Last Updated on 38 seconds by zajira news
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, জাজিরা নিউজ: নেপালের তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬১৬ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছে কয়েশ’ মানুষ।
শনিবার (২৯ অগাস্ট) পুলিশের বরাত দিয়ে কাঠমান্ডু পোস্ট লিখেছে, এদিন সকাল ৬টা পর্যন্ত চিতওয়ানে ২৩৩টি, পূর্ব নওয়ালপরাসিতে ১৫৮টি, গোর্খায় ৪৮টি, পশ্চিম নওয়ালপরাসিতে ৪৭টি, ধাদিংয়ে ৪৫টি, নুয়াকোটে ৪১টি, তানাহুনে ৩১টি এবং রসুয়ায় ১৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। নিখোঁজদের উদ্ধার এবং বন্যায় আটকে পড়াদের সহায়তায় পুলিশ স্থানীয় বাসিন্দা ও অন্য সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
একই সঙ্গে বন্যার আবর্জনা ও ভূমিধসে বন্ধ হয়ে যাওয়া সড়ক পরিষ্কার করে যোগাযোগ পুনঃস্থাপন এবং ত্রাণ কার্যক্রম সহজ করার চেষ্টা চলছে।
বুধবার সকালে নেপাল-চীন সীমান্তের কাছাকাছি রাসুয়া জেলার তিমুরে ও স্যাফ্রুবেশি এলাকায় ভোতেকোশি নদীতে আকস্মিক ও শক্তিশালী বন্যা দেখা দেয়।
পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নেমে এসে নদীর তীরবর্তী জনপদ তছনছ করে দেয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় সড়ক, সেতু, ভবনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো। পরে সেই পানির স্রোত ত্রিশূলী নদীতে গিয়ে পড়ে।
বন্যার প্রবল স্রোতে মানুষ, যানবাহন ও স্থাপনা ভেসে যায়। নদীর স্রোতে মরদেহ ও মানবদেহের বিভিন্ন অংশ মূল বন্যাকবলিত এলাকা থেকে বহু দূরে ভাটির বিভিন্ন জেলায় পৌঁছায়।
কাঠমান্ডু পোস্ট লিখেছে, কয়েকটি এলাকার বাসিন্দা ও যাত্রীরা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। উদ্ধারকারী দল আরও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পৌঁছানো চেষ্টা করছে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে রয়টার্স লিখেছে, নেপালের যেসব বিশেষায়িত ও কারিগরি ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা নেই, সেসব ক্ষেত্রে বিদেশি সহায়তা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজে বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই, রয়টার্সকে বলেছেন তিনি।
কাঠমান্ডু পোস্টের বরাত দিয়ে রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ তাদের অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলকে সহায়তার অনুমতি দিতে নেপাল সরকারের কাছে অনুরোধ করেছে।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বলেন, টানেলে আটকে পড়াদের উদ্ধার, সেতু ধ্বংস হয়ে যাওয়া এলাকায় সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা পুনরায় চালু করা, মরদেহ শনাক্তকরণ, ডিএনএ পরীক্ষা এবং দীর্ঘ সময় মরদেহ সংরক্ষণের মতো ক্ষেত্রে নেপালের বিদেশি সহায়তা প্রয়োজন।
শুক্রবার রাতে তিনি বলেন, “যেসব বিশেষায়িত সেবা ও কারিগরি সহায়তার ক্ষেত্রে আমাদের পর্যাপ্ত দক্ষতা ও কারিগরি জ্ঞান নেই, সেসব বিষয়ে আমরা ইতোমধ্যে সহায়তার অনুরোধ জানিয়েছি।”
রয়টার্স লিখেছে, দুর্যোগকবলিত এলাকায় দ্রুত যোগাযোগ ও যাতায়াতব্যবস্থা চালু করতে নেপাল তার দুই বড় প্রতিবেশী ভারত ও চীনের কাছে বেইলি সেতু চেয়েছে। বন্যায় দেশটির প্রায় দুই ডজন সেতু ধ্বংস হয়েছে।
হিমবাহ ধসে যেভাবে নেপাল-তিব্বতে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হলো, যা বলছেন বিজ্ঞানীরা-
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যার কারণ হিসেবে প্রাথমিক তদন্তে একটি হিমবাহ ধসে পড়াকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে করে হিমালয়ের বরফ দ্রুত গলে যাওয়ার বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে বলে বিবিসিকে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
ভূমিকম্পের প্রাথমিক খবর পাওয়ার পর অনেকেই ধারণা করেছিলেন, ভূকম্পনের কারণেই ভূমিধস হয়েছিল এবং সেই ভূমিধস থেকেই বন্যার সৃষ্টি হয়।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা- ইউএসজিএস পরে জানায়, ‘হিমবাহ ধসে পড়া’র কারণে এই দুর্যোগ ঘটে, যেখানে কোনো হিমবাহ বা হিমবাহের একটি অংশ ভেঙে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
ইউএসজিএস’র তথ্য এবং ঘটনাটি বিশ্লেষণ করা বিজ্ঞানীদের মতে, ধসে পড়া হিমবাহ উপত্যকার তলদেশে আঘাত হানার সময় এতটাই শক্তিশালী অভিঘাত তৈরি হয়েছিল যে, সেটি পাঁচ দশমিক দুই মাত্রার কম্পন হিসেবে রেকর্ড হয়।
ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহ বিশেষজ্ঞ ড. সাইমন কুক বিবিসিকে বলেন, তার দলের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, নেপালে লাংটাং লিরুং শৃঙ্গের কাছে একটি হিমবাহের নিচের অংশ ধসে পড়েছে। ওই স্থানটি বন্যাকবলিত এলাকা থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার (৯ মাইল) পশ্চিমে। তার ধারণা, হিমবাহটি উত্তর-পশ্চিম দিকে ধসে পড়ে, আর তারপর পানির স্রোতের সঙ্গে নিচে পশ্চিমের দিকে নেমে আসে।
আন্তঃসরকারি বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট – আইসিআইএমওডি’র এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ‘অনেক উপরের কোনো এলাকা থেকে বরফ-পাথরের ধস’ নেমে থাকতে পারে।
এর ফলে বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথরের ধ্বংসাবশেষ ভোটেকোশী নদীর একটি শাখা নদী লেন্দে খোলায় গিয়ে পড়ে। নদীতে হঠাৎ পানির প্রবল স্রোত তৈরি হয়, যা পানি, পলি এবং বড় বড় পাথর ভাটির দিকে বয়ে নিয়ে যায়। কেন্দ্রটির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে ভাটির দিকের নদীগুলোতে পানির উচ্চতা সাত থেকে নয় মিটার বেড়ে যায়। পানির তোড়ে বেশ কয়েকটি পানি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র ভেসে যায় বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ সায়েন্সেসের অধ্যাপক মাইক সার্ল বলেন, ভূমিধস থেকে বন্যা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি ঘটতে কয়েক ঘণ্টা, এমনকি কয়েক দিনও লেগে থাকতে পারে। “ধ্বংসাবশেষের বিপুল ঢেউ দেখে মনে হচ্ছে, প্রথমে হয়তো ভূমিধস হয়েছিল। এরপর পানি জমে নদীর প্রবাহ আটকে যায় এবং শেষ পর্যন্ত সেটি বাঁধ ভেঙে এক বিশাল বন্যার আকারে নেমে আসে”, বিবিসিকে বলেন তিনি।
এলাকার ভূপ্রকৃতিও বন্যার ভয়াবহতা আরও বাড়িয়ে থাকতে পারে। সার্ল জানান, লাংটাং লিরুং উচ্চ হিমালয়ের চূড়ায় অবস্থিত এবং পর্বতটির দুই পাশে রয়েছে “অত্যন্ত খাড়া উপত্যকা”। এসব উপত্যকা পানিকে আরও বেশি গতিতে নিচের দিকে প্রবাহিত করে থাকতে পারে।
কিন্তু হিমবাহটি কেন ধসে পড়েছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়। সার্ল বলেন, হিমালয়ের অন্যান্য এলাকার মতো লাংটাং লিরুংও দীর্ঘমেয়াদি টেকটোনিক গতিবিধির কারণে ধীরে ধীরে ওপরে উঠছে। এ প্রক্রিয়ায় একটি ভূত্বকীয় প্লেট আরেকটি প্লেটকে ওপরে ঠেলে দেয়।
“এটা অনেকটা গাড়ির নিচে জ্যাক বসিয়ে সেটি ওপরে তোলার মতো”, বলেন তিনি।
“পর্বতটি যত ওপরে উঠছে, হিমবাহও তত খাড়া হয়ে উঠছে। ফলে এর কিছু অংশ খসে পড়া অনিবার্য।” এসব ক্ষেত্রে সাধারণত তুলনামূলক ছোট ছোট বরফের খণ্ড খসে পড়ে, যা সাময়িকভাবে নদীর প্রবাহ আটকে দেয় এবং পরে সহজেই পানির স্রোতে ভেসে যায় বলে জানান তিনি।
কিন্তু এবারের দুর্যোগে মনে হচ্ছে, পুরো হিমবাহটি ‘একসঙ্গে’ ধসে পড়েছে, যা সার্লের ভাষায় “খুবই অস্বাভাবিক”। তিনি বলেন, “এ ধরনের বন্যা সব সময়ই হয়, কিন্তু এত বড় মাত্রায় নয়।” সার্ল বলেন, বুধবারের ঘটনাটি সম্ভবত দুটি ভিন্ন প্রক্রিয়ার কারণে ঘটেছে।
“একদিকে হিমালয়ের ভূত্বকীয় গতিবিধির কারণে পর্বতশ্রেণির ওপরে উঠে যাওয়া, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা এবং হিমবাহ গলে যাওয়া।” “এই সবকিছু মিলেই এমন ভয়াবহ দুর্যোগ তৈরি করছে, যা আমরা এখন নিয়মিতই দেখতে পাচ্ছি।”
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ে বরফ ও পারমাফ্রস্ট – অর্থাৎ শত শত বছর ধরে জমাট হয়ে থাকা মাটি গলে যাওয়ার বিষয়ে বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরেই সতর্ক করে আসছেন।
চলতি বছরের শুরুতে আইসিআইএমওডি প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০০০ সালের তুলনায় বর্তমানে হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহগুলো দ্বিগুণ হারে বরফ হারাচ্ছে। এর ফলে বন্যার মতো বিভিন্ন ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
ড. কুক উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত, সুইজারল্যান্ড ও ইতালিতেও হিমবাহ ধসে বন্যা ও ভূমিধসের একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে।
২০২১ সালে উত্তর ভারতের চামোলি উপত্যকায় হিমালয়ের একটি হিমবাহের বড় একটি অংশ ধসে পড়ে। এতে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ ও পানি ভাটির দিকে নেমে আসে এবং ২০০ জনের মৃত্যু হয়।
পরে বিজ্ঞানীরা হিসেব করে জানান, ওই ধসের অভিঘাত ছিল ১৫টি পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণের সমতুল্য। এমনকি নেপালেও একই অঞ্চলে গত বছর তিব্বতে একটি হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের বাঁধ ভেঙে বন্যা হয়েছিল।
আইসিআইএমওডির বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফারুক আজম বলেন, ক্রায়োস্ফিয়ারে – অর্থাৎ পৃথিবীর হিমায়িত অংশগুলোতে বিপদের ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে এবং “আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন তা আরও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে। পরিবর্তনের গতি এতটাই দ্রুত।”
কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘটনা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘটেছে কি না, তা বলা কঠিন। তবে “এসব ঘটনার ধরন যখন আপনি দেখবেন, তখন মনে হবে এতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থাকতে পারে,” বলেন ড. কুক।
“যুক্তিটা হলো, পৃথিবী উষ্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হিমবাহের আকার ছোট হবে, বিপুল পরিমাণ তুষার গলবে। কিছু পর্বতের ঢালকে আংশিকভাবে ধরে রাখা পারমাফ্রস্ট উষ্ণ হয়ে গলতে এবং ক্ষয় হতে শুরু করছে।”
“ফলে আরও বেশি ভূমিধস, ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ, হিমবাহের গলিত পানি, হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের পানি উপচে পড়া এবং হিমবাহ ধসে পড়ার ঘটনা ঘটবে। কারণ শেষ পর্যন্ত জলবায়ুর উষ্ণতা উচ্চ পার্বত্য এলাকাগুলোর পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে তোলে।”


