Last Updated on 2 days by zajira news
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, জাজিরা নিউজ: যৌন অপরাধী এপস্টিন এর সাথে সম্পর্কিত লাখ লাখ নতুন ফাইল প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ। এর মাধ্যমে সরকারের দিক থেকে এ বিষয়ে সবচেয়ে বড় সংখ্যায় নথি প্রকাশ করা হলো।
শুক্রবার কুখ্যাত আমেরিকান যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টিন সংক্রান্ত আরও বেশ কিছু নথি প্রকাশ করেছে আমেরিকান বিচার বিভাগ। এরই মধ্যে একটি নথিতে উল্লেখ রয়েছে মোদীর নাম। এই নথি প্রকাশ্যে আসার পরে স্বাভাবিক ভাবেই জাতীয় রাজনীতিতে হইচই পড়ে গিয়েছে। শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।
নথিটি বস্তুত ২০১৭ সালের একটি ইমেল। আর এই ইমেলকে হাতিয়ার করেই প্রধানমন্ত্রীর কড়া সমালোচনা করা শুরু করেছে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস। অন্যদিকে, ভারত সরকার এই বিষয়টিকে এক ‘অপরাধীর আবোলতাবোল বকবকানি’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ৯ জুলাই এই ইমেলটি পাঠিয়েছিল আমেরিকান ধনকুবের তথা কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টিন। জেবর ওয়াই নামে এক ব্যক্তিকে ইমেলটি করেছিল এপস্টিন। সে সম্ভবত এপস্টিনের ঘনিষ্ঠ বৃত্তের এক ব্যক্তি।
ইমেলটিতে লেখা ছিল, ‘ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মোদী পরামর্শ মেনে চলেছেন এবং আমেরিকান প্রেসিডেন্টের সুবিধার্থে ইসরাইলে নাচ ও গান করেছেন। কয়েক সপ্তাহ আগে তাদের দেখা হয়েছিল। এটি কাজ করেছে!’
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের জুন মাসে ইসরাইল সফরে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। সেটিই ছিল কোনও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ইসরাইল সফর। ঠিক তার আগেই জুন মাসের শেষে আমেরিকায় গিয়েছিলেন মোদী। সেই সময়ে আমেরিকার মসনদে ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ইমেলটি শেয়ার করে কংগ্রেস অত্যন্ত গুরুতর কিছু অভিযোগ করেছে। কংগ্রেসের দাবি অনুযায়ী: ২০১৭ সালের জুন মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সময়ে জেফ্রি এপস্টিনের সঙ্গেও মোদীর কোনও যোগাযোগ হয়ে থাকতে পারে।
এর ঠিক এক সপ্তাহ পরেই, ৪ থেকে ৬ জুলাই প্রধানমন্ত্রী মোদী ইসরাইল সফরে ছিলেন। কংগ্রেসের দাবি, এপস্টিনের ইমেলে উল্লিখিত ‘পরামর্শ’ মেনেই প্রধানমন্ত্রীর সফর বা সেখানে প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচি ঠিক করা হয়েছিল।
শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এক সাংবাদিক সম্মেলনে এই সমস্ত অভিযোগ ও জল্পনাকে কড়া ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছেন। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী মোদীর ২০১৭ সালের ইসরাইল সফর ছিল এক ঐতিহাসিক এবং আনুষ্ঠানিক সরকারি সফর।
একজন দণ্ডিত অপরাধীর (এপস্টিন) ব্যক্তিগত ইমেলে কী লেখা আছে, তা কোনও গুরুত্ব পাওয়ারই যোগ্য নয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় এই ইমেলের বিষয়বস্তুকে ‘trashy ruminations’ বা ‘একজন অপরাধীর আবোলতাবোল বকা’ আখ্যা দিয়ে, তা চরম অবজ্ঞার সঙ্গে খারিজ করা উচিত বলে জানিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এপস্টিন এই ইমেলে ‘নাচ ও গান’ বলতে আক্ষরিক কোনও নাচগানের পারফরম্যান্স নয়, কোনও কূটনৈতিক পদক্ষেপ বা রাজনৈতিক বোঝাপড়ার রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ, এপস্টিনের পরামর্শ মেনে আমেরিকার স্বার্থে কাজ করেছিলেন মোদী, এটাই বলতে চেয়েছেন এপস্টিন।
বর্তমানে ‘এপস্টিন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট’-এর অধীনে আমেরিকার সরকার এই সংক্রান্ত এপস্টিন সম্পর্কিত প্রায় ত্রিশ লাখ পাতা, ১ লাখ ৮০ হাজার ছবি এবং ২ হাজার ভিডিও শুক্রবার প্রকাশ করা হয়েছে। প্রকাশ করা নথিপত্রগুলোতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম এসেছে শত শত বার।। সেই বিপুল তথ্যের ভাণ্ডার থেকেই প্রধানমন্ত্রীর নাম সম্বলিত এই ইমেলটি সামনে এসেছে। বর্তমানে এই বিষয়কে কেন্দ্র করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে আলোচনার ঝড় বইছে। ভারতীয় রাজনীতিতে এই ইমেলের প্রভাব কতদূর পড়ে, এখন সেটাই দেখার।
সব নথিপত্র প্রকাশে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বাক্ষরিত আইনের সময়সীমা উত্তীর্ণ হবার ছয় সপ্তাহ পরে এসে এগুলো প্রকাশ করা হলো। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্লাঞ্চ বলেছেন, “এগুলো আজ প্রকাশের মাধ্যমে দীর্ঘ ও বিস্তারিতভাবে নথি খুঁজে বের করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কাছে আইন মেনে চলা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য এগুলোর যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলো”।
এই নথিগুলোর মধ্যে আছে জেফরি এপস্টেইনের কারাগারের থাকার সময়ের বিস্তারিত তথ্য যার মধ্যে তার মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক রিপোর্ট ও জেলে থাকার সময়ে মৃত্যুর তথ্য আছে। এছাড়া এপস্টিনের সহযোগী গিসলেন ম্যাক্সওয়েলের বিরুদ্ধে তদন্তের নথিও আছে এর মধ্যে। ম্যাক্সওয়েলকে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের পাচারে এপস্টেইনকে সাহায্য করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল।

প্রকাশিত নথিপত্রের মধ্যে এপস্টেইন ও বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির মধ্যে আদান-প্রদান করা ই-মেইলও রয়েছে। নতুন প্রকাশ করা নথিগুলোতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম এসেছে কয়েক শত বার। ট্রাম্পের সাথে এপস্টিনের বন্ধুত্ব ছিল। তবে তিনি বলেছেন সেটি চুকে গেছে বহু বছর আগেই এবং তার যৌন অপরাধ বিষয়েও তার কিছু জানা ছিলো না বলে দাবি করেছেন ট্রাম্প।
প্রকাশিত নথিগুলোর মধ্যে এফবিআই গত বছর তৈরি করেছিল এমন একটি তালিকাও আছে। এতে ন্যাশনাল থ্রেট অপারেশন সেন্টারের কলসেন্টারে কর দিয়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হয়েছিল সেগুলোও রাখা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের অনেকগুলোই কোনো যাচাই না করা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা এবং এর পক্ষে কোনো প্রমাণ ছিল না।
এই তালিকায় ট্রাম্প, এপস্টেইন এবং আরও কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অনেক অভিযোগ রয়েছে। ট্রাম্প বরাবরই এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়মের কথা অস্বীকার করে আসছেন এবং এপস্টেইনের অপরাধের কোনো ভুক্তভোগীও ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ করেননি।
সর্বশেষ অভিযোগগুলো সম্পর্কে প্রশ্নের জবাবে হোয়াইট হাউস ও বিচার বিভাগ নতুন নথির সঙ্গে প্রকাশিত এক বিবৃতির একটি অংশের দিকে ইঙ্গিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের ওই বিবৃতিতে বলা হয়, “কিছু নথিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত অভিযোগ রয়েছে। এগুলো ২০২০ সালের নির্বাচনের ঠিক আগে এফবিআইয়ের কাছে জমা দেওয়া হয়েছিল”। এতে আরও বলা হয়, “স্পষ্টভাবে বলতে গেলে, এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই এবং মিথ্যা। যদি এগুলোর সামান্য বিশ্বাসযোগ্যতাও থাকত, তাহলে সেগুলো অনেক আগেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতো”।
মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের একজন মুখপাত্র সর্বশেষ প্রকাশিত এপস্টিন নথিতে থাকা অভিযোগের জবাব দিয়েছেন। মি. গেটস যৌনবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন-এমন তথ্যও সেখানে করা হয়েছে। তার মুখপাত্র এসব অভিযোগকে ‘একেবারেই হাস্যকর এবং সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বলে মন্তব্য করেছেন।
২০১৩ সালের ১৮ জুলাইয়ের দুটি ইমেইল এপস্টিনের লেখা বলে মনে হয়, তবে সেগুলো আদৌ বিল গেটসকে পাঠানো হয়েছিল কি-না, তা পরিষ্কার নয়। ইমেইল দুটিই এপস্টিনের নিজস্ব ইমেইল ঠিকানা থেকে পাঠানো এবং আবার সেই একই ঠিকানায় ফেরত এসেছে। মি. গেটসের সঙ্গে যুক্ত কোনো ইমেইল ঠিকানা সেখানে দেখা যায়নি। এছাড়া ইমেইলই স্বাক্ষরবিহীন।
ইমেইলগুলোর একটিতে বিল ও মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন থেকে পদত্যাগপত্রের মতো করে লেখা হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে যে রুশ মেয়েদের সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ‘পরিণতি সামলাতে’ গেটসের জন্য ওষুধ সংগ্রহ করতে হয়েছিল।
নতুন প্রকাশ করা নথিতে ব্রিটেনের এলিট ব্যক্তিদের সাথে এপস্টিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক উঠে এসেছে। এর মধ্যে এপস্টিন ও ‘দ্যা ডিউক’ নামের একজনের মধ্যকার ইমেইলও আছে। ধারণা করা হয় তিনি হলেন এন্ড্রু মাউন্টব্যাটেন উইন্ডসর। ইমেইলে ডিনারের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যেখানে অনেক গোপনীয়তা থাকবে।
আরেকটি ইমেইলে এপস্টিন ‘দ্য ডিউক’-কে ২৬ বছর বয়সী এক রাশিয়ান মহিলার সঙ্গে পরিচয় করানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। এই ইমেইলগুলো আগস্ট ২০১০-এ আদান-প্রদান করা হয়, যা এপস্টেইন একজন নাবালিকাকে প্রলুব্ধ করার দোষ স্বীকারের দুই বছর পরের ঘটনা।এসব ইমেইলে কোনো অপরাধের ইঙ্গিত নেই।
বিবিসির পক্ষ থেকে এন্ড্রুর সাথে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তিনি আগে আনুষ্ঠানিকভাবে দ্যা ডিউক অব ইয়র্ক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এপস্টিনের সঙ্গে অতীত বন্ধুত্বের কারণে মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসরকে অনেক বছর ধরেই তদন্ত ও সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। তিনি সবসময় কোনো অপরাধে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে আসছেন।
এপস্টিন সম্পর্কিত সব নথি প্রকাশের গল্প এখানেই শেষ হলো কি না তা এখনো নিশ্চিত নয়।
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ বলেছেন, নথিগুলো প্রকাশের মাধ্যমে নথি খুঁজে যাচাই করার দীর্ঘ ও বিস্তারিত কাজ শেষ হয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে বিচার বিভাগ তার কাজ শেষ করেছে। তবে, ডেমোক্র্যাটরা এখনও দাবি করছেন যে বিচার বিভাগ কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই সম্ভবত প্রায় দুই লাখ পঞ্চাশ হাজার নথি আটকে রেখেছে।
ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান রোহ খানা রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান থমাস মেসির সঙ্গে মিলে এপস্টেইন ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন যে, তিনি এ বিষয়ে সতর্ক। “বিচার বিভাগ জানিয়েছে তারা ৬ মিলিয়নের বেশি পেইজ শনাক্ত করেছে, কিন্তু যাচাই ও কিছু অংশ কাটছাট করার পর মাত্র প্রায় ৩.৫ মিলিয়ন পেইজ প্রকাশ করা হয়েছে,” বলেছেন তিনি।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য জেফ্রি এপস্টিন মানব পাচার এবং শিশু নিগ্রহের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিল। ২০১৯ সালে জেলবন্দি অবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছিল। সরকার বলেছিল সে আত্মহত্যা করেছে। সূত্র, বিবিসি বাংলা, দৈনিক ইত্তেফাক


