সময়ের জনমাধ্যম

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠকে যেসব ইস্যু গুরুত্ব পাবে : আল-জাজিরার বিশ্লেষণ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং I ফাইল ছবি

Last Updated on 1 hour by zajira news

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, জাজিরা নিউজ: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বহুল আলোচিত বৈঠকে তাইওয়ান ইস্যু, বাণিজ্য শুল্ক এবং ইরান যুদ্ধ প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠতে যাচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার ছায়ায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই শীর্ষ বৈঠককে দুই পরাশক্তির সম্পর্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বুধবার (১৩ মে) সন্ধ্যায় তিন দিনের সফরে চীনে পৌঁছানোর কথা ট্রাম্পের। ২০১৭ সালে প্রথম মেয়াদের শুরুতে সফরের পর এটিই হবে কোনও মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রথম চীন সফর।

বিশ্লেষকদের মতে, নীতিনির্ধারণে ট্রাম্পকে যেখানে অপ্রত্যাশিত ও পরিবর্তনশীল হিসেবে দেখা হয়, সেখানে শি জিনপিং তুলনামূলকভাবে স্থির ও পূর্বানুমেয় কৌশল অনুসরণ করেন। বিশেষ করে জাতীয় নিরাপত্তা ও ভূখণ্ডের অখণ্ডতা নিয়ে চীনের দীর্ঘদিনের ‘মূল স্বার্থ’ এই বৈঠকে গুরুত্ব পাবে।

বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোর একটি হচ্ছে তাইওয়ান। তাইওয়ানের সরকার নিজেদের কার্যত স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করলেও বেইজিং দ্বীপটিকে চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করে। যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দশক আগে তাইওয়ানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করলেও ১৯৭৯ সালের তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্ট অনুযায়ী দ্বীপটির প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বজায় রেখেছে।

ওয়াশিংটন তাইওয়ানকে বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সরবরাহ, সামরিক প্রশিক্ষণ এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ে সহায়তা করে আসছে। চীন এসব কর্মকাণ্ডকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখে। মার্কিন প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে যে, চীন তাইওয়ানকে নিজেদের অংশ মনে করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র নিজে এই দাবির সঙ্গে একমত কি না- সে বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেয় না।

এছাড়া চীন যদি সামরিক শক্তি ব্যবহার করে তাইওয়ান দখলের চেষ্টা করে, সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করবে কি না, সে বিষয়েও ওয়াশিংটনের অবস্থান ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট রাখা হয়েছে।

গত মাসে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে ফোনালাপে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই স্পষ্টভাবে জানান, তাইওয়ান ইস্যু শীর্ষ বৈঠকে উত্থাপিত হবে। বিবৃতিতে ওয়াং ই তাইওয়ানকে ‘চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

মঙ্গলবার ট্রাম্পের চীন সফর শুরুর আগে ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসও একই বার্তা পুনর্ব্যক্ত করে। তারা তাইওয়ানকে চারটি ‘লাল রেখার’ প্রথম হিসেবে উল্লেখ করে, যেগুলো ‘কোনওভাবেই চ্যালেঞ্জ করা যাবে না।”

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের চাপের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের তাইওয়ান নীতিতে বড় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম। তবে ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন, বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে তাইওয়ানে মার্কিন অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি থাকবে। এতে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের স্থগিত অস্ত্রচুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

মার্কিন কংগ্রেস চলতি বছরের শুরুতে অস্ত্র প্যাকেজ অনুমোদন করলেও তা কার্যকর করতে এখনও ট্রাম্পের চূড়ান্ত অনুমোদন প্রয়োজন। তাইপেভিত্তিক বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াং বলেন, শি জিনপিং ট্রাম্পকে অস্ত্র বিক্রি কমানো বা স্থগিত করতে রাজি করানোর চেষ্টা করবেন।

তিনি বলেন, যদি ট্রাম্প অস্ত্র বিক্রিতে ছাড় দেন, তবে তা হবে সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের সময় থেকে চলে আসা মার্কিন নীতির বড় পরিবর্তন। বিশ্লেষকদের মতে, অস্ত্রচুক্তি বাতিল বা দুর্বল করা হলে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম লাই চিং-তে’র জন্য এটি বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হবে। বর্তমানে তিনি প্রতিরক্ষা বাজেট নিয়ে বিরোধীদের সঙ্গে তীব্র রাজনৈতিক লড়াইয়ে রয়েছেন।

শুধু তাইওয়ান নয়, চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সম্পর্কও বৈঠকের বড় আলোচ্য বিষয় হতে যাচ্ছে। গত দেড় বছরে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয়। পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপের ফলে কিছু ক্ষেত্রে আমদানি শুল্ক ১০০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে যায়। যদিও গত মে মাসে উভয় দেশ সাময়িকভাবে উত্তেজনা কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তারপরও বেশ কিছু শুল্ক ও রফতানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বহাল রয়েছে।

এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি কয়েক দফা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে চীনা কোম্পানির ওপর। বিশেষ করে ইরানি তেল কেনা এবং ইরানকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির উপকরণ সরবরাহের অভিযোগে এসব নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এর জবাবে বেইজিং নিজেদের তেল শোধনাগারগুলোকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করার নির্দেশ দেয়।

বেইজিংভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান হুতং রিসার্চের অংশীদার ফেং চুচেং বলেন, চীন ট্রাম্পের পুরো মেয়াদজুড়ে একটি ‘পূর্বানুমেয় ও স্থিতিশীল সম্পর্ক’ চায়, যাতে তারা নিজেদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নির্ভরতার সঙ্গে সাজাতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতও বৈঠকে বড় প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও চীন সরাসরি যুদ্ধে জড়িত নয়, তবে হরমুজ প্রণালী অচল হয়ে পড়ায় দেশটি অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। শুরু থেকেই বেইজিং যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার আহ্বান জানিয়ে আসছে।

বেইজিংয়ের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জোডি ওয়েন বলেন, শি জিনপিং ট্রাম্পকে বলবেন যে, যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতি, এশীয় দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্র- সবার ওপর বড় প্রভাব ফেলছে। তাই সংলাপের বিকল্প নেই। তবে ট্রাম্প মঙ্গলবার বলেছেন, যুদ্ধ সমাধানে তার চীনের ‘সহায়তা প্রয়োজন নেই’।

ইরানের সঙ্গে চীনের ‘সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারত্ব’ রয়েছে ২০১৬ সাল থেকে। বর্তমানে ইরানের রফতানি হওয়া তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কিনে চীন। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে শি জিনপিং ও ওয়াং ই বিশ্বের একাধিক নেতা ও কূটনীতিকের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, চীন পর্দার আড়ালে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের চেষ্টা করছে।

তবে গবেষক জোডি ওয়েন বলেন, চীন সরাসরি কোনও সামরিক বা রাজনৈতিক জোটে জড়াবে না। তার ভাষায়, “চীনের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি হচ্ছে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা। এটিই আমাদের নীতি।”

বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈঠকের ফলাফল শুধু চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নয়, বরং তাইওয়ান প্রণালী, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতিতেও ফেলতে পারে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব। সূত্র: আল-জাজিরা