Last Updated on 27 seconds by zajira news
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, জাজিরা নিউজ: দক্ষিণ লেবানন ও উত্তর ইসরাইলে হিজবুল্লাহর নতুন যুদ্ধকৌশল নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
লেবাননের ভেতরে ইসরায়েলি সেনা ও ট্যাংকের ওপর হামলায় হিজবুল্লাহ এখন নতুন এক ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করছে। গোষ্ঠীটি তাদের লড়াইয়ে ছোট আকারের ‘ফাইবার অপটিক’ ড্রোন ব্যবহারের হার বাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এ ড্রোনগুলো তৈরির খরচ যেমন কম, তেমনি এগুলো শনাক্ত করাও বেশ কঠিন। এ ড্রোনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এগুলো সিগন্যাল জ্যামিং প্রযুক্তির মাধ্যমে অকেজো করা যায় না।
‘ফাইবার অপটিক’ তারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় এ ড্রোনগুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে লক্ষ্যে আঘাত হানতে সক্ষম।
জেরুজালেম থেকে নিয়মিত ইসরাইল ও ফিলিস্তিনবিষয়ক সংবাদ সংগ্রহকারী জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধি ইসাবেল কার্শনার, নাথান ওডেনহাইমার ও অ্যারন বক্সারম্যান এবং জেরুজালেমে কর্মরত সাংবাদিক অ্যাডাম রাসগনের যৌথ অনুসন্ধানে জানা গেছে, হিজবুল্লাহ এখন এমন এক বিশেষ বিস্ফোরক ড্রোন ব্যবহার করছে, যা ইসরাইলের অত্যাধুনিক জ্যামিং প্রযুক্তিকে পুরোপুরি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দিচ্ছে।
শুক্রবার (১ মে) রাতে প্রকাশিত নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাধারণ ড্রোন রেডিও সিগন্যালে চললেও এই ড্রোনগুলো নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে প্রায় অদৃশ্য অপটিক্যাল ফাইবার বা সরু সুতার মতো তার দিয়ে। এর ফলে ইসরাইলি বাহিনী ইলেকট্রনিক উপায়ে এই ড্রোনগুলোকে অকেজো করতে পারছে না।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক সপ্তাহে হিজবুল্লাহর এই ড্রোন হামলায় ইসরাইলি বাহিনী বেশ চাপে পড়েছে। ইসরাইলি সামরিক কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, এই নতুন বিপদ সামলাতে তারা হিমশিম খাচ্ছেন। এই ড্রোনগুলো খুব নিচু দিয়ে এবং অত্যন্ত দ্রুত গতিতে উড়ে গিয়ে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে আঘাত হানতে পারে। যেহেতু এগুলো কোনো রেডিও সিগন্যাল ছাড়াই তারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়, তাই ইসরাইলের রাডার বা জ্যামিং মেশিন এগুলোকে শনাক্ত করতে পারছে না। ইউক্রেন যুদ্ধেও এই ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার দেখা গেছে, তবে এখন হিজবুল্লাহ এটি ব্যবহার করে রণক্ষেত্রে ইসরাইলকে ধরাশায়ী করছে।
ইসরাইলের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ইয়াল হুলাতা জানিয়েছেন, এই ড্রোন ঠেকাতে তারা এখন পুরনো পদ্ধতি যেমন—বড় জালের ব্যবহার শুরু করেছেন, যাতে ড্রোনগুলো ভবনে বা গাড়িতে সরাসরি আঘাত করতে না পারে।
তিনি স্বীকার করেছেন যে, দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল ঠেকানোর ক্ষমতা ইসরাইলের থাকলেও হিজবুল্লাহর এই সস্তা কিন্তু কার্যকর প্রযুক্তির সামনে তাদের দামি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখন অকেজো।
হিজবুল্লাহর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রাম চ্যানেলগুলোতে প্রকাশ করা একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, কিভাবে একটি ড্রোন সরাসরি ইসরাইলি সামরিক যানে আছড়ে পড়ছে। হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে একে ‘হিসাব বদলে দেয়া সুতা’ বলে অভিহিত করা হয়েছে।
ইরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠীটি নিয়মিত ভিডিও প্রকাশ করে তাদের ড্রোন হামলার সাফল্য প্রচার করছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের যাচাইকৃত তথ্যানুযায়ী, সম্প্রতি শোমেরা এলাকায় হিজবুল্লাহর ড্রোন হামলায় বেশ কয়েকজন ইসরাইলি সেনা আহত হয়েছেন এবং সামরিক যান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হিজবুল্লাহর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইসরাইলিদের কোটি কোটি টাকার অস্ত্রের তুলনায় তাদের এই ড্রোনের খরচ খুবই নগণ্য, কিন্তু এটি ইসরাইলি সেনাদের সহজ শিকারে পরিণত করেছে। বিশেষ করে দক্ষিণ লেবাননে, যেখানে ইসরাইলি সেনারা দখলদারিত্ব চালাচ্ছে, তার ১০ থেকে ১২ মাইল দূর থেকেও হিজবুল্লাহ নিখুঁতভাবে এই হামলাগুলো চালাচ্ছে। ফলে যুদ্ধবিরতির কথা চললেও হিজবুল্লাহর এই ড্রোন ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী ঢাল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
সাধারণত ড্রোন চলে অদৃশ্য বেতার তরঙ্গে। কিন্তু এই নতুন প্রযুক্তির ড্রোন যেন আধুনিক যুদ্ধের মাঠে এক অন্যরকম ‘নাটাই-ঘুড়ি’। এর রহস্য লুকিয়ে আছে এর পেছনের অংশে থাকা একটি বিশেষ কুণ্ডলীতে। ড্রোনটি যখন ডানা মেলে আকাশের দিকে ওড়ে, তার পেছন থেকে নাটাইয়ের সুতার মতো বের হতে থাকে অত্যন্ত সরু এক তন্তু বা অপটিক্যাল ফাইবার।
এই সুতাই হলো ড্রোনের প্রাণভোমরা। এক প্রান্তে থাকে ড্রোনের ক্যামেরা ও বিস্ফোরক। আর অন্য প্রান্তে থাকে কয়েক মাইল দূরে নিরাপদ আশ্রয়ে বসে থাকা যোদ্ধার হাতের নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র। ড্রোনটি যত সামনে এগোয়, পেছন থেকে সুতা ততটাই লম্বা হতে থাকে। এই ফাইবারের ভেতর দিয়েই আলোর গতিতে ড্রোনের তোলা ভিডিও পৌঁছায় যোদ্ধার কাছে, আর যোদ্ধার হাতের ইশারা পৌঁছে যায় ড্রোনের কাছে।
কিন্তু কেন এই পুরনো ‘তার’ ব্যবহার করা হচ্ছে? কারণ হলো ইসরাইলের অত্যাধুনিক জ্যামিং প্রযুক্তি। ইসরাইলি বাহিনী সাধারণত অদৃশ্য সব দেয়াল তৈরি করে রাখে, যাতে বেতার তরঙ্গ বা রেডিও সিগন্যাল বাধাগ্রস্ত হয়ে ড্রোন পথ হারিয়ে ফেলে। কিন্তু হিজবুল্লাহর এই ড্রোনের কোনো সিগন্যালই নেই যে তা জ্যাম করা যাবে।
তথ্যের আদান-প্রদান সরাসরি তার দিয়ে হওয়ায় এটি কোনো রাডার বা ইলেকট্রনিক ডিভাইসের তোয়াক্কাই করে না। ঠিক যেমন সুতায় বাঁধা ঘুড়িকে কেউ দূর থেকে হাত না দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, হিজবুল্লাহর এই ‘সুতার ড্রোন’গুলোকেও একইভাবে কোনো প্রযুক্তি দিয়ে মাঝপথে থামানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত এটি অভেদ্য ও অদম্য থাকে। সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস, আল–জাজিরা


