Last Updated on 13 hours by zajira news
বিনোদন ডেস্ক, জাজিরা নিউজ: দক্ষিণ সিনেমার আলোচিত জুটি রাশমিকা মান্দানা ও বিজয় দেবরাকোন্ডা দীর্ঘ জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হলেন।
রাজস্থানের ঐতিহাসিক শহর উদয়পুরে পারিবারিক ও ঘনিষ্ঠ আয়োজনে সম্পন্ন হয় তাঁদের বিয়ে। রাজকীয় আবহ, কড়া গোপনীয়তা, ঐতিহ্যবাহী আচার আর তারুণ্যের উচ্ছ্বাস, সব মিলিয়ে আয়োজনটি ছিল রূপকথার মতো।
বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) ভোরের শান্ত আবহে শুরু হয় বিয়ের মূল আনুষ্ঠানিকতা। তেলেগু রীতি অনুযায়ী প্রথমে গণেশপূজা ও পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে মঙ্গলাচরণ করা হয়। এরপর অগ্নিকে সাক্ষী রেখে সম্পন্ন হয় ‘সপ্তপদী’—সাতটি প্রতীকী পদক্ষেপ, যা দাম্পত্য জীবনের সাতটি অঙ্গীকারের প্রতীক। পুরোহিতের মন্ত্র উচ্চারণের মধ্যে কনে-বর অগ্নি প্রদক্ষিণ করেন। মালাবদল, কন্যাদান ও আশীর্বাদের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় সকালের পর্ব। ঐতিহ্য অনুযায়ী পরিবার-পরিজনের প্রবীণ সদস্যরা নবদম্পতির কপালে কুমকুম ও হলুদ ছুঁইয়ে আশীর্বাদ জানান।
বিকেলে আয়োজন করা হয় কোডাভা রীতি অনুযায়ী দ্বিতীয় পর্ব। কর্ণাটকের কোডাগু অঞ্চলের এই ঐতিহ্যে পোশাক, সংগীত ও আচার-অনুষ্ঠানে থাকে আলাদা বৈশিষ্ট্য। কনের পারিবারিক শিকড়কে সম্মান জানিয়ে এই পর্ব রাখা হয়। কোডাভা সংস্কৃতিতে পারিবারিক প্রবীণদের উপস্থিতি ও আশীর্বাদ বিশেষ গুরুত্ব পায়; সে অনুযায়ী দুই পরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্যদের কেন্দ্র করেই সম্পন্ন হয় অনুষ্ঠান। দুই ভিন্ন সাংস্কৃতিক ধারার এই মিলন বিয়েটিকে দেয় এক অনন্য মাত্রা; একদিকে তেলেগু আচার, অন্যদিকে কোডাভা ঐতিহ্য—দুটোর সমন্বয়েই যেন তৈরি হয় পূর্ণতা।
অনুষ্ঠানটি হয় উদয়পুরের একটি বিলাসবহুল হেরিটেজ হোটেলে। রাজকীয় স্থাপত্য, লেকঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর সুসজ্জিত মণ্ডপ—সব মিলিয়ে ছিল নান্দনিক পরিবেশ। অতিথিদের তালিকা রাখা হয় সীমিত; শুধু দুই পরিবারের সদস্য, ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও ইন্ডাস্ট্রির অল্প কয়েকজন আমন্ত্রিত ছিলেন।

ব্যক্তিগত মুহূর্তের গোপনীয়তা বজায় রাখতে মুঠোফোন ব্যবহার ও ছবি তোলায় ছিল কঠোর বিধিনিষেধ। আমন্ত্রণপত্রেও উল্লেখ ছিল, অনুষ্ঠানটি যেন সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত থাকে। ফলে ঝলমলে তারকাখচিত আয়োজন হলেও তা ছিল অন্তরঙ্গ ও সংযত—পরিবারকেন্দ্রিক এক পরিণয়ের গল্প।
বিয়ের আসরে রাশমিকার পরনে ছিল মরচে-কমলারঙা সোনালি পাড়ের শাড়ি, যার সঙ্গে ভারী সোনালি কাজের ব্লাউজ। ঐতিহ্যবাহী সোনার গয়নায় সজ্জিত ছিলেন তিনি—বহুস্তর হার, বাহুবন্ধ, মাঙ্গটিকা, কড়া ও বড় ঝুমকা। খোলা ঢেউখেলানো চুলে জুঁই ফুলের মালা তাঁর সাজে এনে দেয় দক্ষিণি ঐতিহ্যের কোমল সৌন্দর্য। এই বিশেষ বিয়ের পোশাকটি ডিজাইন করেছেন খ্যাতনামা ডিজাইনার অনামিকা খান্না। স্টাইলিংয়ে ছিল সাবেকি ঘরানার ছোঁয়া, যা কনের আভিজাত্যকে আরও উজ্জ্বল করেছে। অন্যদিকে বিজয় পরেছিলেন আইভরি রঙের ধুতি–শৈলীর পোশাক, সঙ্গে গাঢ় সিঁদুররঙা অঙ্গবস্ত্র। অঙ্গবস্ত্রে সূক্ষ্ম সূচিকর্মে ফুটে উঠেছিল অরণ্য ও মন্দিরের নকশা—শক্তি ও পবিত্রতার প্রতীক।
কানে দুল, সোনার কোমরবন্ধ ও হার তাঁর সাজকে সম্পূর্ণ করে। বরমালার সময় আবেগে ভেঙে পড়েন দুজনই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, একে অপরকে মালা পরানোর সঙ্গে সঙ্গেই চোখে জল চলে আসে তাঁদের।
বিয়ের আয়োজনের আড়ালে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে পারিবারিক রীতি ও দক্ষিণি সংস্কৃতির ঐতিহ্য। অতিথিদের আপ্যায়নে ছিল সম্পূর্ণ দক্ষিণ ভারতীয় ধাঁচ—কলাপাতায় পরিবেশন করা হয় নানা পদ। ভাত, সাম্বর, রসম, বিভিন্ন সবজিভাজা ও কারি, পায়েস ও ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন—সবই সাজানো হয় পরম যত্নে। পরিবেশনের ধরনেও ছিল নিয়ম মেনে বিন্যাস; কলাপাতার নির্দিষ্ট অংশে নির্দিষ্ট পদ রাখা হয়, যা দক্ষিণ ভারতের সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পানীয় হিসেবে পরিবেশন করা হয় ডাবের পানি, যা সতেজতার পাশাপাশি শুভতার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত। রীতিনীতি অনুযায়ী কনের পরিবার থেকে বরের পরিবারকে উপহার দেওয়া হয় নারকেল, পানপাতা, ফল, মিষ্টি, হলুদ ও কুমকুম। দক্ষিণ ভারতীয় বিয়েতে এসব উপকরণ সমৃদ্ধি, শুভলক্ষণ ও নতুন জীবনের আশীর্বাদের প্রতীক। নারকেল ধরা হয় পবিত্রতার চিহ্ন, আর হলুদ ও কুমকুম দাম্পত্য জীবনের মঙ্গল কামনার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে বরের পরিবারের পক্ষ থেকেও ছিল আবেগঘন এক মুহূর্ত।
বিজয়ের মা পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে নববধূ রাশমিকার হাতে বংশপরম্পরায় পাওয়া সোনার চুড়ি পরিয়ে দেন। এ আচার শুধু অলংকার প্রদান নয়; এটি নববধূকে দেবরাকোন্ডা পরিবারের সদস্য হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতীক। আশীর্বাদের হাত রেখে তাঁকে স্বাগত জানান শ্বশুরবাড়ির বড়রা। সে মুহূর্তে উপস্থিত স্বজনদের চোখেমুখে ছিল আনন্দ আর আবেগের মিশেল—একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনায় দুই পরিবারের বন্ধন আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে।
বিয়ের মূল আনুষ্ঠানিকতার আগে একাধিক প্রাক্-বিবাহ আয়োজনে যেন তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে উদয়পুরের ভেন্যু। গায়েহলুদের আসরে প্রাধান্য পেয়েছিল হলুদ ও কমলা রঙের ফুল। গাঁদা, রজনীগন্ধা ও ঐতিহ্যবাহী দক্ষিণি ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছিল মণ্ডপ। কনে-বরের পরিবারের সদস্যরা হাসিঠাট্টা আর আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে হলুদ পরিয়ে দেন নবদম্পতিকে। পরিবেশ ছিল ঘরোয়া, কিন্তু রঙিন ও প্রাণবন্ত।
সন্ধ্যায় হয় সংগীতানুষ্ঠান।
ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের পরিবেশনায় জমে ওঠে রাত। কেউ গেয়েছেন প্রিয় গান, কেউ নেচেছেন পুরোনো স্মৃতির তালে। এ আয়োজনে বিশেষ চমক হিসেবে রাশমিকা পরিবেশন করেন ‘অঙ্গারোঁ’ গানের নাচ। শোনা যায়, এটি ছিল বিজয়ের জন্য তাঁর পরিকল্পিত সারপ্রাইজ। পরে নবদম্পতিও একসঙ্গে নাচে যোগ দেন, যা উপস্থিত অতিথিদের জন্য ছিল স্মরণীয় মুহূর্ত।
প্রি-ওয়েডিং অনুষ্ঠানে আধুনিকতার ছোঁয়াও ছিল চোখে পড়ার মতো। কে-ড্রামা থিমে সাজানো হয় একটি বিশেষ সন্ধ্যা—রাশমিকা কোরিয়ান সংস্কৃতির ভক্ত বলেই এমন ব্যতিক্রমী পরিকল্পনা। থিমভিত্তিক কেক, ব্যাকড্রপ ও আলোকসজ্জায় ফুটে ওঠে সেই ভাবনা।
এ ছাড়া ছিল পুল পার্টি ও ওয়াটার ভলিবলের মতো অনানুষ্ঠানিক আয়োজন, যেখানে দুই পরিবারের তরুণ সদস্য ও বন্ধুদের অংশগ্রহণে তৈরি হয় উৎসবের আবহ। ‘বিরশ প্রিমিয়ার লিগ’ নামে বন্ধুত্বপূর্ণ একটি ক্রিকেট ম্যাচও আয়োজন করা হয়, যা ছিল পুরো অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ। হাসি, খুনসুটি আর প্রতিযোগিতার মধ্যেও স্পষ্ট ছিল দুই পরিবারের ঘনিষ্ঠতার বন্ধন। সব মিলিয়ে প্রাক্-বিবাহের প্রতিটি পর্বেই ছিল ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মিশেল, যেখানে পারিবারিক আবেগের সঙ্গে মিলেছে তারুণ্যের উচ্ছ্বাস।
রাশমিকা ও বিজয়ের প্রেমের গুঞ্জন শুরু হয় ‘গীত গোবিন্দম’ ছবির সেট থেকে। পরবর্তী সময়ে ‘ডিয়ার কমরেড’-এ তাঁদের রসায়ন দর্শকদের মুগ্ধ করে। যদিও প্রকাশ্যে কখনো সম্পর্কের কথা স্বীকার করেননি তাঁরা, একসঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিতি ও ভ্রমণই ইঙ্গিত দিয়েছিল ঘনিষ্ঠতার।
বিয়ের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেচ্ছাবার্তায় ভরে যায় বিজয়–রাশমিকার টাইমলাইন। ভক্তদের দেওয়া নাম ‘বিরশ’ এখন আনুষ্ঠানিক দম্পতির পরিচয়। রাজকীয় আয়োজনের আড়ালে ছিল দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব, আস্থা ও ভালোবাসার গল্প। উদয়পুরের আকাশের নিচে, পরিবার-পরিজনের আশীর্বাদে শুরু হলো রাশমিকা ও বিজয়ের নতুন জীবন।

