Last Updated on 55 seconds by zajira news
অনলাইন ডেস্ক, জাজিরা নিউজ: দেশের সাত জেলায় গতকাল রোববার (২৬ এপ্রিল) বজ্রপাতে ১৪ জনের মৃত্যু হয়। চলতি বছর এক দিনে এই দুর্যোগে এটাই সর্বাধিক প্রাণহানি।
দীর্ঘদিনের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে বজ্রপাত এখন ঋতুভিত্তিক পুনরাবৃত্ত দুর্যোগ। আর এর সবচেয়ে বড় শিকার মাঠে থাকা কৃষক, জেলে ও খোলা জায়গায় কাজ করা মানুষ।
এভাবে বজ্রপাতে প্রতিবছর কয়েক শ মানুষের মৃত্যু হলেও তা কমাতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। বজ্রপাত কমাতে তালগাছ লাগানো, আশ্রয়কেন্দ্র করার মতো প্রকল্প হয়েছে। আগাম সতর্কসংকেত দেওয়ার কাজও করেছে কিছু প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বাস্তবে সেগুলো কাজে আসছে না।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা গনমাধ্যমকে বলেন, ‘বজ্রপাতে যাঁরা মারা যাচ্ছেন, তাঁরা খু্ব দরিদ্র মানুষ। তাঁদের নিয়ে তাই আমাদের মাথাব্যথা কম। যখন এক দিনে বেশি মানুষ মারা যান, তখন গণমাধ্যমের টনক নড়ে, সরকারের নানা দপ্তর সজাগ হয়। কিন্তু এ মৃত্যু রুখতে আগাম ও সুদূরপ্রসারী তৎপরতা নেই।’
বাংলাদেশে বজ্রপাতের মাসভিত্তিক প্রবণতা বিশ্লেষণে দেখা যায়, জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারিতে সংখ্যা কম থাকলেও মার্চ থেকে তা বাড়তে শুরু করে। এপ্রিলে তা তীব্র হয়, আর মে মাসে পৌঁছায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে। এরপর জুন–জুলাইয়ে কমতে শুরু করে। সেপ্টেম্বরে আবার কিছুটা বাড়ে।
আন্তর্জাতিক আবহাওয়া প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান আর্থ নেটওয়ার্কসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট পালস কাউন্ট বা বজ্রঝলক মে মাসে হয় সর্বোচ্চ। মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়টিই এর জন্য সবচেয়ে সক্রিয় মৌসুম। এ প্রবণতার সঙ্গে মিলে যায় প্রাণহানির তথ্যও। গত ১৫ বছরের বড় বড় মৃত্যুর ঘটনাগুলোর বেশির ভাগই এপ্রিল, মে বা জুনে ঘটেছে।
বাংলাদেশে বজ্রপাতে নিহত–আহত ব্যক্তিদের সংখ্যা নিয়মিত নথিভুক্ত করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ডিজাস্টার ফোরাম (বিএফডিএফ)। প্রতিষ্ঠানটির তথ্যে এক দিনে বজ্রপাতে বড় প্রাণহানির কয়েকটি ঘটনা পাওয়া গেছে। তাতে দেখা যায়, এক দিনে সর্বোচ্চসংখ্যক মৃত্যুর ঘটনাটি ঘটেছে ২০১১ সালের ২৩ মে, ৫৮ জন। ২০১৬ সালের ১২ ও ১৩ মে দুই দিনে ৮৭ জন নিহত হয়েছিলেন। দুই দিনে ৩৩ জন নিহত হন ২০১৪ সালের ১৩ ও ১৪ আগস্ট।
এ ছাড়া ২০২১ সালের ৬ জুন ৩৭ জন, ২০১৩ সালের ৬ মে ৩৩ জন, ২০২৪ সালের ৪ জুন ২৯ জন, ২০১৮ সালের ১০ মে ২৯ জন, ২০২২ সালের ১৭ জুন ২৪ জন, ২০২৩ সালের ২৩ মে ২৩ জন, ২০২৫ সালের ২৮ এপ্রিল ২২ জন, ২০১২ সালের ৬ এপ্রিল ২০ জন, ২০১৫ সালের ২ মে ১৯ জন, ২০১৭ সালের ৯ মে ১৬ জন, ২০১৯ সালের ৭ জুলাই ১৫ জন, ২০২৪ সালের ৬ মে ১৫ জন, ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল ১৪ জন নিহত হন বজ্রপাতে।
এই তালিকা বলছে, বজ্রপাতের বড় ট্র্যাজেডি ঘুরেফিরে বছরের একই সময়ে হচ্ছে।
ভৌগোলিক তথ্য বলছে, বজ্রপাত দেশের সব এলাকায় হলেও সবচেয়ে বেশি ঘনত্ব উত্তর-পূর্বাঞ্চলে, বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলে। এ ছাড়া দেশের উত্তরাঞ্চলেও বজ্রপাতের সংখ্যা অন্য সব অঞ্চলের তুলনায় বেশি।
এর পেছনে আবহাওয়া ও জলবায়ুর সম্পর্ক আছে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক। তিনি বাংলাদেশের বজ্রপাতের ধরন নিয়ে গবেষণা করেছেন।
আবুল কালাম মল্লিক গনমাধ্যমকে বলেন, পানি বা জলাশয়ের নিকটবর্তী এলাকায় বজ্রপাতের ঘটনা বেশি ঘটে। এর মধ্যে আছে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকা এবং উত্তরাঞ্চল বিশেষত রংপুর অঞ্চল।
মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, বঙ্গোপসাগরে বাষ্পীভবনের ফলে যে মেঘ সৃষ্টি হয়, তা সিলেট অঞ্চলে জলাশয় থেকে বাষ্পীভবনের ফলে সৃষ্ট মেঘের সঙ্গে মিলে বজ্রমেঘ তৈরি করে, যা বজ্রপাতের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।
ভাইসালা এক্সওয়েদারের তথ্য বিশ্লেষণ করে আবুল কালাম মল্লিক জানান, সিলেটে বছরে ৮০-৯৬টি বিদ্যুৎ–ঝলক হয় প্রতি বর্গকিলোমিটারে। সেখানে যশোরে বছরে হয় ১২-৩২টি।
অর্থাৎ দেশের এক অঞ্চলের সঙ্গে আরেক অঞ্চলের পার্থক্য কয়েক গুণ। সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা ও আশপাশের হাওর-সংলগ্ন এলাকায় ঝুঁকি অনেক বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেঘালয় পাহাড়ঘেরা ভৌগোলিক অবস্থান, আর্দ্র বায়ুপ্রবাহ, উষ্ণতা এবং বিস্তীর্ণ জলাভূমি—সব মিলিয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চল বজ্রপাতের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।
গত বছরের পেশাভিত্তিক মৃত্যুর তথ্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। ২০২৫ সালে বজ্রপাতে যে ২৬৩ জন নিহত হন, তার মধ্যে ১১০ জনই কৃষক। এ ছাড়া শিক্ষার্থী ৩৮ জন, গৃহিণী ২৫ জন, দিনমজুর ২২ জন, জেলে ১৮ জন।
অর্থাৎ মোট মৃত্যুর প্রায় প্রতি দুজনের একজনই কৃষি–সম্পর্কিত কাজে যুক্ত ব্যক্তি। আলাদা বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, বিভিন্ন পেশার মধ্যে কৃষকের মৃত্যুহারই সবচেয়ে বেশি।
এর কারণও অজানা নয়। বজ্রপাতের সময় কৃষকেরা থাকেন খোলা মাঠে। ধান কাটা, ফসল দেখা, সেচ দেওয়া, গরুর ঘাস কাটা, গবাদিপশু আনা—এসব কাজের সময় তাঁদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সুযোগ কম থাকে।
আবহাওয়াবিদেরা বজ্রঝলক বা বিদ্যুৎ চমকানোর বৃদ্ধির কথা বলছেন। এর সংখ্যা যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি ফসলের মাঠে বা দেশের অন্যত্র গাছের সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে কমে গেছে। বিশেষ করে হাওর অঞ্চলে।
বজ্রপাতে মারা যাওয়া বা আহত ব্যক্তিদের পেশা বলে দিচ্ছে, তারাই বেশি মারা যাচ্ছেন, যাঁদের জীবন ও আয় নির্ভর করে বাইরে থাকা ও চলাফেরার ওপর।
অনেক কৃষক ঝড় দেখেও মাঠ ছাড়েন না। কেউ ভাবেন, কাজ শেষ করেই ফিরবেন। কেউ গরু আনতে যান। কেউ সেচযন্ত্র খুলতে যান। সেই কয়েক মিনিটই হয়ে ওঠে প্রাণঘাতী।
দেশে ফেব্রুয়ারি বা মার্চ থেকে বজ্রপাতের প্রবণতা বাড়ে, এপ্রিল ও মে মাসে এটি অনেক বেশি মাত্রায় হয়। কিন্তু যখন বজ্রপাত বেশি হয়, বিভিন্ন প্রচার বা তৎপরতা তখনই শুরু হয়। যে সময়টায় বজ্রপাত কম হয়, অর্থাৎ নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত এ নিয়ে তেমন কোনো প্রচার নেই।
বজ্রপাতের নিরাপদ সময়েও তৎপরতা এবং প্রচার বাড়ানোর তাগিদ দিচ্ছেন গওহার নঈম ওয়ারা। তিনি বলেন, প্রতিবছর মৃত্যুর খবর এলেও মৃত্যুগুলো কেন, কীভাবে ঘটে, তা জানার কোনো চেষ্টা হয় না। যেখানে যেখানে মারা যায়, কেন মারা যায়, তা বিশ্লেষণ করে দীর্ঘ মেয়াদে কোনো পরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ দেখা যায় না।
বজ্রপাতে মৃত্যু ঠেকাতে জনসচেতনতামূলক প্রচারের ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদকে সক্রিয় করার পরামর্শ দেন গওহার নঈম ওয়ারা। তিনি বলেন, তবে শুধু দায়িত্ব দিলেই হবে না, কাজটি তারা কেমন করে করবে, সে জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে।
দেশের বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় ব্যাপক হারে গাছ রোপণের কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। আর নিয়ম করে বড় গাছ কাটা বন্ধ করতে হবে বলে পরামর্শ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক রাখহরি সরকার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, উঁচু গাছ বজ্র দ্রুত আকর্ষণ করবে, এটাই স্বাভাবিক। গাছ একটি জীবন্ত সত্তা। সেখানে বজ্রের আঘাত আগে আসার কথা। কিন্তু হাওর ও বজ্রপাতপ্রবণ অঞ্চলে এসব গাছ এখন অনেক কমে গেছে। মানুষের প্রাণহানি রোধে এসব এলাকায় গাছ লাগাতে হবে।
তথ্য বলছে, এপ্রিল–মে এলেই আকাশে বজ্রপাত বাড়ে, মাঠে ঝুঁকি বাড়ে, আর সবচেয়ে বেশি প্রাণ যায় কৃষকের। তাই বজ্রপাতকে শুধু প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি এখন কৃষি, জলবায়ু, আঞ্চলিক বৈষম্য এবং জননিরাপত্তার বড় সংকট। এখনই ব্যবস্থা না নিলে আগামী বছরও হয়তো ফিরে আসবে একই খবর। সূত্র, প্রথম আলো


