Last Updated on 35 seconds by zajira news
অনলাইন ডেস্ক, জাজিরা নিউজ: কিছুক্ষণ আগেও যে মেয়েটি স্বাভাবিক ছিল, হঠাৎ সে বিড়ালের মতো ‘মিউ মিউ’ শব্দ করছে; নিজের মুখে খামচি দিচ্ছে। চিকিৎসকেরা জলাতঙ্কের সন্দেহ করেছেন—এই আতঙ্কে দিশাহারা হয়ে ১২ হাজার টাকা ভাড়ায় অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ঢাকার পথে ছুটেছেন তাঁরা।
অ্যাম্বুলেন্সটি যাচ্ছে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকার পথে । ভেতরে পাঁচ বছরের মেয়েকে আঁকড়ে বসে আছেন মা-বাবা।
কিন্তু পথেই মা–বাবা জানতে পারেন, অসুস্থ মেয়েটির সেই মুহূর্তের একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। এরপর ফোন আসতে থাকে পরিচিত-অপরিচিত মানুষের। কেউ জানতে চান, ‘আপনার মেয়ে নাকি বিড়াল হয়ে গেছে?’ কেউ বলেন, মেয়েটি অভিনয় করছে। কেউ আবার মা–বাবাকে বলেন, ‘ভিউ ব্যবসায়ী’।
অথচ মেয়েটি বিড়াল হয়নি, জলাতঙ্কেও আক্রান্ত হয়নি। অসুস্থতার সেই মুহূর্তে সে নিজের অজান্তে এমন আচরণ করেছিল। চিকিৎসকেরা পরে বলেছেন, এটি অভিনয় নয়।
কিন্তু শিশুটি সুস্থ হয়ে উঠলেও সেই কয়েক মিনিটের ভিডিও থেকে মুক্তি পাচ্ছে না তার পরিবার।
রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ২৫ আগস্ট গিয়ে জানা গেছে, মা-বাবা তাঁদের মেয়েকে নিয়ে চিড়িয়াখানায় বেড়াতে গেছেন। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও দেখা হয়নি। পরদিন ২৬ আগস্ট সকালে মুঠোফোনে কথা হয় তাঁদের সঙ্গে।
ফোন ধরতেই মা ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা সবাইকে একই কথা বলতে বলতে ক্লান্ত। আর কথা বলতে চান না।
ঘটনার শুরু ১৭ আগস্ট। মেয়েটির বাবা কুষ্টিয়ায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। সেদিন অফিস থেকে বাসায় ফিরে তিনি দেখেন, তাঁর পাঁচ বছরের মেয়ে অস্বাভাবিক আচরণ করছে।
ডাকলে কথা না বলে বিড়ালের মতো ‘মিউ মিউ’ শব্দ করছে। নিজের মুখে খামচি দিচ্ছে। দুপুরে স্কুল থেকে ফেরার পর থেকেই মেয়েটির এমন আচরণ শুরু হয়। রাতে বৃষ্টির মধ্যেই মেয়েকে নিয়ে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান তাঁরা।
মেয়েটির বাবার ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে দায়িত্বে থাকা একজন চিকিৎসক কোনো পরীক্ষা না করেই শিশুটির আচরণ দেখে জলাতঙ্কের সন্দেহ করেন। তাঁকে রাজশাহী বা ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
জলাতঙ্কের নাম শুনে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন মা–বাবা। দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করতে ছুটে যান বাবা। আর তখনই ঘটে আরেক ঘটনা।
শিশুটির বাবা বলেন, তিনি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করতে যাওয়ার পর মেয়ে হাসপাতালের যে জায়গায় বসে ছিল, সেখানে কয়েকজন কর্মচারী গিয়ে মুঠোফোনে তার ভিডিও করতে থাকেন। মেয়ের মা বারবার তাঁদের ভিডিও করতে নিষেধ করেছেন। কিন্তু ভিডিও করা থামেনি। তাঁরা নাকি বলেছিলেন, বড় কর্মকর্তাদের দেখানোর জন্য ভিডিও করছেন।
এরপর মেয়েকে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকার পথে রওনা দেন মা–বাবা। কুষ্টিয়া থেকে ঢাকার পথেই জানতে পারেন, তাঁদের মেয়ের ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে গেছে।
সন্তান অসুস্থ—এই আতঙ্কের মধ্যেই তাঁরা বুঝতে পারেন, এখন মেয়ের অসুস্থতা নিয়ে মানুষের নানা প্রশ্ন, কৌতূহল আর কটূক্তির মুখোমুখি হতে হবে। এর পর থেকেই তাঁরা ট্রমার মধ্যে আছেন।
শিশুটির মা বলেন, ‘মেয়ে যখন মুখ দিয়ে বিড়ালের মতো মিউ মিউ শব্দ করছিল, নিজের মুখে খামচি দিচ্ছিল, তা দেখে তো আমরা হুঁশে ছিলাম না। সেই সময় মেয়ের ভিডিও কেমনে করব? আর মেয়ের ভিডিও ভাইরাল করার কথা কি আমাদের মাথায় থাকার কথা? অথচ বলা হচ্ছে আমরা ভিউ ব্যবসায়ী। আমার মেয়েটাকে অনেকেই গালি দিচ্ছে, বাজে কথা বলতাছে।’
শিশুটি এখন সুস্থ। কিন্তু ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার কারণে পরিবারের ভোগান্তি এখনো থামেনি।
শিশুটির মা বলেন, ‘মেয়ে এখন সুস্থ আছে, ফেসবুকে তা জানানোর পরও নতুন করে একদল গালি দিচ্ছে। মেয়ে নাকি অভিনয় করছে।’
এই মা চান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে মেয়ের ওই ভিডিও সরিয়ে নেওয়া হোক। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, ফেসবুক থেকে মেয়ের বিড়ালের মতো আচরণ করা ভিডিও ডিলিট করা হোক। আর মেয়েটা সুস্থ আছে, তা সবাই জানুক। মেয়েটাকে আর কেউ যেন হয়রানি না করে।’
সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা বলছেন, কুকুর, শিয়াল, বিড়াল, বাদুড়, বেজি, বানর ইত্যাদি প্রাণী জলাতঙ্ক সৃষ্টিকারী ভাইরাসে আক্রান্ত হলে এবং আক্রান্ত প্রাণীটি সুস্থ মানুষ বা গবাদিপশুকে কামড় দিলে ওই মানুষ কিংবা গবাদিপশুও এ রোগে আক্রান্ত হয়। প্রাণিবাহিত র্যাবিস ভাইরাসঘটিত এ রোগের লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পর আক্রান্ত রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে।
অস্বাভাবিক আচরণ দেখা দেওয়ার পর শিশুটিকে ঢাকার মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানকার চিকিৎসকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানিয়েছেন, শিশুটির জলাতঙ্ক হয়নি।
শিশুটির বাবা বলেন, হাসপাতালে আনার পরও মেয়ে কিছুটা অস্বাভাবিক আচরণ করছিল। চিকিৎসকেরা তার সামনে আলো ও বাতাস দিয়ে দেখেন কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না। পানি দেখে বা পানি খেতে ভয় পাচ্ছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা হয়।
পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন তার জলাতঙ্ক হয়নি। সামান্য চিকিৎসাতেই সে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে বলে জানিয়েছেন শিশুটির বাবা।
এই বাবা আরও বলেন, প্রায় দেড় দিন মেয়েটি অস্বাভাবিক আচরণ করেছিল। এখন সে পুরোপুরি সুস্থ। মন ভালো রাখার জন্যই হাসপাতাল থেকে মেয়েকে নিয়ে চিড়িয়াখানায় গিয়েছিলেন তাঁরা।
কেন এমন আচরণ করেছিল মেয়েটি?
এ প্রশ্নের জবাবে শিশুটির বাবা বলেন, তাঁদের মেয়ের একটি পার্সিয়ান বিড়াল ছিল। মেয়েটি বিড়ালটিকে খুব ভালোবাসত। ঘুমানোর সময়ও বিড়ালটিকে সঙ্গে রাখত।
ছয়-সাত মাস আগে বিড়ালটি বাসা থেকে হারিয়ে যায়। এর পর থেকেই মেয়েটি অনেকটা মনমরা থাকত। মুঠোফোনে বিড়ালের প্রচুর ভিডিও দেখত বলে তিনি জানিয়েছেন।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসকদের ধারণা, শিশুটির কল্পনায় বিড়ালকে ঘিরে একটি আলাদা জগৎ তৈরি হয়েছিল। এ কারণে হয়তো শিশুটি এমন অস্বাভাবিক আচরণ করেছে। তবে সে অভিনয় বা ইচ্ছা করে এমন করেনি।
মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের শিশুবিশেষজ্ঞ ও শিশু নিউরোলজিস্ট এ আর এম সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বিড়াল কামড় বা আঁচড় দিলেও এমন আচরণ করার কথা নয়।
কুষ্টিয়া থেকে আসা শিশুটির বিষয়ে এই চিকিৎসক বলেন, মা–বাবার কাছ থেকে জানা গেছে, শিশুটি মুঠোফোনে বিড়ালের প্রচুর ভিডিও দেখত। কোনো একটি চরিত্র হয়তো তার ভালো লেগেছিল। এরপর সে মিউ মিউ শব্দ করা শুরু করে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে ‘ফাংশনাল ডিসঅর্ডার’ বলা যায়। এতে মনের ভেতরের কোনো বিষয় শারীরিক আচরণে প্রকাশ পায়। অদ্ভুত কল্পনাপ্রসূত আচরণও বলা যেতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন এই চিকিৎসক।
শিশুবিশেষজ্ঞ সাখাওয়াত হোসেন বলেন, কোনো কারণে মানসিক চাপে থাকলেও মানুষ নানা ধরনের আচরণ করতে পারে। শিশুটির আচরণকে কোনোভাবেই অভিনয় বা অন্যের কাছ থেকে সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা বলা যাবে না।
তাঁর মতে, শিশুটির ভিডিও ভাইরাল হওয়ায় ভুল তথ্য ছড়িয়েছে এবং এতে শিশু ও তার পরিবার একটি নাজুক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে।
শিশুটির আগে থেকেই অ্যাজমার সমস্যা ছিল। বর্তমানে হাসপাতালে রেখে তার অ্যাজমার চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। দ্রুতই তাকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক সাখাওয়াত হোসেন।
শিশুটিকে দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে মুঠোফোন থেকে দূরে রাখা এবং তার মন ভালো রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
সাখাওয়াত হোসেন বলেন, হাসপাতালের ছাড়পত্রে শিশুটির জলাতঙ্ক হয়নি—এ বিষয়টি স্পষ্ট করে লেখা হবে। একই সঙ্গে স্কুল বা অন্য কোথাও শিশুটিকে এ ঘটনা নিয়ে যাতে হয়রানি করা না হয়, সে বিষয়েও আহ্বান জানানো হবে।
কিন্তু মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফেরার পর কী অপেক্ষা করছে, সেটিই এখন মা–বাবার বড় দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিশুটির বাবা বলেন, ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর থেকে তাঁদের ভোগান্তি বেড়েই চলছে। তাঁদের মেয়ে প্লে গ্রুপ শ্রেণিতে। যে সহপাঠী মেয়ের সঙ্গে চকলেট খেয়েছিল, তার মা–বাবা নাকি তাকেও হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন—র্যাবিসের টিকা দেওয়া প্রয়োজন কি না, তা জানতে।
মেয়ে স্কুলে ফিরলে তাকে নিয়ে অন্য শিশুরা কী বলবে, শিক্ষক বা অভিভাবকেরা কীভাবে দেখবেন—এসব ভাবনাও আতঙ্কিত করছে এই বাবাকে।
মেয়েটা যেন আর হয়রানির শিকার না হয়
সন্তানের অসুস্থতার সময় মা–বাবার পাশে থাকার কথা ছিল মানুষজনের। কিন্তু একটি ভিডিও সেই জায়গায় এনে দিয়েছে কৌতূহল, উপহাস আর অপমান।
শিশুটির বাবা বলেন, ‘আমরা সাধারণ মানুষ। কোনো ঝামেলা চাই না। মেয়েকে কুষ্টিয়ায় হাসপাতালে নেওয়া থেকে শুরু করে প্রেসক্রিপশনসহ সব ডকুমেন্টস সংগ্রহ করে রেখেছি। পাঁচ বছর বয়সী মেয়েটা যেন আর অবহেলা বা হয়রানির শিকার না হয়, আমরা শুধু তা–ই চাই।’
না জেনে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচারও দাবি করেছেন তিনি।
স্কুলের ব্যাগ আবার গোছানো হবে। ছোট্ট পানির বোতল, টিফিন বক্স, প্রিয় চকলেট—সবই আগের মতো থাকবে। শিশুটি হয়তো আবার বন্ধুর সঙ্গে চকলেট ভাগ করে খাবে। কিন্তু আগের মতো আর নিশ্চিন্ত থাকবে না মা–বাবার মন।
মাত্র দেড় দিনের একটি অসুস্থতা শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু সেই দেড় দিনের কয়েক মিনিটের একটি ভিডিও এখনো তাড়া করে ফিরছে পরিবারটিকে। মা–বাবার হয়তো এখন প্রার্থনা—পাঁচ বছরের মেয়েটি যেন স্বাভাবিক শৈশব পায়। আর যেন কখনো ভাইরাল ভিডিওর চরিত্র না হয়। সূত্র, প্রথম আলো

