Last Updated on 15 hours by zajira news
অনলাইন ডেস্ক, জাজিরা নিউজ: নগদ লেনদেন থেকে যতটা সম্ভব বেরিয়ে আসতে চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। এই উদ্যোগকে বলা হচ্ছে ‘ক্যাশলেস ইকোনমি’র পথে যাত্রা।
১ জুলাই ২০২৬ থেকে সর্বত্র আবশ্যিকভাবে বাংলা কিউআর চালুর মাধ্যমে ব্যাংক, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এবং ফিনটেক প্রতিষ্ঠানের দ্রুত সম্প্রসারণ তথা নগদবিহীন একটি লেনদেন অভ্যাস গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
আর্থিক খাত সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, নিরাপদ, সহজ ও সবার জন্য ব্যবহারবান্ধব ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাংলা কিউআর হতে পারে দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির নতুন ভিত্তি।
বাংলা কিউআর চালুর বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান গনমাধ্যমকে বলেন, দেশে ডিজিটাল লেনদেন আরও সহজ, নিরাপদ ও সর্বজনীন করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘বাংলা কিউআর’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটা কোনো নতুন মোবাইল অ্যাপ, প্ল্যাটফর্ম বা এমএফএস নয়; বরং একটি অভিন্ন কিউআর, যার মাধ্যমে যেকোনো ব্যাংক বা এমএফএসের গ্রাহক একই কিউআর স্ক্যান করে অর্থ পরিশোধ করতে পারবেন।
বিষয়টি আরও পরিষ্কার করে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, এতদিন কোনো একটি শোরুম বা রেস্টুরেন্টে কেনাকাটা বা খাবারের বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে নগদ বা বিকাশের আলাদা আলাদা কিউআর ব্যবহার করে পেমেন্ট করতে হতো গ্রাহকদের। ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি শোরুমে একাধিক এমএফএস সেবার কিউআর না থাকলে তার জন্য বিল পরিশোধ কঠিন হতো।
ফলে বাধ্য হয়ে অন্য দোকান থেকে ক্যাশআউট করে এনে খাবারের বিল পরিশোধ করতে হতো। বাংলা কিউআর চালুর ফলে এই সীমাবদ্ধতা দূর হবে। এখন একটি মাত্র কিউআর ব্যবহার করেই গ্রাহক একাধিক ব্যাংকের মোবাইল অ্যাপ বা এমএফএস অ্যাপ থেকে সহজেই বিল পরিশোধ করতে পারবেন।
এ ব্যবস্থায় গ্রাহক বা বিক্রেতাকে নতুন করে কোনো অ্যাপ বা সফটওয়্যার ইনস্টল করার প্রয়োজন হবে না। শুধু বিদ্যমান কিউআরের পরিবর্তে বাংলা কিউআর ব্যবহারের ব্যবস্থা করে দেবে সংশ্লিষ্ট এমএফএস সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান। লেনদেন করা অর্থ আগের মতোই সংশ্লিষ্ট বিক্রেতার ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাকাউন্টে জমা হবে।
আরিফ হোসেন খান বলেন, বাংলা কিউআরের প্রধান লক্ষ্য হলো ক্ষুদ্র লেনদেনকে ক্যাশলেস পদ্ধতির মধ্যে আনা। রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, সবজি বিক্রেতা কিংবা স্থানীয় বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোও এই ব্যবস্থার মাধ্যমে নগদ টাকা ছাড়াই লেনদেন করতে পারবেন। এতে ছেঁড়া নোট, খুচরা টাকার সংকট কিংবা নগদ অর্থ বহনের ঝুঁকি কমে আসবে।
বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের হিসাব-নিকাশ সহজ হবে, নগদ অর্থ বহনের ঝুঁকি কমবে এবং পুরো পেমেন্ট ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে। তাছাড়া অনানুষ্ঠানিক বা ইনফরমাল খাতের ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক খাতে চলে আসবে। এতে দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।
বিকাশ’র হেড অব করপোরেট কমিউনিকেশন্স শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম বাংলানিউজকে বলেন, দেশের সব মার্চেন্ট পয়েন্ট অভিন্ন বাংলা কিউ আর রুপান্তরের ফলে ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেম আরো বিস্তৃত ও সমৃদ্ধ হবে। ফলে ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকরা দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মার্চেন্ট পয়েন্টগুলোতে কিউআর স্ক্যান করে দ্রুত ও ঝামেলাহীনভাবেই ক্যাশবিহীন লেনদেন করতে পারবেন। পাশাপাশি গ্রাহকরা ভাংতি ও ক্যাশ বহনের ঝুঁকি এড়াতে পারবেন, মার্চেন্টদের পেমেন্ট গ্রহণ ও তাদের আর্থিক ব্যবস্থাপনাও আরও সহজ ও কার্যকরী হবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্যাশলেস লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের যাত্রাপথে সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ের মধ্যেই দেশের সব মার্চেন্ট পয়েন্টে বাংলা কিউআর প্রচলন করতে বিকাশ বদ্ধপরিকর। এ লক্ষ্যে কিউআর প্রতিস্থাপনের কাজ পুরোদমে চলছে। ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেম কে আরও সমৃদ্ধ এবং জনপ্রিয় করতে বিকাশ শুরু থেকেই কিউআর পেমেন্ট নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। অতীতের ধারাবাহিকতায়, ভবিষ্যতেও ক্যাশলেস সমাজ গড়ার সরকারি উদ্যোগে সক্রিয় অংশীদার হিসেবে কাজ করবে বিকাশ। অবশ্য বিশ্বব্যাপী ক্যাশলেস অর্থনীতির ধারণা নতুন নয়।
জানা গেছে, ১৯৬০ ও ১৯৭০ সালের দশকে ব্যাংক খাতে কম্পিউটারের ব্যবহার শুরু হলেও তা ছিল খুবই সীমিত। ’৯০ এরপর এর ব্যবহার বাড়তে থাকে। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়তে থাকায়, এটিএম বুথ, টেলিফোন ব্যাংকিং, অনলাইন ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ব্যাংকিং এবং স্মার্টফোনভিত্তিক মোবাইল অ্যাপের বিস্তারের ফলে ডিজিটাল ব্যাংকিং বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ব্লকচেইন ও ফিনটেক প্রযুক্তি ব্যাংক খাতে নতুন বিপ্লবের সূচনা করেছে।
মধ্যযুগে ইউরোপে ‘বিল অব এক্সচেঞ্জ’ ব্যবহারের মাধ্যমে নগদবিহীন লেনদেনের সূচনা হয়। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মধ্যে সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক ও ফিনল্যান্ডে প্রায় শতভাগ লেনদেন এখন ডিজিটাল মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। যুক্তরাজ্যে নগদ লেনদেন ১০ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে। চীনে দৈনিক প্রায় ৮০ শতাংশ এবং ভারতে ইউনিফাইড পেমেন্টস ইন্টারফেসের (ইউপিআই) মাধ্যমে অধিকাংশ ডিজিটাল লেনদেন সম্পন্ন হচ্ছে।
বাংলাদেশও একই পথে এগোচ্ছে। বর্তমানে দেশে মোট লেনদেনের প্রায় ৪৭ থেকে ৫৬ শতাংশই ডিজিটাল মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। মোবাইল ব্যাংকিং, ই-ওয়ালেট, কার্ড পেমেন্ট এবং অনলাইন ব্যাংকিংয়ের ব্যবহার ক্রমাগতভাবে বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিলে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে ৩১ কোটি ৭৮ লাখ ১১ হাজার ৮০২ বারে মোট ৪৯ লাখ ৫৩৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ক্রেডিট কার্ডের বিল পরিশোধ করা হয়েছে ৮৫২ কোটি ৬৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এ ছাড়া বিদ্যুৎসহ অন্যান্য ইউটিলিটি বিল পরিশোধ করা হয়েছে তিন হাজার ৪৫১ কোটি ৬৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) ব্যবহার করে গ্রাহকরা টকটাইম কিনেছে ১ হাজার ২৮১ কোটি ৫৬ লাখ ৬০ হাজার টাকার। এছাড়া একই সময়ে ৪ হাজার ৮৫ কোটি ৮৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা বেতন-ভাতা মোবাইলে পরিশোধ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলা কিউআর চালু হওয়ার পর এই সংখ্যা বহুগুণে বাড়বে।
সরকারের অর্থমন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তারা আশা করছেন, এই বাংলা কিউআর ব্যাপকভাবে চালু হলে সামগ্রিকভাবে লেনদেনে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে। কর ফাঁকি ও অবৈধ অর্থপ্রবাহ কমে আসবে এবং রাজস্ব আদায় বাড়বে।
তাছাড়া নগদ টাকা ছাপতে প্রতিবছর কেন্দ্রীয় ব্যাংককে যে পরিমাণ ব্যয় করতে হয় তাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
জানা গেছে, নগদ টাকার লেনদেন বন্ধ হলে সরকারের অনেক টাকা সাশ্রয় হতে পারে। কারণ কাগুজে নোট ছাপতে বছরে সরকারের ২০ হাজার কোটি টাকা বা তারও বেশি খরচ হয়। বিশেষ করে ছোট মূল্যমান অর্থাৎ ৫, ১০ ও ২০ টাকা মূল্যমানের অনেক বেশি নোট বাজারে ছাড়তে হয়। এটা ছাপতেও যে খরচ বড় অঙ্কের অর্থও ছাপতে প্রায় একই খরচ। ফলে বাংলা কিউআর চালু হলে কাগুজে নোটের চাহিদা বহুলাংশে কমে আসবে।
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এ ক্ষেত্রে বড় সংকট হলো অনেকের একের বেশি অ্যাকাউন্ট থাকলেও এখনো ৮০ শতাংশ মানুষের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই। বাংলা কিউআর চালু হলে এই পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
দেশে অভিন্ন এই পেমেন্ট কিউআর চালুর জন্য গত ১ এপ্রিল একটি সার্কুলার জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী ১ জুলাই থেকে সকল মার্চেন্ট পয়েন্টে বাংলা কিউআর চালু থাকবে।
এই নির্দেশনা না মানলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা গুনতে হবে। পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (পিএসপি) ও পেমেন্ট সার্ভিস অপারেটরদের (পিএসও) জন্যও এই একই নিয়ম কার্যকর হবে।
২০২১ সালে দেশে প্রথমবারের মতো ‘বাংলা কিউআর’ চালুর নির্দেশনা জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০২৩ সালে এই সেবাকে ইন্টারঅপারেবল সিস্টেমে নিয়ে আসা হয়। বর্তমানে বেশিরভাগ ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এই কিউআর সিস্টেমের মধ্যে রয়েছে। ফলে একটি কিউআর কোড স্ক্যান করেই যেকোনো ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকরা কেনাকাটা বা সেবার বিল পরিশোধ করতে পারবেন।
২০২৭ সালের মধ্যে মোট লেনদেনের ৭৫ শতাংশ ক্যাশলেস বা নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার।
‘বেটার দ্যান ক্যাশ অ্যালায়েন্স’ ও সরকারের এটুআই কর্মসূচির ২০২২ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে জিডিপি বছরে প্রায় ১ দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
তবে এখনো কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে দ্রুতগতির ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের সীমিত ব্যবহার, ডিজিটাল আর্থিক সাক্ষরতার ঘাটতি, ওটিপি জালিয়াতি, ফিশিং ও সাইবার প্রতারণার আশঙ্কা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত কমিশন ব্যয় ডিজিটাল লেনদেন সম্প্রসারণের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়ন, শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ব্যাংক ও এমএফএসের মধ্যে পূর্ণ ইন্টারঅপারেবিলিটি নিশ্চিত করা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য প্রণোদনা এবং স্কুল-কলেজ পর্যায়ে ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি চালু করা জরুরি।

