Last Updated on 1 min by zajira news
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, জাজিরা নিউজ: গেল শনিবার ইরানে হামলা শুরুর ঘণ্টা তিনেকের মধ্যে পাল্টা হামলার শিকার হয় যুক্তরাষ্ট্র। বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে তেহরান। কোনো কোনো ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
যুদ্ধ শুরুর দ্বিতীয় দিন রোববার কুয়েতে একটি কমান্ড সেন্টারে ইরানি ড্রোন হামলায় নিহত হয় অন্তত ছয় মার্কিন সেনা; আহত হয় কয়েকজন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনের খবর অনুযায়ী, ইরান থেকে ধেয়ে আসা ড্রোনটি সম্পর্কে মার্কিন বাহিনী আগাম কোনো সতর্কবার্তা পায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রেরই আরেক সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ বলছে, ওই স্থাপনা ঘিরে যে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ছিল, তা গাড়িবোমা ঠেকাতে পারলেও ওপর থেকে চালানো হামলা রুখে দেওয়ার মতো ছিল না। এক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তার বরাতে সংবাদমাধ্যমটি লিখেছে, “সেখানে ড্রোন ঠেকানোর মতো কোনো সক্ষমতাই ছিল না।”
চলতি সপ্তাহে সংবাদ সম্মেলনে এসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ অবশ্য এই দুর্বলতাকে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করেন। মার্কিন সক্ষমতা তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, “আপনার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আছে, অনেক কিছু ধেয়ে আসছে এবং আপনি তার বেশির ভাগই ধ্বংস করছেন। “দুর্ভাগ্যবশত মাঝে মাঝে দুয়েকটি, যাকে আমরা ‘স্কুইর্টার’ বলি, তা প্রতিরক্ষা ভেদ করে চলে আসতে পারে।”

কিন্তু ইরানের এত কাছে অবস্থিত একটি স্থাপনায় প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করতে না পারাটা পরিকল্পনার বড় ধরনের গাফিলতি হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট অ্যান্ড্রিউসের ‘স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের’ অধ্যাপক ফিলিপ পেসন ও’ব্রাইন বলেন, “যখন কোনো ব্যবস্থার পতন শুরু হয়, তখন প্রাথমিক লক্ষণগুলো সাধারণত সূক্ষ্মই হয়।”
ইতিহাস থেকে উদাহরণ টানতে গিয়ে ‘দ্য আটলান্টিক’ সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, “তৃতীয় শতাব্দীতে রোমান সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি যখন চূড়ায় পৌঁছায়, তখন থেকেই রোমান সমাজে সাক্ষরতার হার কমতে শুরু করেছিল।
“শিক্ষার স্তর শুধু সাধারণ সৈন্যই নয়, কর্মকর্তা, অভিজাত, এমনকি সম্রাটদের মধ্যেও কমতে থাকে। এর বহু বছর পরেও রোমান বাহিনীকে দেখতে শক্তিশালী মনে হতো। কারণ তাদের সরঞ্জাম ছিল উন্নত এবং তারা শৃঙ্খলাবদ্ধই ছিল। কিন্তু প্রতিপক্ষের চেয়ে এগিয়ে থাকলেও শক্তির ব্যবধান কমতে থাকে।”
গত শনিবার থেকে এখন পর্যন্ত বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরান। এসব দেশ যে হিসাব দিয়েছে, তাতে গত ছয় দিন এই পাঁচ দেশ লক্ষ্য করে অন্তত ৩৮০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান। ড্রোন হামলার সংখ্যা দেড় হাজারের কাছাকাছি। এরমধ্যে দুটি দেশের একাধিক কর্মকর্তা মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ তুলেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি সংবাদ সংস্থাকে এসব কর্মকর্তা বলেছেন, ইরানে হামলা চালানোর বিষয়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী আগে থেকে কোনো সতর্কবার্তা দেয়নি। এছাড়া এই যুদ্ধ যে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িতে পড়তে পারে, সেই শঙ্কার কথাও জানায়নি তারা। আরব দেশের এক কর্মকর্তা বলেন, মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর কাছ থেকে তারা ‘যথেষ্ট সুরক্ষা’ পাচ্ছে না।
সামরিক সক্ষমতায় যুক্তরাষ্ট্র এখনও ইরানের চেয়ে অনেক এগিয়ে। কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন বিমান হামলার কিছু ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক দুর্বলতা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতিপক্ষের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের যে সামরিক আধিপত্য, সেটা মূলত কঠোর প্রশিক্ষণ ও উন্নত প্রযুক্তির উপরেই গড়ে ওঠা।কিন্তু প্রশিক্ষণ ও আত্মসমালোচনার পরিবর্তে ‘প্রাণঘাতী শক্তি’ আর ‘যোদ্ধা মনোভাব’ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে জোর দিয়ে আসছেন ট্রাম্পের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ। এমনকি তিনি মার্কিন সামরিক সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোর্স করার সুযোগও বন্ধ করে দিয়েছেন।
কিন্তু ও’ব্রাইন মনে করছেন, “গত সপ্তাহের ঘটনাগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে, শুধু শক্তি থাকলেই অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিপক্ষকে পরাজিত করাটা সবসময় সম্ভব নাও হতে পারে।” সম্প্রতি ইরানের ড্রোন বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরে ঢুকে পড়েছিল, যেখানে বসে পৃথিবীর ২৫ লাখ বর্গমাইল সমুদ্র এলাকায় নজরদারি চালায় যুক্তরাষ্ট্র।
আটলান্টিক লিখেছে, ড্রোনটি সেখানকার রাডার ইউনিট ধ্বংস করে দেয়, যা মার্কিন বাহিনী আকাশপথ পর্যবেক্ষণের কাজে ব্যবহার করত। ও’ব্রাইন বলেন, “ইরানের তৈরি ৩০ হাজার ডলারের একটি ড্রোন মুহূর্তেই আমেরিকার কয়েক কোটি ডলার মূল্যের একটি সামরিক ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিল।”

তেহরানের সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্রগুলোর একটি হলো ‘সুইসাইড ড্রোন’। ইউক্রেইনের বিরুদ্ধে এই ড্রোন ব্যবহার করে রাশিয়া ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে। ইরান যুদ্ধে মার্কিন বাহিনীর আরও কিছু দুর্বলতাও দেখতে পাচ্ছেন বিশ্লেষকরা।
রোববার কুয়েতের আকাশে একটি ‘ফ্রেন্ডলি-ফায়ারে’ (নিজেদের মধ্যেই গোলাগুলি) যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি ‘এফ-১৫ই’ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়। এটি মার্কিন বিমান বাহিনীর হাতে থাকা উন্নত যুদ্ধবিমানগুলোর একটি। এই ঘটনাকে ‘রহস্যজনক’ ও ‘অস্বস্তিকর’ হিসেবে অভিহিত করে ও’ব্রাইন বলেন, “বিমান তিনটি কি এত কাছাকাছি উড়ছিল যে সবগুলোকে একসঙ্গে ধ্বংস করা সম্ভব হলো?
“কুয়েতি মিত্রদের সঙ্গে আমেরিকান বাহিনীর যোগাযোগ কতটা ভালো ছিল? সম্ভবত এটি যুদ্ধের উত্তেজনায় কোনো ভুল বোঝাবুঝির ফল, তবে অন্যান্য দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে চলার ক্ষেত্রে ট্রাম্প বাহিনীর সক্ষমতা প্রশ্নের মুখে পড়ে গেছে।”
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে অন্যান্য সরকারের সঙ্গে সামরিক ও কূটনৈতিক জোট গঠন করা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির প্রধান উৎস।
কিন্তু ইরানে হামলার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের একমাত্র মিত্র হিসেবে আছে ইসরায়েল। অন্যদিকে দীর্ঘ দিনের অনেক মিত্র, বিশেষ করে ইউরোপকে ট্রাম্প দূরে ঠেলে দিচ্ছেন। মিত্রদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরির প্রভাব এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইউরোপের তিন শক্তিশালী দেশ— জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের নেতারা ঘোষণা করেছেন যে, তারা এই হামলায় অংশগ্রহণ করছেন না।ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক শীর্ষ কর্মকর্তা এক বিবৃতিতে বলেছেন, “মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী অত্যন্ত বিপজ্জনক।” ইচ্ছা না থাকার পরও যুক্তরাজ্য অবশ্য সাইপ্রাসে যুক্তরাষ্ট্রেকে একটি ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিতে রাজি হয়েছে। কিন্তু এই সীমিত সাহায্য ট্রাম্প প্রশাসনকে হতাশ করেছে।
চলতি সপ্তাহেই ইউরোপ-আমেরিকার ‘বিশেষ সম্পর্ক’ নিয়ে উপহাস করে ট্রাম্প বলেছেন, সম্পর্ক ‘নিশ্চিতভাবেই আগের মতো নেই’।হেগসেথের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা ‘হাহুতাশ করছে’ এবং শক্তির ব্যবহার নিয়ে ‘দ্বিধায় আছে’।
ও’ব্রাইন মনে করেন, “ইউরোপের এমন প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প বা হেগসেথ, কেউই অবাক হননি। কারণ ট্রাম্প সবসময় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি ঘনিষ্ঠতা দেখিয়ে আসছেন, যাকে ইউরোপ নিজেদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি মনে করে। এছাড়া ট্রাম্প ইউরোপের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড কেড়ে নেওয়ার চেষ্টাও করছেন।
“যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ এখনও একে অপরকে মিত্র বলে ডাকতে পারে, কিন্তু সম্পর্কে ফাটল ধরার চিহ্নগুলো স্পষ্ট।” ও’ব্রাইন বলেন, “পতন শুরুর পরও রোমান সাম্রাজ্য যেমন দুই শতাব্দী টিকে ছিল, তেমনি মার্কিন সাম্রাজ্যও এখনই ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে নেই।
“কিন্তু যথাযথ পরিকল্পনা, দক্ষতা ও কূটনীতি বর্জনের যে পথ ট্রাম্প বেছে নিয়েছেন, তার নেতিবাচক প্রভাব এরই মধ্যে পড়তে শুরু করেছে বাস্তবজগতে ।”


