সময়ের জনমাধ্যম

ছাত্র-জনতার বিজয় এবং শেখ হাসিনার বিদায়

ফিরে দেখা ২০২৪

Last Updated on 8 hours by zajira news

অনলাইন ডেস্ক, জাজিরা নিউজ: ঢাকাসহ দেশব্যাপী ছাত্র-জনতার উত্তাল আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন শেখ হাসিনা।

তবে তাঁর বিদায়ের সিদ্ধান্ত কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ে আসেনি। এর আগে কয়েক দিন ধরে রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে দ্রুত বদলে যেতে থাকে পরিস্থিতি।

নিরাপত্তা বাহিনীর অবস্থান, আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ আলোচনা এবং শেষ মুহূর্তে সামরিক নেতৃত্বের পরিস্থিতি মূল্যায়ন—সব মিলিয়ে ঘণ্টায় ঘণ্টায় পাল্টেছে সিদ্ধান্তের হিসাব।

চব্বিশের ৩ আগস্ট সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সেনা সদরে দরবারে মিলিত হন। সেখানে সেনাবাহিনীর অবস্থান স্পষ্ট হয়। এরপরও ৪ আগস্ট গভীর রাত পর্যন্ত গণভবনে একের পর এক বৈঠক হয়। একই সময়ে চলতে থাকে পদত্যাগ, জরুরি অবস্থা জারি এবং আন্দোলন দমনের বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা। কিন্তু প্রতিটি ঘণ্টার সঙ্গে মাঠের পরিস্থিতি আরও দ্রুত সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট সকালে সামরিক কর্মকর্তাদের বার্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে বাস্তব মূল্যায়ন এবং ঢাকামুখী জনস্রোতের প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনা দেশ ছাড়েন।

এর আগে গণভবন, সেনা সদর ও বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে কী আলোচনা হয়েছে, কোন সিদ্ধান্ত কেন বদলেছে এবং কীভাবে শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পথ তৈরি হয়; সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের সঙ্গে কথা বলে সেসব ঘটনাপ্রবাহের একটা চিত্র পাওয়া গেছে।

২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে শান্তিপূর্ণভাবে ছাত্রদের আন্দোলন বেগবান হতে থাকে। কিন্তু সরকারের বলপ্রয়োগ, নির্বিচার গুলি ও মানুষ হত্যার কারণে দিন দিন পরিস্থিতি উত্তাল হতে থাকে। যুক্ত হতে থাকে নানা শ্রেণি–পেশাসহ সাধারণ মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে সেনা কর্মকর্তাদের নিয়ে ৩ আগস্ট দরবার ডেকেছিলেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। ওই বৈঠকের পরই শেখ হাসিনার পায়ের নিচের মাটি আলগা হতে থাকে। পরের দুই দিনের ঘটনাবলি কেবল তাঁর বিদায়টা কেমন হবে, তা নির্ধারণ করে দেয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৩ আগস্ট সেনা সদরের বৈঠকে কর্মকর্তাদের বক্তব্যে এমন অবস্থান প্রকাশ পায় যে তারা জনগণের বুকে গুলি চালাবে না। কারণ, সেনাবাহিনীর অস্ত্র এতটাই প্রাণঘাতী যে তা বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যায় না। সেনাবাহিনীর এপিসিগুলোতে ১৪ দশমিক ৫ ক্যালিবারের গুলি থাকে। একটি গুলিতেই পাঁচ থেকে সাতজনের প্রাণ চলে যেতে পারে।

তখন সাধারণ মানুষ রাজপথে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জাতির চরম সংকটে সেনাবাহিনীকে এগিয়ে আসার আহ্বানও জানাতে থাকে। অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তারাও আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে রাস্তায় নামেন। এমন বাস্তবতায় সেনাবাহিনী জনগণের বিরুদ্ধে না দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, সামরিক নেতৃত্ব ৪ আগস্ট রাতেই বুঝতে পারেন, শেখ হাসিনার সরকার টিকছে না। এরপরও টিকে থাকার শেষ চেষ্টা চালিয়ে যান শেখ হাসিনা। অনেক রাত পর্যন্ত গণভবনে বৈঠক চলছিল। সেখানে দলীয় মন্ত্রী, নেতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনেকে ছিলেন। একেকজন একেকটি পরামর্শ দিচ্ছিলেন—কীভাবে আন্দোলন দমন করা যায়।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রমতে, ৪ আগস্ট রাতে একপর্যায়ে সেনাপ্রধান ওয়াকার–উজ–জামান শেখ হাসিনার সঙ্গে আলাদা করে কথা বলেন, শেখ রেহানা ছিলেন তখন। সেনাপ্রধানের বক্তব্য ছিল অনেকটা এমন—‘স্যার, আপনার হাতে আর সময় নেই।’ তিনি শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বসে সমাধানের পথ খোঁজার পরামর্শও দিয়েছিলেন।

পরদিন (৫ আগস্ট) সকাল ১০টায় আবার সেনাপ্রধানকে ডাকেন শেখ হাসিনা। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, সেনাপ্রধান যখন গণভবনে যান, তখন শেখ হাসিনা ছিলেন বিমর্ষ। তাঁর হাতে ছিল নিজের লেখা পদত্যাগপত্র। শেখ হাসিনার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত জেনে সেনাপ্রধান সেনা সদরে ফিরে যান। সরকার পতনের পর দেশে বিরাট অরাজকতা হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেন।

সেনা সদর-ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, ৫ আগস্ট ভোরে ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন মহাপরিচালক হামিদুল হককে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছিলেন সেনাপ্রধান, যাতে সকালে সেনা সদরে বৈঠকে দলগুলোর নেতারা আসেন। যদিও সব নেতাকে নিয়ে ওই বৈঠক শুরু হয় দুপুরের পর।

গণভবনকেন্দ্রিক একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়, পদত্যাগের পর কী করবেন, সেটি পরিষ্কার করেননি শেখ হাসিনা। এ বিষয়ে সেনাপ্রধানও তাঁর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেননি। সেনাপ্রধানের গণভবনে আসা ও চলে যাওয়ার আগে-পরে শেখ হাসিনা ভারত সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে ফোনে কথা বলেন।

পরে ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর রাজ্যসভায় দেওয়া বিবৃতিতে বলেন, শেখ হাসিনা খুব অল্প সময়ের নোটিশে সাময়িকভাবে ভারতে আসার অনুমতি চেয়েছিলেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তাঁকে বহনকারী বিমানের ছাড়পত্র দেওয়ার অনুরোধ পেয়েছিল ভারত। ওই দিন দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, টাইমস অব ইন্ডিয়াসহ ভারতীয় সংবাদপত্র জয়শঙ্করের ওই বক্তব্য প্রকাশ করে।

সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্র জানায়, ৫ আগস্ট (২০২৪) দুপুরের পর সেনাপ্রধান ওয়াকার–উজ–জামান গণভবন ত্যাগ করে রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে সেনানিবাসে বৈঠক করছিলেন। এমন সময় সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল হামিদুল হক সেনাপ্রধানকে জানান যে শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ছেন। ওই সময় তাঁকে বহনকারী বিমান রানওয়েতে ছিল। তখন সেনাপ্রধান শেখ হাসিনাকে ফোন করেন, কিন্তু কথা শোনা যায়নি। বিমান উড্ডয়ন করে ভারতের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে।

তবে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্ট নেতারা মনে করেন, শেখ হাসিনা দেশ না ছাড়লে ক্ষুব্ধ জনতার হাতে তিনি মার পড়তেন। এমনকি তিনি সেনানিবাসে অবস্থানও নিরাপদ মনে করেননি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৫ আগস্ট সকাল থেকে উত্তরা, যাত্রাবাড়ী ও সাভার এলাকা থেকে ঢাকার অভিমুখে ছাত্র–জনতার ঢল নামে। সব মিছিলের লক্ষ্য গণভবন। সকালের দিকে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের প্রস্তুতি শুরু হয়। তখন ব্যক্তিগত সামগ্রী নিয়ে দ্রুত বের হওয়ার প্রস্তুতি নেন শেখ হাসিনা। অবস্থা এমন ছিল যে রান্না করা খাবারও খেতে পারেননি। বেলা ২টা ২৫ মিনিটের দিকে শেখ হাসিনা ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে গণভবনের পেছনের দিকে অবস্থিত সাবেক বাণিজ্যমেলা মাঠে বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে করে ওঠেন। হেলিকপ্টারটি বিমানবাহিনীর কুর্মিটোলা ঘাঁটিতে যায়। সেখানে নেমে শেখ হাসিনা লাউঞ্জে এক ঘণ্টার বেশি অপেক্ষা করেন। এর মধ্যে বিমানবাহিনীর পরিবহন বিমান প্রস্তুত করা হয়। হেলিকপ্টার থেকে নেমে লাউঞ্জে যাওয়ার মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

বেলা তিনটার পর শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমানটি (সি-১৩০) আকাশে ওড়ে। তাঁর সঙ্গে শেখ রেহানা ছাড়াও তাঁর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা তারেক সিদ্দিকও ছিলেন। শেখ হাসিনার সামরিক সচিবও যান, তবে তিনি ওই বিমানে ফিরে আসেন। তারেক সিদ্দিকের মেয়ে এবং জামাতাও সঙ্গে ছিলেন বলে অসমর্থিত এক সূত্রে জানা গেছে।

শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমানটি নয়াদিল্লির কাছে গাজিয়াবাদে ভারতীয় বিমানবাহিনীর হিন্দন ঘাঁটিতে স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ৩৬ মিনিটে অবতরণ করে। সেখানে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল শেখ হাসিনাকে অভ্যর্থনা জানান বলে তখন দেশটির গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।

গত বছরের ২৫ মে শেখ হাসিনার পদত্যাগের বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম শুনানিতে বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের ডাকে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির কারণে গণভবন অভিমুখে ঢাকার চারপাশ থেকে মিছিল আসছিল। সেনা নেতৃত্ব একপর্যায়ে শেখ রেহানাকে দিয়ে শেখ হাসিনাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু শেখ হাসিনা পদত্যাগে রাজি হচ্ছিলেন না। পরে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা। তাঁরা জয়কে বলেন, প্রাণে বাঁচাতে হলে তাঁর মায়ের পদত্যাগ করা ছাড়া উপায় নেই; সময় গুরুত্বপূর্ণ এবং এখনই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে মায়ের সঙ্গে কথা বলেন জয়। তাঁর কথায় ক্ষমতা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন শেখ হাসিনা।

শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর ৫ আগস্ট বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, তাঁর মা আর রাজনীতিতে ফিরবেন না। তিনি আগের দিন থেকেই পদত্যাগের কথা ভাবছিলেন এবং পরিবারের জোরালো অনুরোধে নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে দেশ ছেড়েছেন।

জুলাই আন্দোলনে নির্বিচার মানুষ হত্যা বাড়তে থাকলে এক পর্যায়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের বিভিন্ন ব্যাচের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের গ্রুপে আলোচনা শুরু হয়। ৩ আগস্ট থেকে এসব গ্রুপেও আলোচনা হতে থাকে এভাবে মানুষের ওপর সরাসরি গুলি করা ঠিক হবে কি না। মোটামুটি ৩ আগস্ট রাত থেকে অনেক ব্যাচের গ্রুপে বলা হতে থাকে গুলি করা ঠিক হবে না।

আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার ভাষ্য, এমন পরিস্থিতিতে আন্দোলন দমনে দলীয় ক্যাডারদেরও অস্ত্র হাতে নামানোর সিদ্ধান্ত হয়। ৪ আগস্ট ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় অস্ত্রধারীদের মাঠে নামায় আওয়ামী লীগ। তারা ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচার গুলি চালায়।

এরপরও আন্দোলন দমন করতে না পেরে আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা শেখ হাসিনাকে জরুরি অবস্থা জারির পরামর্শ দিয়েছিলেন। বিষয়টি শেখ হাসিনার মাথায়ও ছিল। কিন্তু ১৯ জুলাই থেকে কারফিউ দিয়ে সেনাবাহিনী মাঠে নামানোর পরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তাই জরুরি অবস্থা কাজ করবে কি না—সেই প্রশ্ন দেখা দেয়।

ওই সময় গণভবনে এবং শেখ হাসিনার কাছাকাছি থাকা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, শেখ হাসিনা সংকট বুঝতে পারছিলেন; কিন্তু ক্ষমতা ছাড়তে আগ্রহী ছিলেন না। সে জন্য তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ এসেছে দেরিতে। তখন আর এগুলোর কোনো কার্যকারিতা ছিল না।

পুলিশের তৎকালীন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও বর্তমানে কারাবন্দী চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে ৪ আগস্ট গণভবনে হওয়া বৈঠক প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করেছি সরকারকে সঠিক তথ্য দিতে। সরকার তার দুর্বলতা শুনতে প্রস্তুত ছিল না। এই মিটিংয়ে থাকা অবস্থায় পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হতে থাকে ও বিভিন্ন স্থানে সমস্যা দেখা দেয়। পরে বৈঠক মুলতবি হয়।’

আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৪ আগস্ট দুপুরের পর একটি প্রভাবশালী পশ্চিমা দেশের এক কূটনীতিকের সঙ্গে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে শেখ হাসিনার পদত্যাগ এবং একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। এমনটা হলে দেশ সংকটমুক্ত হবে বলেও মত আসে।

এরপর আনিসুল হকের গুলশানের বাসায় প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী বৈঠকে বসেন। তাঁরা মাগরিবের নামাজের পর গণভবনের উদ্দেশে রওনা হন। অবশ্য যাওয়ার আগেই শেখ হাসিনাকে ফোন করে বিদেশি কূটনীতিকের সঙ্গে বৈঠক ও আলোচনার বিষয়বস্তু জানান আনিসুল হক। বাকিটা সামনাসামনি জানানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তাঁদের চিন্তাটি ছিল, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করবেন। দায়িত্ব নেবেন তৎকালীন স্পিকার শিরীন শারমীন চৌধুরী। এরপর তিনি সব দলের সঙ্গে আলোচনা করে একটি জাতীয় সরকার গঠন করবেন এবং নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আনিসুল হকসহ অন্য নেতারা গিয়ে জানতে পারেন, শেখ হাসিনা গণভবনের দোতলায় আছেন। সেখানে সবার প্রবেশাধিকার ছিল না। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ছোট বোন শেখ রেহানা ও শিরীন শারমীন চৌধুরী। শেখ হাসিনা নিচে নামলে কথা বলার জন্য অপেক্ষায় ছিলেন তৎকালীন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম, সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী নাহিদ ইজহার খান, তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাতসহ কয়েকজন। পরে আওয়ামী লীগের ধানমন্ডি কার্যালয় থেকে গণভবনে যান দলের নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, বিপ্লব বড়ুয়াসহ অনেকে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, রাত আটটার দিকে শেখ হাসিনা গণভবনের নিচতলায় নেমে আসেন। এ সময় তিনি উপস্থিত নেতাদের বলেন, ৫ আগস্ট থেকে ‘লকডাউন’ থাকবে। কেউ ঘর থেকে বের হতে পারবে না। দলের যেসব ক্যাডার ৪ আগস্ট সশস্ত্র অবস্থায় রাজপথে নেমেছিল, তাদেরও নামার দরকার নেই। এর মধ্যে শেখ হাসিনা তৎকালীন মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে ফোন করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিভিন্ন বাহিনীর প্রধানদের গণভবনে বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানোর নির্দেশ দেন।

কারাবন্দী সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন ট্রাইব্যুনালে দেওয়া তাঁর জবানবন্দিতে এ বিষয়ে বলেন, ৪ আগস্ট দ্বিতীয় বৈঠকটি হয় রাত ১০টার দিকে। সাবেক এই আইজিপির ভাষ্য অনুযায়ী, বৈঠকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী, তাঁর বোন শেখ রেহানা, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, তিন বাহিনীর প্রধান, র‍্যাবের মহাপরিচালক ও আইজিপি উপস্থিত ছিলেন। শেখ হাসিনার খুব ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মুজিবুর রহমানও (তৎকালীন কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল) উপস্থিত ছিলেন।

এ বৈঠকে কীভাবে পরদিন, অর্থাৎ ৫ আগস্টের আন্দোলন ও গণজমায়েত দমন করা যায়, তা নিয়ে কথা হয় বলে জানান সাবেক আইজিপি। তিনি জবানবন্দিতে বলেন, ‘গণভবনে বৈঠক শেষে আমরা সেনাবাহিনীর অপারেশন কন্ট্রোল রুমে চলে যাই। তিন বাহিনীর প্রধান, লে. জেনারেল মুজিব, র‍্যাবের ডিজি, গোয়েন্দা সংস্থা, ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান ও আমি নিজে ছিলাম। সেখানে ফোর্স মোতায়েন নিয়ে কথা হয়।’ রাত প্রায় সাড়ে ১২টায় এ বৈঠক শেষ হয়। বৈঠকে ঢাকা শহর ও ঢাকার প্রবেশমুখে কঠোর অবস্থান নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

তবে উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র জানায়, ৪ আগস্ট রাতে গণভবনে সেনাবাহিনীর উচ্চপর্যায়ের একজন কর্মকর্তা শেখ হাসিনাকে বলেন, বৈঠকের এসব আলোচনা কাজে লাগবে না; সময় ফুরিয়ে গেছে।

এদিকে প্রভাবশালী একটি দেশের সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্র থেকে জানা গেছে, ৪ আগস্ট দিবাগত রাত আড়াইটায় আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমান পশ্চিমা একটি দেশের কূটনৈতিককে জানান, শেখ হাসিনা পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং পরদিন পদত্যাগ করবেন।

পরে আওয়ামী লীগের নেতাদের কাছ থেকে এমন ভাষ্য পাওয়া গেছে যে ৪ ও ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার নানা বার্তা থেকে দলের অধিকাংশ নেতা ও মন্ত্রী নিশ্চিত ছিলেন, জরুরি অবস্থা জারি কিংবা শক্তি প্রয়োগ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হবে। গণভবনে নিয়মিত যাতায়াতকারী নেতা–মন্ত্রীদের অবস্থা ছিল দোদুল্যমান। তাঁদের কখনো মনে হয়েছে, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে সংকট এড়াবেন। আবার পরক্ষণেই মনে হয়েছে, শক্তি প্রয়োগে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

কিন্তু ৫ আগস্ট দুপুরের পর শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালানোর পর মন্ত্রিসভার বেশির ভাগ সদস্য, নেতা ও সংসদ সদস্য হতবিহ্বল হয়ে পড়েন। একজন প্রতিমন্ত্রী সারা রাত জেগে থেকে দুপুর পর্যন্ত নিজ বাসায় ঘুমাচ্ছিলেন। পরে ঘনিষ্ঠজনেরা ফোন করে তাগাদা দেওয়ার পর বাসা ছাড়েন। একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর গাড়ি মৎস্য ভবন এলাকায় ছাত্র-জনতার মুখোমুখি হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। আরেকজন মন্ত্রী বিকেল পর্যন্ত ব্যক্তিগত বাসায় ছিলেন। ঘনিষ্ঠজনদের ফোন করে অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন। একজন সংসদ সদস্য মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের ন্যাম ভবন থেকে দুই মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে মাস্ক পরে ছাত্র-জনতার স্রোতের ভেতর দিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যান।

৫ আগস্ট গণভবনের ঘটনাবলি সম্পর্কে জানেন—এমন একাধিক সূত্র জানায়, শেখ হাসিনা গণভবন ত্যাগ করার ঠিক আগে শেখ রেহানা ফোনে সালমান এফ রহমানসহ কয়েকজনকে নিরাপদ আশ্রয় খোঁজার তাগিদ দেন। আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া এ সময় দলের অনেক নেতাকে ফোন করে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে বলেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তখন সংসদ ভবন এলাকার সরকারি বাসভবনে ছিলেন। বিপ্লব বড়ুয়ার ফোন পেয়ে তিনি তড়িঘড়ি করে কাছাকাছি এক প্রকৌশলীর বাসায় আশ্রয় নেন।

জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমীন চৌধুরী সংসদ ভবনের অফিসেই ছিলেন। ছাত্র-জনতা সংসদ ভবনে ঢুকে পড়লে স্পিকার, তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমদ পলক ও হুইপ ইকবালুর রহিম একটি কক্ষে আত্মগোপন করেন। গভীর রাতে তাঁরা সেনা হেফাজতে বের হন।

আওয়ামী লীগের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ভোরে ঢাকাসহ সারা দেশে খোঁজ নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেই আছে—এমন বার্তা পেয়েছিলেন। কিন্তু বেলা বাড়তেই পরিস্থিতি অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে। প্রথমে গাজীপুর, পরে সাভার উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতারা ফোন করে তাঁকে জানান, ঝাঁকে ঝাঁকে ছাত্র-জনতা ঢাকায় ঢুকে পড়ছে। একপর্যায়ে দুপুরের দিকে ঘনিষ্ঠজনেরা ফোন করে ওই নেতাকে বাসা থেকে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেন। বের হয়ে গাড়িতে বসেই রাস্তায় মানুষের ঢল দেখেন ওই নেতা।

শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি, দেশত্যাগ কেবল একটি দিনের গণবিক্ষোভের ফল ছিল না। এর পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা, বিরোধী পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগহীনতা, রাষ্ট্রীয় শক্তির ওপর অতিনির্ভরতা এবং সংকটের বাস্তবতা মেনে নিতে দেরি করা। ৩ থেকে ৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহে দেখা যায়, মাঠের পরিস্থিতি দ্রুত বদলালেও ক্ষমতার কেন্দ্র গণভবনে সিদ্ধান্ত বদলেছে বারবার। কখনো নিষ্ঠুরভাবে আন্দোলন দমনের পরিকল্পনা, কখনো জরুরি অবস্থা জারির চিন্তা, আবার কখনো পদত্যাগের আলোচনা—শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কোনো পথেই স্থির থাকতে পারেননি শেখ হাসিনা।

সেনাবাহিনী জনগণের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগে অনাগ্রহী হওয়ার পর সরকারের সামনে কার্যকর বিকল্প আর ছিল না। তবু পদত্যাগের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতে দেরি হওয়ায় পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার আকস্মিক প্রস্থানের খবর আগে থেকে না জানায় মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের নেতাদের বড় অংশ দিশাহারা হয়ে পড়ে। কেউ আত্মগোপন করেন, কেউ শেষ মুহূর্তে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছোটেন। সূত্র, প্রথম আলো