সময়ের জনমাধ্যম

শহীদ খামেনির বিদায় অনুষ্ঠান শুরু : শোকের সাগরে ভাসছে মুসলিম বিশ্ব

Last Updated on 10 hours by zajira news

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, জাজিরা নিউজ:ইসলামী বিপ্লবের শহীদ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির জানাজা অনুষ্ঠানের প্রথম ধাপ শুরু করেছে ইরান। তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় বিদেশি গণ্যমান্য ব্যক্তি ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা তাদের শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন।

নেতার মরদেহ ও তার সঙ্গীদের কফিন শুক্রবার (৩ জুলাই) ভোরে তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় নিয়ে আসা হয় এবং দুই দিনব্যাপী গণ-বিদায় অনুষ্ঠানের আগে মূল নামাজ মিলনায়তনে স্থাপন করা হয়।

ইন্দোনেশিয়া ও আফগানিস্তানের ধর্মীয় পণ্ডিত এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা প্রথম বিদেশি অতিথি হিসেবে শ্রদ্ধা নিবেদনকারীদের মধ্যে ছিলেন।

ইরানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিরাও শহীদ নেতাকে সম্মান জানাতে এই অনুষ্ঠানে যোগ দেন।

এর আগে বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) রাতে হাজার হাজার শহীদ পরিবারের শোক ও দুঃখের মধ্যে ইসলামী বিপ্লবের শহীদ নেতার দেহ মুবারকের বিদায় অনুষ্ঠিত হয়।

এই অনুষ্ঠানটি সেই স্থানের কাছে অনুষ্ঠিত হয় যেখানে আয়াতুল্লাহ সাইয়েদ আলী খামেনি শহীদ হয়েছিলেন। শোকপূর্ণ ও শোকাবহ এই অনুষ্ঠানে আহলে বাইত (আ.)-এর শোককারীরা ইমাম হুসাইন (আ.)-এর জন্য শোকগীতি এবং বিপ্লবের শহীদ নেতার জন্য শোকগীতি পাঠ করেন। এ সময় খামেনির কফিনটি ইমাম হুসাইন (আ.)-এর পবিত্র মাজারের পতাকা দিয়ে আচ্ছাদিত করা হয়।
অনন্ত আলোকের পথে…

এক নির্মম ও কাপুরুষোচিত মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শাহাদাতবরণ করেন ইসলামী বিপ্লবের মহান নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনি এবং তার পরিবারের চার সদস্য।

ঘটে যাওয়া সেই আকস্মিক ও বেদনাবিধুর আঘাতের পর এবার শুরু হয়েছে তার শেষ বিদায়ের ঐতিহাসিক ও দীর্ঘ আনুষ্ঠানিকতা। এই বিদায় কেবল একজন নেতার প্রস্থান নয়, এটি যেন বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর এক বিশাল শূন্যতার ক্রন্দন।

বিদেশি অতিথিরা শহীদদের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন।

এই মহাজীবনকে বিদায় জানাতে ইরান তার আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং অভূতপূর্ব গণ-স্মরণসভার আয়োজন করেছে। শোকের এই আবহকে ধারণ করে সপ্তাহব্যাপী এই স্মারক অনুষ্ঠানের মূল স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে ‘উঠে দাঁড়াতে হবে’ এবং এর প্রতীক করা হয়েছে একটি ‘মুষ্টিবদ্ধ হাত’-কে, যা নিপীড়নের বিরুদ্ধে চিরন্তন প্রতিরোধের বার্তা দেয়।

তেহরানের জানাজা আয়োজন কমিটির প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান হাসানজাদেহর মতে, মোসাল্লার কেন্দ্রীয় প্রাঙ্গণটি বিদায় অনুষ্ঠানের মূল কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে, অন্যদিকে আশপাশের এলাকাগুলোকে একাধিক কার্যক্ষম জোনে ভাগ করা হয়েছে, যাতে আগত বিশাল জনতাকে নিরাপদে জায়গা দেওয়া যায়।

তিনি জানান, এই বিদায় অনুষ্ঠানে ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি মানুষের সমাগম ঘটতে পারে, যা বিশ্ব ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। এই বিশাল জনসমুদ্রকে নিরাপদে ধারণ করার জন্য তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লাকে সাজানো হয়েছে অনন্য এক ব্যবস্থাপনায়। মোসাল্লার চারপাশে প্রায় ১১ হেক্টরজুড়ে ‘শহীদ মোদারেস হাইওয়ে চত্বর’, ‘চেহেল সারা’ এবং ১২ হেক্টরের ‘হাক্কানি পার্কিং এলাকা’-র মতো বিশাল বিশাল ‘জিয়ারত শহর’ গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে তৃষ্ণার্ত শোকাতুর মানুষের জন্য ১১০টি খাবার পানির স্টেশন, ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসা সেবা, নামাজ কক্ষ এবং মা ও শিশুদের জন্য বিশেষ জোনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

৪ জুলাই সকাল ৬টা থেকে মোসাল্লার দরজা জনসাধারণের জন্য ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকবে। ৫ জুলাই সকাল ৬টায় অনুষ্ঠিত হবে মূল জানাজার নামাজ। এরপর ৬ জুলাই তেহরানের রাস্তায় নামবে ঐতিহাসিক শোক মিছিল। কোনো একটি একক সড়ক এই জনসমুদ্র ধারণ করতে পারবে না বলে পুরো রাজধানীকে কয়েকটি বিশাল আনুষ্ঠানিক করিডোরে বিভক্ত করে একটি ‘জানাজা জোন’ তৈরি করা হয়েছে।

এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে দেশের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে সমস্ত ইরানিকে জাতীয় ঐক্য ও অবিচলতার প্রতীক হিসেবে এই জানাজায় শামিল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি ইরানিদের জেগে ওঠার এবং বিশ্বের কাছে জাতির ন্যায়বিচারের আহ্বান পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘বিশ্বের জানা উচিত যে ইরানের গৌরবময় জনগণ নিপীড়ন ও ঔদ্ধত্যের মুখে নীরব থাকবে না এবং তাদের ইমামের রক্তের ঋণ কখনো বৃথা যেতে দেবে না। এই অনুষ্ঠানের দিকে নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপ এমন এক ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি যিনি তার জীবনকে জনগণের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন। এই ট্র্যাজেডিতে ঝরে পড়া প্রতিটি অশ্রু জাতি এবং তার আন্তরিক সেবকদের মধ্যকার গভীর বন্ধনকে প্রতিফলিত করে এবং আনুগত্যের প্রতিটি ঘোষণা সাক্ষ্য দেয় যে শহীদদের রক্তে রঞ্জিত পথ অব্যাহত থাকবে।’

শোকের দিনগুলোতে তেহরান, কোম ও মাশহাদে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে এবং জনগণের যাতায়াত সহজ করতে মেট্রো ও বাস সার্ভিস ২৪ ঘণ্টা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চালু রাখা হয়েছে।

শহীদ নেতার এই মহাপ্রস্থানকে কেন্দ্র করে তেহরানে সমবেত হচ্ছে গোটা বিশ্ব। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত, রাশিয়া, চীন, পাকিস্তান, জর্জিয়া ও কিউবাসহ বিশ্বের ৪৫টিরও বেশি দেশের শীর্ষ রাষ্ট্রপ্রধান, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং ১০০টিরও বেশি দেশের ধর্মীয় পণ্ডিত ও বিজ্ঞানীরা এই বিদায় অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন। অতিথিদের মধ্যে রয়েছেন তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রাহমন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের ডেপুটি চেয়ারম্যান দিমিত্রি মেদভেদেভ, বাংলাদেশের স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদ এবং আফগানিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মোল্লা হাসান আখুন্দ।

একইসঙ্গে এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিতে মিডিয়া কভারেজের ক্ষেত্রেও এক নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। প্রায় ১৪ হাজার দেশি-বিদেশি সাংবাদিক, ফটোগ্রাফার ও ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটর এই অনুষ্ঠান কাভার করছেন, যা ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে বৃহত্তম মিডিয়া মোতায়েন।

শহীদ নেতার এই বিদায় অনুষ্ঠানের সূচনালগ্নটি (৩ জুলাই) এক গভীর আবেগ ও ঐতিহাসিক বেদনার সঙ্গে মিলে গেছে। ১৯৮৮ সালের এই ৩ জুলাই পারস্য উপসাগরের আকাশে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ভিনসেন্স নির্মমভাবে ইরানের যাত্রীবাহী বিমান ‘ফ্লাইট ৬৫৫’ ভূপাতিত করেছিল, যেখানে ৬৬টি শিশুসহ ২৯০ জন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান। দেশটির আইনি ও আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদী আবেগময় ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, ফ্লাইট ৬৫৫-এর শহীদদের স্মরণের দিনে নেতার এই শাহাদাত আসলে ইরানের প্রতি আমেরিকার চিরস্থায়ী শত্রুতা এবং তার বিপরীতে ইরানি জনগণের অবিচল প্রতিরোধের গভীরতাকেই প্রমাণ করে।

ইরানের সীমানা ছাড়িয়ে শহীদ আয়াতুল্লাহ খামেনির প্রতি ভালোবাসার ঢেউ আছড়ে পড়েছে প্রতিবেশী দেশ ইরাকেও। ইরাকি জনগণের তীব্র আকুলতা ও অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে শহীদ নেতার পবিত্র দেহ মুবারক আগামী ৮ জুলাই ইরাকে নিয়ে যাওয়া হবে। সময়ের স্বল্পতার কারণে বাগদাদে অনুষ্ঠান করা সম্ভব না হলেও পবিত্র নগরী নাজাফ এবং কারবালায় লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে জানাজা ও শোক মিছিল অনুষ্ঠিত হবে। ইরাকের আরবাঈন কমিটিকে এই বিশাল আয়োজন সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

৮ জুলাই স্থানীয় সময় সকাল ৬টায় কুফা থেকে নাজাফ পর্যন্ত এবং বিকেল ৪টায় কারবালার পবিত্র রাস্তায় শহীদ নেতার কফিন নিয়ে লাখো মানুষের শোক মিছিল বের হবে। হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) এবং তার ভাই আবু আল-ফজল আল-আব্বাস (আ.)-এর পবিত্র মাজার প্রাঙ্গণে এই মহান নেতাকে শেষ বিদায় জানানো হবে। ইরাকের ‘ফায়লি কুর্দিশ ন্যাশনাল কংগ্রেস’ এই জানাজাকে এক ‘ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব’ উল্লেখ করে বিশ্বের সমস্ত ফায়লি কুর্দিদের এতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। ১৯৫৭ সালের পর দীর্ঘ প্রায় সাত দশক পর এটিই হবে ইরাকের পবিত্র ভূমিতে আয়াতুল্লাহ খামেনির শেষ প্রত্যাবর্তন, যা ১৯৬৮ সালে স্বৈরাচারী পাহলভি আমলের সাভাক বাহিনী ষড়যন্ত্র করে আটকে দিয়েছিল।

ইরাকের পবিত্র মাজারগুলোর আনুষ্ঠানিকতা শেষে শহীদ নেতার মহাজাগতিক সফরের সমাপ্তি ঘটবে আগামী ৯ জুলাই ইরানের পবিত্র নগরী মাশহাদে। মাশহাদের মেয়র মোহাম্মদ রেজা কালান্দার শরিফ জানিয়েছেন, সাইয়্যেদ আশ-শোহাদা হাইওয়ে বরাবর প্রায় ২০০ হেক্টর জমি প্রস্তুত করা হচ্ছে বিদায়ী জনতার ঢল সামলানোর জন্য।

সেখানে লাখ কোটি ভক্তের অশ্রু আর দোয়ার মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে আহলে বাইতের অষ্টম ইমাম, ইমাম রেজা (আ.)-এর পবিত্র মাজারের ভেতরে সমাহিত করা হবে এই মহান নেতা এবং তার শহীদ পরিবারের সদস্যদের। দাফনস্থলটি এমনভাবে নির্বাচন করা হয়েছে যাতে পবিত্র মাজারের স্বাভাবিক কার্যক্রমে কোনো বিঘ্ন না ঘটিয়ে আগামী বছরগুলোতে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে আসা নারী ও পুরুষ ভক্তরা অত্যন্ত সহজে এই মহান নেতার কবর জিয়ারত করতে পারেন।

অশ্রু, রক্ত আর প্রতিরোধের এক অনন্য মহাকাব্য লিখে বিদায় নিচ্ছেন আয়াতুল্লাহ খামেনি। তবে তার রেখে যাওয়া আদর্শ এবং ইসলামী বিপ্লবের বর্তমান নেতা সাইয়্যেদ মোজতবা খামেনির দিকনির্দেশনায় এই পথচলা যে থামবে না আজ সেই সাক্ষ্যই দিচ্ছে কোটি জনতার বজ্রমুষ্টি ।