সময়ের জনমাধ্যম

তিন কৌশলে হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে রেখে যুক্তরাষ্ট্রকে বেকায়দায় ফেলছে ইরান

Last Updated on 28 mins by zajira news

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, জাজিরা নিউজ: প্রায় চার সপ্তাহ ধরে কার্যত বন্ধ রয়েছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি। এর ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে এবং এ অচলাবস্থা দ্রুতই কাটার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

পারস্য উপসাগরে ইরানের হুমকি ও জাহাজে হামলার আশঙ্কায় এ সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে নৌযান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়েই সরবরাহ করা হয়। এ ছাড়া বিশ্বের খাদ্য উৎপাদনে প্রয়োজনীয় সার সরবরাহের প্রধান পথও এটি।

জ্বালানি সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অবরোধ তুলে নিতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার কথা বলছেন। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে আরও হাজার হাজার সেনা মোতায়েন ও তেলবাহী জাহাজগুলোকে মার্কিন নৌবাহিনীর পাহাড়ায় পার করে দেওয়ার উপায় খুঁজছেন তিনি।

তবে অনেক ক্ষেত্রেই ইরানের পাল্লা এখনো ভারী। এর একটি বড় কারণ, দেশটির অপ্রচলিত যুদ্ধপদ্ধতি, যেমন সস্তা ড্রোন ও সমুদ্রমাইনের ব্যবহার। অন্য কারণটি হলো ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান। এ তিন বাস্তবতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য দেশগুলোর পক্ষে এ পথে জাহাজ রক্ষা করা বা সামরিকভাবে এ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক সাময়িকী ‘দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্টের (টিএনআই) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহের পথ হরমুজ প্রণালি বাস্তবিক অর্থে ‘কৌশলগত গলিপথে’ পরিণত হয়েছে। ফলে অন্যখানে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠত্ব থাকলেও এ পথের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসের জন্য স্থবির হয়ে যেতে পারে।ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর দ্য ন্যাশনাল সেন্টার এ সাময়িকী প্রকাশ করে থাকে।

ইরান ইতোমধ্যে প্রণালিটি অবরুদ্ধ করেছে, ফলে পণ্য বাণিজ্যে বীমার হার নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে এবং হরমুজ দিয়ে বেশিরভাগ জাহাজের চলাচল বন্ধ রয়েছে।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ওমান উপকূলের কাছে স্কাইলাইট, এমকেডি ভিওম, হারকিউলিস স্টারসহ অন্তত ২০টি জাহাজে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমাবাহী নৌকা হামলার ঘটনা তেল বাণিজ্য ব্যাহত করার চেষ্টারই ইঙ্গিত দেয়।

টিএনআই লিখেছে, ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এই সরু জলপথকে বাস্তবেই মাইনফিল্ডে পরিণত করতে পারে। তাদের হাতে আনুমানিক পাঁচ থেকে ছয় হাজার নৌমাইন রয়েছে এবং প্রণালির উভয়পাশের স্থাপনার মাধ্যমে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ এ পথ বন্ধ করে দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে আইআরজিসির।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের মাইন পোঁতার সক্ষমতা এখানে একটি দিক। আরেকটি দিক হল, সেসব মাইন অপসারণের খুব বেশি সুযোগ যুক্তরাষ্ট্রের সামনে নেই। ফলে তেহরানের হুমকি অনেক বেশি বিপজ্জনক হয়ে দেখা দিচ্ছে।

অবসরে যাওয়া চারটি জাহাজ নিয়ে মার্কিন নৌবাহিনীর মাইন অপসারণ বহর কেবল উপকূলীয় যুদ্ধজাহাজ ও হেলিকপ্টারের ওপর নির্ভর করতে পারে, যা এ হুমকির পরিসরের তুলনায় স্পষ্টতই অপর্যাপ্ত।

সংঘাতপূর্ণ জলসীমা থেকে হাজারো মাইন অপসারণ করতে দীর্ঘ, কষ্টসাধ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজের দরকার হতে পারে। আর এ কর্মযজ্ঞ যতদিন চলবে, বৈশ্বিক তেলের বাজার অস্থির থাকবে, বীমা প্রিমিয়াম আরও বেড়ে যাবে এবং তেলবাহী জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাবে; ফলে বিশ্ব অর্থনীতি টালমাটাল অবস্থায় পড়বে।

প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘প্রয়োজন হলে’ এবং ‘যত দ্রুত সম্ভব’ মার্কিন নৌবাহিনী তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে উপসাগর অতিক্রম করাতে পারে।

তবে নিরাপত্তা বহরের মাধ্যমে যাতায়াতের এই পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত সমাধান নয়, কারণ অতিরিক্ত চাপে থাকা নৌবহরকে একটি সরু প্রণালিতে কাজ করতে হবে। তাছাড়া এটি মাইনের হুমকি কমাতে পারবে না।

টিএনআই লিখেছে, প্রণালিটি সচল করতে গত সপ্তাহে ছয়টি পশ্চিমা দেশ সহায়তার ঘোষণা দিলেও সেই প্রতিশ্রুতি অস্পষ্ট এবং ভেস্তে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। ফলে প্রণালির কাছে অবস্থানরত ইরানি বাহিনীকে নিশানা করা ছাড়া কার্যকর আর সমাধান থাকছে না।

ইরানের আক্রমণাত্মক অবস্থানের জবাব দিতে মার্কিন যুদ্ধবিমান ও সামরিক উড়োজাহাজ গত শুক্রবার থেকে এ প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

নিউ ইয়র্ক টাইমস গত ১২ মার্চ জানায়, ইরান হরমুজ প্রণালিতে মাইন পাতা শুরু করেছে, সতর্কবার্তা হিসেবে সম্ভবত তা সীমিত পরিসরে করা হয়েছে। তবে তেহরান ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে মাইন পেতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করার বিকল্প খোলা রাখতে পারে।

টিএনআই লিখেছে, ইরানের নৌযুদ্ধে জেতার প্রয়োজন নেই। প্রণালিতে সস্তা মাইন ফেলেই তেহরান বিলিয়ন ডলারের যুদ্ধজাহাজ ও বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্থবির করে দিতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল সত্যিই ইরানি শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাতে পারবে কি না, শেষ পর্যন্ত তা হরমুজই ঠিক করবে।