্ড্রুকে পূর্ব ইংল্যান্ডের নরফোকের স্যান্ড্রিংহাম এস্টেটে তাঁর নতুন বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এপস্টিন-সংক্রান্ত নথি প্রকাশের জেরে রাজা চার্লস তাঁকে লন্ডনের পশ্চিমে অবস্থিত বার্কশায়ারের উইন্ডসর এস্টেট থেকে বের করে দিয়েছিলেন। এরপর চলতি মাসের শুরুতে তিনি স্যান্ড্রিংহামের এ বাড়িতে চলে আসেন।
বৃহস্পতিবার ভোরে সাদাপোশাকে পুলিশ ও চিহ্নবিহীন গাড়ি নিয়ে স্যান্ড্রিংহামের ‘উড ফার্ম’ নামের বাসভবনটিতে অভিযান চালানো হয়। প্রায় একই সময় ইউনিফর্ম পরা পুলিশ সদস্যরা উইন্ডসরের ‘রয়্যাল লজ’–এ হানা দেন। রয়্যাল লজ প্রাসাদটি ২০০৩ সাল থেকে তাঁর স্থায়ী ঠিকানা ছিল।
টেমস ভ্যালি পুলিশ অ্যান্ড্রুকে গ্রেপ্তার করে। মূলত বার্কশায়ার এলাকায় দায়িত্ব পালন করে তারা। অথচ তাঁকে নরফোক থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যা নরফোক পুলিশের আওতাধীন। নরফোক পুলিশ সিএনএনকে জানিয়েছে, তারা টেমস ভ্যালি পুলিশের তদন্তে সহায়তা করছে।
বৃহস্পতিবার রাতে টেমস ভ্যালি পুলিশ জানায়, স্যান্ড্রিংহামে তাদের তল্লাশি শেষ হলেও উইন্ডসরের বাড়িতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
২০১১ সালে বাণিজ্যদূতের পদ ছাড়ার পর জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন পর্যালোচনার মুখে ছিলেন অ্যান্ড্রু। ২০১৯ সালে বিবিসি নিউজ নাইটের সঙ্গে এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগের জবাব দেন।
এপস্টিন দোষী সাব্যস্ত হওয়ার দুই বছর পর ২০১০ সালে নিউইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কে তাঁর সঙ্গে অ্যান্ড্রুর একটি ছবি প্রকাশিত হয়। এ প্রসঙ্গে অ্যান্ড্রু ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, ওই কলঙ্কিত অর্থ বিনিয়োগকারীর সঙ্গে বন্ধুত্ব শেষ করতেই তিনি তখন নিউইয়র্ক যান। তবে তিনি সেখানে এপস্টিনের প্রাসাদে কেন বেশ কয়েক দিন অবস্থান করেন, এ প্রশ্নের জবাবে সাবেক এ প্রিন্স বলেন, এটি তাঁর জন্য ‘সুবিধাজনক’ ছিল। এ ছাড়া সরাসরি কথা বলে বন্ধুত্ব শেষ করাকে তিনি ‘সম্মানজনক ও সঠিক’ বলে মনে করেছিলেন।
ভার্জিনিয়া জিউফ্রে নামের এক নারী ২০১৫ সালে অভিযোগ করেন, ১৭ বছর বয়সে তাঁকে সাবেক এই প্রিন্সের সঙ্গে তিনবার যৌন সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য করা হয়েছিল। তবে অ্যান্ড্রু দাবি করেন, জিউফ্রের সঙ্গে তাঁর দেখা হওয়ার কোনো ‘স্মৃতি নেই’। এপস্টিনের একসময়ের বান্ধবী গিলেন ম্যাক্সওয়েলের বাড়িতে জিউফ্রের সঙ্গে ২০০১ সালের একটি ছবিতে অ্যান্ড্রুকে দেখা যায়। কিন্তু তাঁর দাবি, ছবিটি নকল হতে পারে।
যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এনে ২০২১ সালে নিউইয়র্কের একটি আদালতে অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে মামলা করেন জিউফ্রে। তাঁর সঙ্গে কখনো দেখা হয়নি বলে দাবি করলেও ২০২২ সালে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে মামলাটি নিষ্পত্তি করেন অ্যান্ড্রু।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিজের কোনো অপরাধ স্বীকার না করেই জিউফ্রেকে বিরাট অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করেছিলেন তিনি। ভার্জিনিয়া জিউফ্রে ২০২৫ সালের এপ্রিলে আত্মহত্যা করেন। তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত স্মৃতিকথায় অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে আরও কিছু অভিযোগ সামনে আসে। এর জের ধরে গত অক্টোবর মাসে ছোট ভাই অ্যান্ড্রুর ‘প্রিন্স’ বা রাজপুত্র উপাধি কেড়ে নেন রাজা চার্লস।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ এপস্টিন-সংশ্লিষ্ট কিছু ছবি প্রকাশের পর অ্যান্ড্রুর কেলেঙ্কারি নতুন করে দানা বাঁধে। ছবিগুলোতে দেখা যায়, মেঝেতে শুয়ে থাকা এক নারী বা কিশোরীর ওপর হাঁটু গেড়ে ঝুঁকে আছেন অ্যান্ড্রু।
অ্যান্ড্রুর গ্রেপ্তারের খবর শুনে রাজা চার্লস ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেন। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘আইন তার নিজ গতিতে চলবে।’ সিএনএন জানতে পেরেছে, প্রিন্স উইলিয়াম ও প্রিন্সেস অব ওয়েলস কেট মিডলটন রাজার এ বক্তব্য সমর্থন করেছেন।
এক বিবৃতিতে রাজা নিজেকে অ্যান্ড্রু থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছেন। তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অ্যান্ড্রুকে নিজের ‘ভাই’ হিসেবে উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকেন। একই সঙ্গে রাজপরিবারের অন্য সদস্যদের এই বিতর্ক থেকে সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করেন। চার্লস লিখেছেন, ‘আমি ও আমার পরিবার দেশ এবং আপনাদের সেবায় নিয়োজিত থাকব।’
অ্যান্ড্রুর গ্রেপ্তারের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রে ভিন্ন রকমের আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের সাবেক রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান মার্জোরি টেলর গ্রিন অভিযোগ করেন, এপস্টিনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রে জবাবদিহির অভাব চোখে পড়ছে।
ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি জেক অচিনক্লসও একই সুরে সিএনএনকে বলেন, ‘যুক্তরাজ্য তাদের ক্ষমতাধর ও বিশেষ সুবিধাভোগীদের জবাবদিহির আওতায় আনছে। যুক্তরাষ্ট্রেরও একই কাজ করা উচিত।’ অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অ্যান্ড্রুর গ্রেপ্তারকে ‘লজ্জাজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন। তবে তিনি এপস্টিনের সঙ্গে নিজের আগের সম্পর্কের বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন।
জর্জিয়া যাওয়ার পথে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বহনকারী উড়োজাহাজ এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমি মনে করি, এটি লজ্জার। এটি খুবই দুঃখজনক। ব্রিটিশ রাজপরিবারের জন্য এটি খুব একটি খারাপ ঘটনা।’
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প রাজা চার্লসের ওপর এ ঘটনার প্রভাব নিয়েও দুঃখ প্রকাশ করেন। এপ্রিলে চার্লসের যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে। ট্রাম্প বলেন, ‘তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে যা ঘটছে, তা খুব দুঃখজনক। (রাজা) খুব শিগগির আমাদের দেশে আসছেন। রাজা একজন অসাধারণ মানুষ।’
ভার্জিনিয়া জিউফ্রের পরিবার টেমস ভ্যালি পুলিশের প্রতি ‘কৃতজ্ঞতা’ প্রকাশ করেছে। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, ‘আজ আমাদের ভাঙা হৃদয় নতুন করে স্বপ্ন দেখছে। এই খবর প্রমাণ করেছে, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন, এমনকি রাজপরিবারও নয়। তিনি কখনো রাজপুত্র ছিলেন না। সারা বিশ্বের ভুক্তভোগীদের জন্য ভার্জিনিয়া এ লড়াই চালিয়ে গেছেন।’
এপস্টিনের ভুক্তভোগীদের আইনজীবীদের অন্যতম স্পেন্সার টি কুভিন বলেন, ‘যাঁরা একসময় ভেবেছিলেন, বিচার পাওয়া অসম্ভব—অ্যান্ড্রুর এ গ্রেপ্তার সেসব মানুষের মনে বিচারের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে।’
অ্যান্ড্রুর গ্রেপ্তার ব্রিটিশ রাজপরিবারের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা। এর আগে সপ্তদশ শতাব্দীতে রাজা প্রথম চার্লসকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এরপর ব্রিটিশ রাজপরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্য হিসেবে অ্যান্ড্রুই প্রথম গ্রেপ্তার হলেন।
ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধে সংসদীয় বাহিনীর কাছে রাজকীয় বাহিনীর পরাজয়ের পর প্রথম চার্লসকে ১৬৪৭ সালে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এর দুই বছর পর তাঁর বিচার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল।
তবে ২০০২ সালে অ্যান্ড্রুর বোন প্রিন্সেস অ্যানের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তাঁর পোষা কুকুর দুই শিশুকে কামড় দেওয়ায় তাঁকে আদালতে হাজিরা ও জরিমানা দিতে হয়েছিল। কিন্তু তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। সূত্র, প্রথম আলো

