Last Updated on 1 hour by zajira news
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, জাজিরা নিউজ: শেষ মুহূর্তেও নিজের জীবন নয়, দুই বছর বয়সী ছোট্ট মেয়ের জীবনটাই বেছে নিয়েছিলেন তিনি। ভয়াবহ ভূমিকম্পে চারদিকে যখন ভবন ধসে পড়ছে, মৃত্যুর আশঙ্কা বাড়ছে, তখনো সন্তানকে বুকের মধ্যে আগলে রেখেছিলেন মা আন্দ্রেয়া।
আর সেই আলিঙ্গনই বাঁচিয়ে দিয়েছে একরত্তি শিশু আলানাকে। তবে এই মা মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে আসতে পারেননি। ধ্বংসস্তূপের নিচে মায়ের নিথর দেহ মিললেও অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছে তাঁদের ছোট্ট মেয়ে আলানা।
সন্তানকে বাঁচিয়ে আন্দ্রেয়ার মৃত্যুর খবরটি সামাজিক যোগাযোগেরমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে জানিয়েছেন তাঁর স্বামী ভেনেজুয়েলার পেশাদার ফুটবলার হেক্টর বেলো। বেলো দেশটির দ্বিতীয় বিভাগের ফুটবল ক্লাব মারিতিমো দে লা গুয়াইরার হয়ে খেলেন।
ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পের অসংখ্য হৃদয়বিদারক ঘটনার মধ্যে এটি এখন সবচেয়ে আলোচিত একটি ঘটনা।
ভেনেজুয়েলায় গত বুধবার সন্ধ্যায় শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্প আঘাত হানে। ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি ভূমিকম্পে রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ধসে পড়ে বহু ভবন। এতে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে ৯২০ জনে দাঁড়িয়েছে। তিন হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
ভেনেজুয়েলায় এক শতাব্দীর বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ এই ভূমিকম্পে বহু ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া লোকজনকে উদ্ধারে ধীরগতির জন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
ইনস্টাগ্রাম পোস্টে স্ত্রীর মৃত্যুর খবর জানিয়ে বেলো লিখেছেন, একদিন তিনি মেয়েকে জানাবেন, কীভাবে তার মা নিজের জীবন দিয়ে তাকে রক্ষা করেছিলেন।
বেলো লিখেছেন, ‘আমার ভালোবাসা, একদিন আমাদের মেয়েকে সেই গল্প বলব, কীভাবে তুমি তাকে বাঁচিয়েছিলে। কীভাবে তুমি মেয়ের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলে। কীভাবে তুমি ছিলে এক সাহসী নারী, যে শেষনিঃশ্বাস পর্যন্তও তাকে ছেড়ে দেয়নি।’
গতকাল শুক্রবার রাতে দেওয়া আরেকটি পোস্টে বেলো জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের পর কারাকাসে হাসপাতালে ছুটে যান তিনি। ওই হাসপাতালে তাঁর মেয়ে বর্তমানে চিকিৎসাধীন আছে।
তিনি লিখেছেন, ‘আমার মেয়ে ও তার খালা ভালো আছে। আজ তাদের হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হবে না। তাদের আরও কিছুদিন হাসপাতালে থাকতে হবে। এই অসীম কষ্টের সময়ে আমাকে সমর্থন দেওয়ার জন্য আপনাদের সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ।’
স্ত্রী হারানোর শোক সামলাতে না পেরে ইনস্টাগ্রামে একাধিক পোস্ট করেছেন বেলো। একটি পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘আমি কীভাবে মেয়েকে বোঝাব, তাকে বাঁচাতে গিয়ে তুমি নিজের জীবন হারিয়েছ, আর আমি সেখানে কিছুই করতে পারিনি? আমি তাকে কীভাবে এটা বোঝাব? আমাকে এখন শক্তি দাও।’
ভেনেজুয়েলার স্থানীয় ফুটবলবিষয়ক সংবাদ ও প্রচার সংস্থা কুমানা দে কাম্পেওনেস জানিয়েছে, ভূমিকম্পে ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে আন্দ্রেয়ার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে একই ভবনে থাকা তাঁদের মেয়েকে জীবিত উদ্ধার হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্প্যানিশ ভাষার সংবাদমাধ্যম ইউনিভিশনও তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে।
ভেনেজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পে প্রাণ হারিয়েছেন আরও অনেকে। ৫০ হাজারের বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে দুজন ফুটবলারও আছেন।
কারাকাস ফুটবল ক্লাব জানিয়েছে, তাদের অনূর্ধ্ব–১৮ দলের খেলোয়াড় রাজান সিজা লা গুইরায় নিজ বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিহত হয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ক্লাবটি বলেছে, ‘তাঁর হাসিমুখ, নিষ্ঠা ও সহমর্মিতা আমাদের প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি পদক্ষেপে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’ কারাকাসভিত্তিক ক্লাব স্পোর্ট সান আগুস্তিন ইনস্টাগ্রামে জানিয়েছে, ভূমিকম্পে তাদের একাডেমির খেলোয়াড় ভিক্টর পালাসিওসও প্রাণ হারিয়েছেন।
ভেনেজুয়েলা ফুটবল ফেডারেশন (এফভিএফ) জানিয়েছে, পালাসিওস মারিতিমো দে লা গুইরা ক্লাবের হয়েও খেলেছিলেন।
সাবেক মিস ভেনেজুয়েলা জিসেল রেয়েসও ইনস্টাগ্রামে জানিয়েছেন, লা গুইরায় ভূমিকম্পে তাঁর মায়ের ভবন পুরোপুরি ধসে পড়েছে। ভূমিকম্পের তীব্র ধাক্কা ও আতঙ্কে হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। জীবিত উদ্ধার হওয়ার পর এ খবর জানিয়েছেন তাঁর দেখভাল করা নার্স।

