Last Updated on 36 seconds by zajira news
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, জাজিরা নিউজ: ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সাইরেন বাজলে যখন দক্ষিণ ইসরায়েলের অনেক বাসিন্দা বেজমেন্টে আশ্রয় নেন। আকাশজুড়ে আলোর অজস্র রেখা দেখা যায়। ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থেকে ছোড়া ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের বিচ্ছুরণ দেখেন বাসিন্দারা।
কাঁধে একটি অ্যাসল্ট রাইফেল ঝুলিয়ে খালি পায়ে মাটিতে দাঁড়িয়ে আজরান বলেন, ‘আমি সাধারণ কোনো লোক নই।’ তবে ইসরায়েলের অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর তাঁর যে অগাধ আস্থা ছিল, তা এখন টলে গেছে।
গত শনিবার রাতে প্রায় তিন ঘণ্টার ব্যবধানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি আরাদ ও ডিমোনার দুটি আবাসিক এলাকায় আঘাত হানে। এতে আজরান ও তাঁর প্রতিবেশীদের অনেকের ঘরের জানালা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই হামলায় ১১৫ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১১ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এখন পর্যন্ত ব্যাখ্যা দেয়নি, ঠিক কী কারণে প্রতিরক্ষাব্যবস্থাটি ব্যর্থ হলো। এই হামলা নতুন করে কিছু প্রশ্ন সামনে এনেছে। ইসরায়েলের কাছে পর্যাপ্ত ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি দেখা দিয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সেই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের আশঙ্কায় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো রক্ষায় সেনাবাহিনী এই ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সাশ্রয় বা সংরক্ষণ করছে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্পর্শকাতর পারমাণবিক স্থাপনা থাকায় ডিমোনা শহরটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুগুলোর একটি।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ কিছুটা বাড়িয়ে বললেও তাঁর মতে, সুরক্ষিত ডিমোনায় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে ইসরায়েলের ব্যর্থতা বড় মোড় পরিবর্তনকারী একটি ঘটনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলের আকাশ এখন অরক্ষিত।’
ইসরায়েলের জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বলছেন, ইরানের ক্রমবর্ধমান ক্ষেপণাস্ত্র মজুত ইসরায়েলি প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে পারে—এমন উদ্বেগ থেকেই মূলত ইরানের ওপর নতুন করে হামলা শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে ১২ দিনের সংঘাতের সময় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল। ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারি ও লঞ্চার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাদের মজুতের পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার থেকে কমে ১ হাজার ৫০০-এর নিচে নেমে আসে।
তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলছেন, ইরান দ্রুতই তাদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনব্যবস্থা আবারও সচল করেছে। বর্তমান যুদ্ধ শুরুর আগেই তাদের অন্তত ২ হাজার ৫০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুত ছিল।
ইসরায়েলের একজন সাবেক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, তাঁদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার পক্ষে ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত সহ্য করা সম্ভব নয়। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এক বছরের মধ্যেই ইরান এই সংখ্যা ছাড়িয়ে যেতে পারে। সামরিক স্পর্শকাতরতার কারণে তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেন।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা অবশ্য দাবি করছেন, তাঁদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করছে। তবে আইডিএফের কর্মকর্তারা এ-ও স্বীকার করেছেন, কোনো ব্যবস্থাই আসলে শতভাগ কার্যকর নয়।
আইডিএফের মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাদাভ শোশানি সাংবাদিকদের বলেন, যুদ্ধের প্রথম ২৩ দিনে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার ক্ষেত্রে সাফল্যের হার ছিল প্রায় ৯২ শতাংশ।
গত রোববারের ব্যর্থতার কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত বলতে রাজি হননি শোশানি। তবে তিনি উল্লেখ করেন, ডিমোনা ও আরাদে হামলার জন্য প্রথাগত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, যা তাঁরা আগে থেকেই চেনেন এবং এর আগে একাধিকবার প্রতিহত করেছেন।
ইসরায়েলের বহুমাত্রিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা মনে করা হয়, যা বিভিন্ন দিক থেকে আসা হামলা মোকাবিলা করতে সক্ষম। এর প্রতিটি স্তর আলাদা ধরনের হুমকি মোকাবিলায় বিশেষভাবে তৈরি। আয়রন ডোম স্বল্প পাল্লার রকেট ও গোলার জন্য; ডেভিডস স্লিং ব্যালিস্টিক ক্রুজ ও মাঝারি থেকে দীর্ঘ পাল্লার রকেটের জন্য এবং অ্যারো ২ ও অ্যারো ৩ দীর্ঘ পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত রুখতে ব্যবহৃত হয়।
এ ছাড়া মার্কিন সেনাবাহিনীর তৈরি অত্যন্ত ব্যয়বহুল ‘থাড’ ব্যবস্থাটি ব্যাকআপ হিসেবে কাজ করছে।
ইসরায়েলি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক কমান্ডার রান কোচাভ দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, হামলা প্রতিহত করতে না পারার পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে।
রান কোচাভ বলেন, এর অন্যতম কারণ হলো ইসরায়েলি কমান্ডারদের একটি সুনির্দিষ্ট নীতি মেনে চলতে হয়। তাঁদের তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, নির্দিষ্ট কোনো হুমকির মোকাবিলায় কোন ইন্টারসেপ্টরটি সবচেয়ে জুতসই হবে।
সাবেক ইসরায়েলি কমান্ডার বলেন, অ্যারো, থাড ও আয়রন ডোমের মতো ব্যবস্থাগুলোর মধ্য থেকে সঠিকটি বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি কৌশলগত লক্ষ্য থাকে। লক্ষ্যটি হলো—একটি সাধারণ রকেট ধ্বংস করতে গিয়ে যেন দামি ক্ষেপণাস্ত্রের অপচয় না হয় কিংবা যা অন্য কোনো ছোট ব্যবস্থা দিয়ে ঠেকানো সম্ভব, সেটির পেছনে যেন দামি ইন্টারসেপ্টর নষ্ট না হয়।
কোচাভ বলেন, ‘আমাদের ইন্টারসেপ্টরের মজুতের হিসাব রাখতে হয় এবং যুদ্ধের ময়দানে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়।’ দ্বিতীয়ত, রাডার ও ইন্টারসেপ্টর ব্যবস্থার মধ্যে অথবা এগুলোর অভ্যন্তরীণ সংযোগের ক্ষেত্রে কারিগরি বা প্রকৌশলগত ত্রুটি দেখা দিতে পারে। তৃতীয় কারণটি হলো ‘পরিসংখ্যানগত বাস্তবতা’।
কোচাভ বলেন, ‘এটি অত্যন্ত আধুনিক ও জটিল একটি ব্যবস্থা, তবে এটি পুরোপুরি নিশ্ছিদ্র নয়।’
ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে যাওয়াও একটি বড় কারণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি অ্যারো ক্ষেপণাস্ত্রের দাম প্রায় ৩০ লাখ ডলার। ‘ডেভিডস স্লিং’ ইন্টারসেপ্টরের প্রতিটির দাম প্রায় ৭ লাখ ডলার এবং ‘আয়রন ডোম’-এর একেকটি ইন্টারসেপ্টরের খরচ পড়ে ৫০ থেকে ৭০ হাজার ডলার। অন্যদিকে একটি থাড ইন্টারসেপ্টরের দাম প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
তিনজন মার্কিন কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইরানের ওপর হামলার প্রথম দুই দিনেই পেন্টাগন ৫৬০ কোটি ডলার মূল্যের গোলাবারুদ খরচ করেছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, যুদ্ধের পরিকল্পনা করার সময় আইডিএফ নিশ্চিত করেছিল, দীর্ঘস্থায়ী লড়াই চালিয়ে নেওয়ার জন্য তাদের কাছে ‘পর্যাপ্ত ইন্টারসেপ্টর’ মজুত রয়েছে।
তবে কোচাভ বলেন, জনবহুল এলাকা বা কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ কোনো স্থাপনার দিকে কোনো হুমকি ধেয়ে আসতে দেখলে ইন্টারসেপ্টরের আর্থিক মূল্য বিবেচ্য বিষয় নয়। তাঁর মতে, দীর্ঘ সময় ধরে দেশের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সচল রাখার জন্য তাঁরা এখন ইন্টারসেপ্টরের সহজলভ্যতা বা মজুতের বিষয়টিকেই একমাত্র সম্পদ হিসেবে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক ইয়েহুশুয়া কালিস্কি ব্যাখ্যা করেন, বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন স্তরে ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সর্বোচ্চ স্তর অ্যারো-৩ এমনভাবে তৈরি, যাতে এটি বায়ুমণ্ডলের বাইরেই শত্রুর ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে পারে। এটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে দ্বিতীয় স্তরে ‘অ্যারো ২’ ব্যবহার করা হয়।
কালিস্কি বলেন, সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে একটি ব্যবস্থা অন্যটির পরিপূরক বা ব্যাকআপ হিসেবে কাজ করে। তবে তিনি যোগ করেন, বাস্তবে ১০০ শতাংশ নিশ্ছিদ্র প্রতিরক্ষা বলে কিছু নেই।


