Last Updated on 3 months by zajira news
জাজিরা নিউজ ডেস্ক: ভারতের হাই কমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলব করে দিল্লিতে বাংলাদেশ হাই কমিশরের বাইরের ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ ঘটনা এবং শিলিগুড়িতে বাংলাদেশ ভিসা সেন্টারে ভাঙচুরের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
মঙ্গলবার (২৩ ডিসেম্বর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, কূটনৈতিক স্থাপনায় এরকম ‘পরিকল্পিত সহিংসতা এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের মত কর্মকাণ্ডের’ তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
“এ ধরনের ঘটনা কেবল কূটনৈতিক মিশনের কর্মীদের নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলে না, বরং পারস্পরিক সম্মান, শান্তি ও সহনশীলতার নীতিকেও ক্ষুণ্ন করে।”
এর আগে ভারতের হাই কমিশনার প্রণয় ভার্মাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম।
এ নিয়ে ১০ দিনের মধ্যে দ্বিতীয়বার ঢাকার ভারতীয় হাই কমিশনারকে তলবের ঘটনা ঘটল। এর আগে জুলাই অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধে প্রাণদণ্ড পাওয়া শেখ হাসিনা এবং জুলাই আন্দোলনের নেতা শরীফ ওসমান বিন হাদিকে গুলিবর্ষণকারীদের গ্রেপ্তারে সহযোগিতা চেয়ে ১৪ ডিসেম্বর তলব করা হয়েছিল প্রণয় ভার্মাকে।
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদির হত্যার প্রতিবাদে ক্ষোভ বিক্ষোভের মধ্যে গত বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকায় দুটি পত্রিকা অফিস এবং ছায়ানট ভবনে হামলা হয়। সেই রাতে চট্টগ্রামে ভারতীয় সহকারী হাই কমিশন কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে একদল মানুষ বিক্ষোভ দেখায়, সেসময় মিশনে ঢিলও ছোড়া হয়।
এরপর চট্টগ্রামে ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রের (আইভ্যাক) কার্যক্রম রোববার থেকে পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত করা হয়।
এদিকে বৃহস্পতিবার রাতেই ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ভালুকার একটি কারখানার শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে (২৮) পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর তার লাশ গাছের ডালের সঙ্গে বেঁধে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
এরপর শনিবার রাতে দিল্লিতে ‘অখণ্ড হিন্দু রাষ্ট্রসেনা’ নামের এক সংগঠনের ২০-২৫ জন সদস্য বাংলাদেশ হাই কমিশনের সামনে বিক্ষোভ করে। তারা সেখানে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয় এবং বাংলাদেশের হাই কমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহকে হুমকি দেয় বলে অভিযোগ ওঠে।
দিল্লিতে বাংলাদেশ হাই কমিশনের প্রেস মিনিস্টার মো. ফয়সাল মাহমুদকে উদ্ধৃত করে রোববার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, “বাংলা ও হিন্দি মিলিয়ে কিছু কথাবার্তা (তারা) বলছে- হিন্দুদের নিরাপত্তা দিতে হবে; হাই কমিশনারকে ধরো। পরে তারা মেইন গেটের সামনে এসে কিছুক্ষণ চিৎকার করে। ওরা চিৎকার করে চলে গেছে- এতটুকুই আমি জানি।”
সেই খবরের প্রতিক্রিয়ায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রাণধীর জয়সওয়াল রোববার এক বিবৃতিতে বলেন, “বাংলাদেশের কিছু গণমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর প্রপাগান্ডা আমরা দেখেছি। সত্যটা হচ্ছে, ২০ ডিসেম্বর ২০-২৫ জন যুবক নয়া দিল্লিতে বাংলাদেশ হাই কমিশনের সামনে জড়ো হয়ে ময়মনসিংহে দীপু চন্দ্র দাসের নৃশংস হত্যার প্রতিবাদে স্লোগান দিয়েছে এবং বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার আহ্বান জানিয়েছে। “নিরাপত্তা বেষ্টনী লঙ্ঘন কিংবা নিরাপত্তা পরিস্থিতি তৈরির মত কোনো প্রচেষ্টা সেখানে ছিল না।”
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে জয়সওয়াল বলেন, “কয়েক মিনিট পরই ওই দলটিকে ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশ সদস্যরা। এই ঘটনার ভিডিও প্রমাণ প্রকাশিত হয়েছে।”
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী বিদেশ মিশন বা কার্যালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারত অঙ্গীকারাবদ্ধ।
ভারতের ওই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন রোববার সাংবাদিকদের বলেন, দিল্লিতে কূটনৈতিক এলাকার গভীরে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনের সামনে ‘হিন্দু চরমপন্থি সংগঠনের বিক্ষোভকারীদের আসার সুযোগ করে দেওয়া’ হয়েছে।
“ভারতীয় প্রেসনোটে যে কথা বলা হয়েছে, এটা আমরা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করছি। আমরা সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করি এজন্য যে, বিষয়টি যত সহজভাবে উত্থাপন করা হয়েছে, আসলে অত সহজ না।”
তিনি বলেন, “আমাদের মিশন, বাংলাদেশের মিশন কূটনৈতিক এলাকার গভীরে অবস্থিত। এমন না যে এটা বাইরে কোনো জায়গায় অথবা কূটনৈতিক এলাকার শুরুতে, তা কিন্তু না। তারা বলছে ২০-২৫ জনের একটা দল, হতে পারে। হয়ত একটু কম বেশি হতেও পারে সংখ্যাটা। কিন্তু সেটা কথা না।
“একটা হিন্দু চরমপন্থি সংগঠনের ২৫ বা ৩০ জনের একটা দল এতদূর পর্যন্ত আসতে পারবে কেন, একটা স্যানিটাইজড এলাকার মধ্যে? তার মানে তাদেরকে আসতে দেওয়া হয়েছে তাইলে। যেভাবে হোক তারা এসেছে, আসতে পারার কথা না কিন্তু নরমালি।”
উপদেষ্টা বলেন, “সেখানে তারা দাঁড়িয়ে যে শুধু ওই হিন্দু নাগরিকের হত্যার প্রতিবাদে স্লোগান দিয়ে চলে গেছে, তা না। তারা আরো অনেক কিছু বলেছে, সেটা আমরা জানি। এবং আমাদের পত্রপত্রিকায় যে রিপোর্টটা আসছে, সেটাকে যে তারা বলতেছে যে ‘মিসলেডিং’, এটাও সত্য না।
“আমাদের পত্রপত্রিকায় মোটামুটি সঠিক রিপোর্টই এসেছে, যেটুকু আমরা তথ্য পেয়েছি। আমার কাছে প্রমাণ নেই যে তাকে (হাই কমিশনার) হত্যার হুমকি দিয়েছে, কিন্তু আমরা এটাও শুনেছি যে, তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। সেটা কেউ একজন কথা বলল, সেটার মধ্যে হতে পারে।”
সমকাল লিখেছে, সোমবার শিলিগুড়িতে বাংলাদেশ ভিসা সেন্টারে তালা দিয়ে বিক্ষোভ করে বেশ কয়েকটি সংগঠন। এর মধ্যে দিল্লিতে বাংলাদেশ হাই কমিশন কনস্যুলার সেবা ও ভিসা দেওয়ার কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বন্ধ করা হয়েছে আগরতলায় সহকারী হাইকমিশন ও শিলিগুড়িতে বাংলাদেশ ভিসা সেন্টারের ভিসা সেবাও।
শিলিগুড়িতে বাংলাদেশের ভিসা সেন্টারে বিভিন্ন ‘চরমপন্থি গোষ্ঠী’ ভাঙচুরও চালায় বলে ভাষ্য বাংলাদেশের।
প্রণয় ভার্মাকে তলব করার পর রোববার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, কূটনৈতিক স্থাপনায় ‘পরিকল্পিত সহিংসতা এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো কর্মকাণ্ডের’ পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত, পুনরাবৃত্তি রোধে যথাযথ পদক্ষেপ এবং ভারতে থাকা বাংলাদেশের সব কূটনৈতিক মিশন ও এ সংক্রান্ত স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিতে আহ্বান ভারত সরকারকে জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
“বাংলাদেশ প্রত্যাশা করছে, কূটনৈতিক ব্যক্তি ও স্থাপনার মর্যাদা ও সুরক্ষা বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক দায়বদ্ধতা মেনে ভারত সরকার দ্রুততার সঙ্গে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।” সূত্র, বিডিনিউজ

