Last Updated on 2 hours by zajira news
অনলাইন ডেস্ক, জাজিরা নিউজ: পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের চূড়ান্ত ধাপে যাত্রা শুরু করছে বাংলাদেশ। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিতে পারমাণবিক জ্বালানি বা ইউরেনিয়ামের ব্যবহার শুরু হচ্ছে আজ । এর মধ্য দিয়ে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশের তালিকায় বিশ্বের ৩৩তম দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ।
চুল্লিপাত্রে ইউরেনিয়াম জ্বালানি বসানো হলে তা থেকে তাপ তৈরি হবে। সেই তাপে পানি থেকে বাষ্প তৈরি হয়ে টারবাইন ঘুরবে আর সেখান থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে।
আজ মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) পাবনার রূপপুরে নির্মিত এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের চুল্লিপাত্রে জ্বালানি প্রবেশ করানো শুরু হচ্ছে ।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বলছে, বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর আগে এটি চূড়ান্ত ধাপ। ধাপে ধাপে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে। আগামী আগস্টে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে।
জ্বালানি প্রবেশ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, রুশ পরমাণু শক্তি করপোরেশনের (রোসাটম) মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ। অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হবেন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি।
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পরমাণু শক্তি কমিশন। এ প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিট নির্মাণ করছে রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানির চেয়ে কম খরচে দীর্ঘ মেয়াদে বিদ্যুৎ দেবে রূপপুর। দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার ১০ থেকে ১২ শতাংশ পূরণ করবে। এর অর্থনৈতিক মূল্য অনেক বেশি। দক্ষ জনবল তৈরি হয়েছে। আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন বলছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকল্প এলাকায় পারমাণবিক জ্বালানি আসার পরই পারমাণবিক স্থাপনা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র। জ্বালানি বুঝে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পারমাণবিক শক্তির অধিকারী দেশের তালিকায় নাম ওঠায় বাংলাদেশ। আজ সেই শক্তি ব্যবহার শুরু হচ্ছে।
এর আগে ২০২৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর আকাশপথে রাশিয়া থেকে ঢাকায় পৌঁছায় পারমাণবিক জ্বালানির প্রথম চালান। এরপর আসে আরও কয়েকটি চালান। বিশেষ নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সড়কপথে অক্টোবরে রূপপুরে নিয়ে যাওয়া হয় জ্বালানি। এরপর এটি মজুত করে রাখা হয়েছে রূপপুরে।
পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের উদ্যোগের শুরুটা ১৯৬১ সালে। রূপপুরে জমি অধিগ্রহণের কয়েক বছর পর প্রকল্পটি বাতিল করে দেয় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার। স্বাধীন দেশে এ নিয়ে আবার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
১৯৯৫ সালের জাতীয় জ্বালানি নীতিতে পারমাণবিক শক্তিকে একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প জ্বালানি উৎস হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০১১ সালে বাংলাদেশ সরকার ও রুশ ফেডারেশন সরকারের মধ্যে একটি আন্তরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়।
চুক্তির আওতায় ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও রোসাটমের ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্টের মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জেনারেল কন্ট্রাক্ট স্বাক্ষর করা হয়। চুক্তিতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ, যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও স্থাপন, কমিশনিং, পরীক্ষামূলক পরিচালনা, জনবলের প্রশিক্ষণ এবং প্রাথমিক পর্যায়ে তিন বছরের পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রকল্প–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, রূপপুরে বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটের কাঠামো তৈরি প্রায় শেষের দিকে। প্রথমটি থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সঞ্চালন লাইনের কাজও শেষ হয়ে গেছে। জ্বালানি প্রবেশ করানোর আগে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে প্রতিটি ধাপ শেষ করা হয়েছে। পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদনপ্রক্রিয়া এক বছর ধরে চলতে পারে। এ সময়ও নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলবে। নিতে হবে আন্তর্জাতিক সংস্থার ছাড়পত্র ও দেশের পরমাণু সংস্থার অনুমোদন।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি মূলত ইউরেনিয়াম থেকে তৈরি হয়। প্রথমে ইউরেনিয়াম অক্সাইড দিয়ে ছোট ট্যাবলেটের মতো জ্বালানি দানা (প্যালেট) বানানো হয়। এগুলোর ব্যাস সাধারণত ৮ থেকে ১৫ মিলিমিটার এবং দৈর্ঘ্য ১০ থেকে ১৫ মিলিমিটার। এমন অনেক জ্বালানি দানা প্রায় চার মিটার দীর্ঘ ধাতব নলের ভেতরে সাজিয়ে তৈরি হয় জ্বালানি রড। আবার নির্দিষ্ট কাঠামোতে অনেকগুলো রড একসঙ্গে যুক্ত করলে তৈরি হয় জ্বালানি বান্ডিল বা ফুয়েল অ্যাসেম্বলি। রূপপুরে ব্যবহৃত প্রতিটি বান্ডিলে ৩১২টি জ্বালানি রড আছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এই জ্বালানি বান্ডিল চুল্লির কেন্দ্রে বসানো হবে। রূপপুরের প্রথম ইউনিটে একসঙ্গে ১৬৩টি বান্ডিল ব্যবহারের কথা। ২০২৩ সালে অতিরিক্ত একটিসহ মোট ১৬৪টি বান্ডিল দেশে আনা হয়। একবার জ্বালানি বসালে প্রায় ১৮ মাস বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। ব্যবহৃত জ্বালানিতে তেজস্ক্রিয় পদার্থ থাকে। তাই তা বিশেষ নিরাপত্তায় রাশিয়ায় নেওয়া হবে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার নজরদারিতে প্রতিটি জ্বালানি বান্ডিলের হিসাব থাকবে।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ২৪ ঘণ্টা সমান হারে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। প্রতি দেড় বছর পর নতুন জ্বালানি দিতে হবে। জ্বালানিবর্জ্য বের করা, নতুন জ্বালানি ঢোকানো ও রক্ষণাবেক্ষণ মিলে একটি ইউনিট সর্বোচ্চ দুই মাস বন্ধ থাকতে পারে।
রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্র বলছে, জ্বালানি প্রবেশ করাতে ৩০ দিন সময় প্রয়োজন হবে। অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নির্দেশিকা মেনে বিশেষ নজরদারিতে এটি করতে হবে। জ্বালানি প্রবেশ করানোর পর শুরু হবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়া। এ সময় পারমাণবিক বিকিরণ ঘটানো ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ করতে আরও ৩৪ দিন লাগবে। এরপর ধীরে ধীরে চুল্লিপাত্রের শক্তি উৎপাদনক্ষমতা ৩, ৫, ১০, ২০, ৩০ শতাংশে উন্নীত করা হবে। এতে আরও ৪০ দিন সময় লাগতে পারে। ৩০ শতাংশে উন্নীত হলেই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সংযোগ করা সম্ভব হবে। এখান থেকে শুরু হবে রূপপুরের বিদ্যুৎ সরবরাহ। নিরাপত্তা নিশ্চিত করে জাতীয় গ্রিডে শতভাগ বিদ্যুৎ পেতে প্রায় ১০ মাস সময়ের প্রয়োজন হবে।
দেশে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। এ চাহিদা পূরণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির পাশাপাশি দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি হিসেবে পারমাণবিক শক্তিকে বিবেচনা করছে সরকার। কয়লানির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় বছরে দুই কোটি টন এবং গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় ৮০ লাখ টন কার্বন ডাই–অক্সাইড গ্যাস নিঃসরণ থেকে পরিবেশকে রক্ষা করবে রূপপুর। এ বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রায় আড়াই হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। নির্মাণ চলাকালে দিনে ২০ থেকে ২৫ হাজার মানুষ কাজ করেছেন রূপপুরে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, চুক্তি অনুসারে প্রথম তিন বছরের পারমাণবিক জ্বালানির দাম প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। এ হিসাবে বছরে জ্বালানি খরচ হবে এক হাজার কোটি টাকা। একই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে বছরে কয়লা লাগবে প্রায় এক কোটি টন। আর জ্বালানি তেল লাগবে ১৯ কোটি গ্যালন। এ ছাড়া কয়লা বা জ্বালানি তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ২৫ থেকে ৩০ বছর। আর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চলবে ৬০ বছর পর্যন্ত। প্রয়োজনীয় মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ সাপেক্ষে আরও ৩০ বছর পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র মানেই বড় দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। সব নিরাপত্তা পরীক্ষা করেই এটি চালু করতে হবে। নিজস্ব দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে। এ ছাড়া পারমাণবিক বর্জ্য হাজার বছর পর্যন্ত তেজস্ক্রিয় থাকে। তাই এটাও সতর্কতার সঙ্গে ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। এতে বেশি খরচ নিয়েও প্রশ্ন আছে।
ঠিকাদারের সঙ্গে করা মূল চুক্তি অনুসারে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের কাজ শেষ করার কথা ছিল ২০২৩ সালের অক্টোবরে। আর দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ শেষ করার কথা ২০২৪ সালের অক্টোবরে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিল প্রকল্পের মেয়াদ।
এখন অতিরিক্ত চুক্তিতে প্রথম ইউনিটের জন্য ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর ও দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর সময় নির্ধারণ করেছে সরকার। কাজ শেষ করার সময়সীমা দুই বছর বাড়িয়ে একটি অতিরিক্ত চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে গত বছরের ২০ জুন। গত জানুয়ারিতে আরও ছয় মাস বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে প্রকল্পের মেয়াদ। ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি অনুসারে মেয়াদ বাড়লেও প্রকল্পের খরচ বাড়ানোর সুযোগ নেই। তারা বাড়ায়নি। কিন্তু ডলারের দাম বাড়ায় ২৬ হাজার কোটি টাকা খরচ বেড়েছে প্রকল্পের। ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা খরচ হবে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মকর্তারা বলছেন, করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ মিলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ ব্যাহত হয়েছে। আর্থিক লেনদেনে জটিলতা, যন্ত্রপাতি দেশে আনা, বিশেষজ্ঞদের আসায় জটিলতা, বৈদেশিক মুদ্রা ডলার–সংকটে বিল পরিশোধে দেরি মিলিয়ে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে। এতে কাজ পিছিয়ে গেছে। রূপপুর প্রকল্পের খরচের জন্য বছরে বরাদ্দ করা মোট অর্থের ১০ শতাংশ দিতে হয় বাংলাদেশ সরকারকে। ডলার–সংকটের কারণে এটিও নিয়মিত পরিশোধ করা যায়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম গনমাধ্যমকে বলেন, রূপপুরের একটি ইউনিট চালু হলে বছরে ১০০ কোটি ডলারের জ্বালানি আমদানি সাশ্রয় করা যেত। অথচ সাড়ে তিন বছর পিছিয়ে গেছে এটি। বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করতে আরও এক বছর লাগবে। কোনোভাবেই এর চেয়ে বেশি সময় নেওয়া ঠিক হবে না। জ্বালানি প্রবেশ বড় মাইলফলক। তবে মানুষ বিদ্যুৎ পাওয়ার পর নিশ্চিত হবে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের মূল অর্জন। সূত্র, প্রথম আলো


