Last Updated on 4 hours by zajira news
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, জাজিরা নিউজ: ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলছে অস্থিরতা, যার প্রভাব পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। এই যুদ্ধে জয়ের জন্য ধর্মের কার্ড খেলছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
বিষয়টি নিয়ে লিখেছেন পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক হামিদ মির। লেখাটি ১৩ মার্চ প্রকাশ করেছে লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম লন্ডন পোস্ট।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধে ধর্মীয় রং দিচ্ছে কে? ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধের মূল লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করা। কিন্তু ওভাল অফিসে খ্রিষ্টান যাজক ও ধর্মীয় নেতাদের নিয়ে এই যুদ্ধে জয়ের জন্য বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করেছিলেন কে?
বিশ্ব গণমাধ্যমে সেই বিশেষ প্রার্থনার একটি ছবি প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে যাজক গ্রেগ লরিসহ কয়েকজন ধর্মীয় নেতাকে দেখা যায়—তাঁরা ট্রাম্পের কাঁধে হাত রেখে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয়ের জন্য প্রার্থনা করছেন। এই ব্যক্তিরা বহু বছর ধরে আমেরিকানদের এমন একটি বৃহৎ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে আসছেন, যা অ্যান্টিক্রাইস্টের (খ্রিষ্টধর্মমতে, যিশুখ্রিষ্টের বিরোধী অশুভ শক্তি) আবির্ভাবের আগে ঘটবে বলে তাঁরা বিশ্বাস করেন। এই যুদ্ধকে বলা হয় আর্মাগেডন।
ট্রাম্পই প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট নন, যিনি ধর্মের কার্ড খেলছেন। তাঁর আগে রিচার্ড নিক্সন, জিমি কার্টার, রোনাল্ড রিগ্যান ও জর্জ বুশও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন।

ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ানসহ পশ্চিমা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ইউএস মিলিটারি রিলিজিয়াস ফ্রিডম ফাউন্ডেশন (এমআরএফএফ) ইতিমধ্যে ২০০–এর বেশি অভিযোগ পেয়েছে, যাতে বলা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কিছু কমান্ডার তাঁদের অধীন ব্যক্তিদের বলছেন—যিশুখ্রিষ্ট ট্রাম্পকে ইরানে হামলার নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ, যিশু পৃথিবীতে ফিরে আসছেন এবং বাইবেলে যে আর্মাগেডনের কথা বলা হয়েছে, এটিই সেই যুদ্ধ। ১৫ জন মার্কিন সেনাসদস্য যৌথভাবে এমন একটি লিখিত অভিযোগ পাঠিয়েছেন। ওই সেনাসদস্যদের মধ্যে ১১ জন খ্রিষ্টান, একজন মুসলিম ও একজন ইহুদি সেনাসদস্য রয়েছেন। এই অভিযোগ থেকে বোঝা যায়, ধর্মের এই কার্ড যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকেও বিভক্ত করেছে।
ট্রাম্প এই যে ধর্মীয় কার্ড খেলছেন, তা থেকে স্পষ্ট হয় যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি শাহাদাতবরণের পরেও দেশটিতে শাসকগোষ্ঠীর পরিবর্তনের দাবিতে বড় ধরনের আন্দোলন না হওয়ায় ট্রাম্প এখন যুদ্ধকে ধর্মীয় রং দিয়ে অন্য কিছু লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করছেন। তবে সেই লক্ষ্যগুলোর কথা বলার আগে মনে রাখা দরকার, ট্রাম্পই প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট নন, যিনি ধর্মকে রাজনীতির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন। কিছু মার্কিন ধর্মীয় নেতা বহু বছর ধরে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থনকে তাঁদের ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে ঘোষণা করে আসছেন। তাঁদের বিশ্বাস, আর্মাগেডনের পর যিশু (আ.) ফিরে আসবেন।
আর্মাগেডন শব্দটি দুটি হিব্রু শব্দের সমন্বয়ে এসেছে। ‘হার’ অর্থ পাহাড় এবং ‘মেগিদ্দো’ হলো ফিলিস্তিনের একটি উপত্যকার নাম। মুসলিম, খ্রিষ্টান ও ইহুদি—তিন ধর্মের নানা গ্রন্থেই এই যুদ্ধের কারণ ও পরিণতি নিয়ে বিস্তর আলোচনা রয়েছে।
১৯৯৩ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্যামুয়েল পি হান্টিংটন ফরেন অ্যাফেয়ার্স সাময়িকীতে ‘ক্লাস অব সিভিলাইজেশনস (সভ্যতার সংঘাত)’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। সেখানে আর্মাগেডনের ধারণা ঘিরে আলোচনা ছিল। পরে তিনি সেই প্রবন্ধকে বই আকারে প্রকাশ করেন।
হান্টিংটন তাঁর লেখায় সৌদি চিন্তাবিদ ড. সাফার আল-হাওয়ালি আল-গামদির বক্তব্য উদ্ধৃত করেন। তিনি বলেছিলেন, ভবিষ্যতের বড় যুদ্ধ হবে পশ্চিমা বিশ্ব ও ইসলামের মধ্যে।
১৯৯৪ সালে দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বৈঠকে হান্টিংটন ‘সভ্যতার সংঘাত’ তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। আমি তখন সেখানে উপস্থিত ছিলাম। একজন সাংবাদিক হিসেবে সম্মেলনের ফাঁকে আমি প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের (পিএলও) প্রধান ইয়াসির আরাফাত এবং ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিমন পেরেজের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম।
আমি একটি বৈঠকের কথা মনে করতে পারি, যেখানে ইয়াসির আরাফাত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর কাছে অনুরোধ করেছিলেন, পাকিস্তান যেন ইসরায়েলকে স্বীকৃতি না দেয় এবং তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনায় না বসে। বেনজির ভুট্টো তখন ইয়াসির আরাফাতকে প্রশ্ন করেন যে ‘আপনারা তো মাদ্রিদ সম্মেলনে ইসরায়েলিদের সঙ্গে বসেছিলেন এবং পরে অসলো চুক্তিতেও স্বাক্ষর করেছেন। তাহলে আমাদের কেন তাদের সঙ্গে বসতে নিষেধ করছেন?’
জবাবে ইয়াসির আরাফাত বলেন, ‘আমরা সবকিছু করছি বন্দুকের মুখে। আমাদের দেয়ালের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এই দুর্বল অবস্থায় আমরা পাকিস্তানের মতো দেশগুলোর সহায়তায় একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই। কিন্তু ইসরায়েল সমঝোতা আলোচনার নামে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করছে।’
বাস্তবেও দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আলোচনার নামে ইয়াসির আরাফাতের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। এর ফলেই ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক পরিচয় হিসেবে পিএলওর জায়গায় হামাস সামনে আসে। ২০০৯ সালে আমি গাজার রাস্তায় ইসরায়েলি সেনাদের দেখেছি। সেখানে ইসরায়েলি সেনাদের ট্যাংক এবং তার বিপরীতে পাথর ছোড়া ফিলিস্তিনিদের সংঘর্ষের দৃশ্য দেখার সুযোগ আমার হয়েছিল।
একদিন ইসরায়েল গাজার একটি গির্জায় বোমা হামলা চালায়। আমি যখন গির্জার ধ্বংসস্তূপে পৌঁছাই, তখন সেখানে দায়িত্বে থাকা একজন খ্রিষ্টান পুরোহিতের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলার সুযোগ হয়। তিনি আমাকে বলেন, ‘আমরা ফিলিস্তিনিরা ইহুদিবাদী চরমপন্থী এবং আমেরিকান খ্রিষ্টান চরমপন্থীদের বিপথগামী মতাদর্শের কাছে বন্দী হয়ে আছি—যার নাম আর্মাগেডন।’
ওই পুরোহিত বলেন, আর্মাগেডন নিয়ে ইহুদিদের মধ্যে কোনো ঐকমত্য নেই। অনেক মৌলবাদী ইহুদি ইসরায়েল রাষ্ট্রকেই স্বীকার করেন না। তাঁরা বিশ্বাস করেন, যিশু (আ.) ফিরে আসার পর সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা ইহুদিদের একত্র করা হবে। সেখানে চরমপন্থী ইহুদিরা বলেন, ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এখন তাদের কাজ হলো আল আকসা মসজিদের জায়গায় সলোমনের মন্দির নির্মাণ করা এবং রাষ্ট্রের সীমানা নীল নদ থেকে ইউফ্রেটিস (ফোরাত) নদী পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা।
ওই ফিলিস্তিনি পুরোহিত আরও বলেন, এই বিষয়ে খ্রিষ্টানদের মধ্যেও মতভেদ রয়েছে। আমরা আমেরিকান পাদরিদের আর্মাগেডন সংক্রান্ত অবস্থানের সঙ্গে একমত নই। তিনি হামাসের একজন সমর্থক ছিলেন।
২০২৪ সালে লেবানন-ইসরায়েল যুদ্ধের খবর সংগ্রহ করার সময় বৈরুতে অনেক খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। তাঁরা হামাস ও হিজবুল্লাহকে সমর্থন করতেন। স্পষ্টতই আর্মাগেডন নিয়ে ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের মধ্যেও কোনো ঐকমত্য নেই।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর হামলাকে আর্মাগেডনের শুরু বলে ঘোষণা করেছেন। যদি এমনটা ঘটে, তাহলে তাতে শুধু মুসলিম দেশগুলোতে মার্কিনবিরোধী চরমপন্থীদেরই লাভ হবে।
পরবর্তী যুদ্ধ পশ্চিমা বিশ্ব ও ইসলামের মধ্যে হবে বলে ড. সাফার আল-হাওয়ালির এই বক্তব্য অধ্যাপক হান্টিংটন তাঁর লেখায় উল্লেখ করার পর ১৯৯৪ সালে এই সৌদি চিন্তাবিদকে গ্রেপ্তার করা হয়। মূলত আর্মাগেডন বিষয়ে ইহুদিরাষ্ট্রপন্থী ও আমেরিকান ধর্মীয় নেতাদের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে সাফার আল-হাওয়ালি বলেন যে পশ্চিমা ও মুসলিমদের মধ্যে একটি বড় যুদ্ধ হতে চলেছে। তাই আরব দেশগুলোর নিজেদের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি করতে দেওয়া উচিত হবে না। ২০১৮ সালেও তাঁকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়।
আজকে ট্রাম্প যেটা করছেন, তাতে কি সাফার আল-হাওয়ালির প্রতি সহানুভূতি বাড়বে না?
ট্রাম্পই প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট নন, যিনি ধর্মের কার্ড খেলছেন। তাঁর আগে রিচার্ড নিক্সন, জিমি কার্টার, রোনাল্ড রিগ্যান ও জর্জ বুশও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন।
এই মার্কিন প্রেসিডেন্টদের সবাই যুক্তরাষ্ট্রের লিবার্টি ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা জেরি ফলওয়েলের অনুসারী ছিলেন। ফলওয়েলও ইসরায়েলের সীমানা নীল নদ থেকে ফোরাত পর্যন্ত বিস্তৃত বলে দাবি করতেন। সেই সীমানার মধ্যে গাজা, ইরাক, সিরিয়া, তুরস্ক, সৌদি আরব, মিসর, লেবানন, জর্ডান ও কুয়েত অন্তর্ভুক্ত।
ব্রিটেন ও ইউরোপ ইরান হামলা থেকে নিজেদের দূরে রাখার চেষ্টা করছে। কারণ, এই যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে বৈশ্বিক অর্থনীতি ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এখন প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প কি সত্যিই ধর্মীয় দায়িত্ব মনে করে সর্বান্তকরণে ইরানকে ধ্বংস করতে চান? বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এই যুদ্ধকে আর্মাগেডন মনে করেন না এবং ট্রাম্পকেও ধর্মীয় ব্যক্তি হিসেবে দেখেন না।
আমেরিকানদের বড় অংশ বিশ্বাস করেন যে ট্রাম্প এপস্টিন ফাইল থেকে মনোযোগ সরাতে চেষ্টা করছেন। ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের কাছে নাকি এমন প্রমাণ রয়েছে যে ট্রাম্প অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের নিপীড়ন করছেন। সেই প্রমাণ দেখিয়ে তাঁকে ব্ল্যাকমেল করা হচ্ছে এবং নেতানিয়াহুর চাপে তিনি ইরানে হামলা করেছেন, যাতে সম্ভাব্য যৌন কেলেঙ্কারি থেকে গণমাধ্যমের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়া যায়।
এই হামলার পর পরিস্থিতি বদলানো না গেলে ট্রাম্প ধর্মের কার্ড খেলতে শুরু করেন।
ট্রাম্পের ধর্মের কার্ড তাঁর জন্য কাজ করুক বা না করুক—মুসলিম বিশ্বের সেই মতাদর্শিক গোষ্ঠীর জন্য এটি অবশ্যই কাজ করবে, যারা ড. সাফার আল-হাওয়ালির বক্তব্যের সঙ্গে একমত।
অতএব ট্রাম্পের এই যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষের চরমপন্থীদের স্বার্থেই কাজ করছে। সূত্র, প্রথম আলো

