Last Updated on 2 hours by zajira news
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, জাজিরা নিউজ: নেপালে প্রলয়ংকরী হড়পা বান এবং হিমবাহ ধসের সময় যে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প টানেলের ভিতর বহু শ্রমিক ঘন কাদা ও ধ্বংসাবশেষের মধ্যে আটকা পড়েছিলেন, তাদের মধ্যে দুজনকে গতকাল জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
উদ্ধারকারী দল ক্ষীণ কণ্ঠস্বরের সূত্র ধরে মরণপণ তৎপরতা চালিয়ে এ দুজনকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। এ ঘটনাকে তারা ‘অলৌকিক’ সাফল্য বলে বর্ণনা করছেন। সূত্র : কাঠমান্ডু পোস্ট, বিবিসি, রয়টার্স।
প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের একজন সঞ্জয় শাহ, অন্যজন কবির মহারাজন। তাদের মধ্যে সঞ্জয় শাহ নেপাল বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মী। হিমবাহধসে সৃষ্ট পাহাড়ি ঢলের ৯ দিন পর ত্রিশূলী-৩ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকে গতকাল তাদের জীবিত উদ্ধার করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২৬ আগস্টে ঘটে যাওয়া এই দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ১২০০ জনেরও বেশি নিহত হয়েছেন। এখনো সুড়ঙ্গের ভিতর আটকেপড়া শ্রমিকদের উদ্ধারে কাজ করছেন উদ্ধারকর্মীরা।
নেপাল বিদ্যুৎ বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সুরেশ রাউত বলেন, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় অক্সিজেন দেওয়া হয়। সুড়ঙ্গের ভিতরে আরও মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের উদ্ধারে অভিযান চলছে।
তিনি আরও জানান, উদ্ধারের পর সঞ্জয় শাহকে হেলিকপ্টারে করে রাজধানী কাঠমান্ডুর উত্তর-পশ্চিমে বাত্তার এলাকার একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। কবির মহারাজনকে চিকিৎসার জন্য কাঠমান্ডুর ছাউনি সামরিক হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। প্রথম উদ্ধার হওয়া সঞ্জয় শাহ কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। তবে দ্বিতীয় ব্যক্তি কবির মহারাজন উদ্ধারের পর হাসছিলেন। তিনি উদ্ধারের জন্য ধন্যবাদ জানান।
সুরেশ রাউত জানিয়েছেন, ওই সুড়ঙ্গে মোট ৩৯ জন শ্রমিক আটকে ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তাদের মধ্যে কতজন এখনো জীবিত আছেন- সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে এ ঘটনায় দীর্ঘ ১০ দিন ধরে উৎকণ্ঠায় থাকা স্বজনদের মধ্যে স্বস্তি ও আনন্দ ফিরে এসেছে। উদ্ধার হওয়া কবির মহারাজনের স্ত্রী হিরাশোভা বলেন, ‘ফেসবুকে স্বামীর ছবি দেখে আমি জানতে পারি যে কবিরকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। আমি ছবিগুলো ফেসবুকে দেখেছি। খুব আনন্দ পেয়েছি। তাকে কাঠমান্ডুর সেনাবাহিনীর হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। আমি এখন হাসপাতালের দিকে যাচ্ছি।’ স্বামীর নিখোঁজ থাকার সময় পরিবারের ওপর দিয়ে কী কঠিন সময় গেছে, সেটিও জানান তিনি। তার ভাষায়, ‘আমরা ১০ দিন ঠিকমতো খেতে বা পান করতে পারিনি। আমরা খুব ভয় পেয়েছিলাম। এখন আমরা সবাই খুশি। এমনকি আনন্দে কেঁদেও ফেলছি।’ কবিরের ভাই আমির মহারাজনও স্বজনকে জীবিত ফিরে পাওয়ার খবরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।
তিনি জানান, কবিরকে উদ্ধার করায় তিনি ‘অত্যন্ত খুশি’। তার কথায়, ‘আমার বুকটা যেন হালকা হয়ে গেছে।’
এদিকে নেপালের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, সঞ্জয়ের অবস্থা স্থিতিশীল। কবিরকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে। উদ্ধারের পর সঞ্জয় জানান, দুর্ঘটনার সময় তিনি প্রকল্পের কন্ট্রোল রুমে ছিলেন। অন্যদের নিরাপদে বের করে দিতে গিয়ে তিনি নিজে বের হতে পারেননি। সুড়ঙ্গের ভিতরে আটকে থাকার সময় তিনি একটি মন্ত্র জপ করে সময় কাটান।
সঞ্জয় আরও জানান, তার আশপাশে তিন-চারজনের সঙ্গে কথা বলা বা শব্দ করে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছিল। তবে সুড়ঙ্গটি দীর্ঘ হওয়ায় আরও মানুষ ভিতরে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা তার।
উদ্ধার করা হলো যেভাবে :
দুই শ্রমিককে উদ্ধারের পেছনে ছিল দীর্ঘ ও জটিল অভিযান। বন্যার পানির সঙ্গে নেমে আসা কাদা, পাথর ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষে সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে উদ্ধারকারীদের প্রথমে সুড়ঙ্গের অবস্থান শনাক্ত করে সেখানে পৌঁছাতে হয়, এরপর ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে ভিতরে ঢোকার পথ তৈরি করতে হয়। ত্রিশূলি-৩এ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে পৌঁছাতেই উদ্ধারকারীদের প্রায় ছয় দিন লেগে যায়। বন্যার পর সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ ধ্বংসাবশেষে চাপা পড়েছিল। উদ্ধারকারীরা বিশাল পাথর ও কাদা সরাতে খননযন্ত্র ব্যবহার করেন।
সুড়ঙ্গের ভিতরে কেউ আটকা পড়ে থাকলে যাতে অক্সিজেনের অভাবে মারা না যান, সেজন্য জীবিতদের সম্ভাব্য অবস্থানগুলোতে পাইপের মাধ্যমে অক্সিজেন সরবরাহের চেষ্টাও করা হয়। এরপর গতকাল উদ্ধারকারীরা সুড়ঙ্গের ভিতর থেকে ক্ষীণ সাড়া পাওয়ার কথা জানান।
অস্ট্রেলিয়ার উদ্ধার বিশেষজ্ঞ আর্নল্ড ডিক্স বলেন, উদ্ধারকারীরা ভিতরে চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘চিন্তা করবেন না, আমরা আপনাদের উদ্ধার করছি।’ এর জবাবে ভিতর থেকে নেপালি ভাষায় ‘হুঞ্চা’ অর্থাৎ ‘হ্য্যঁ’ বা ‘ঠিক আছে’ শোনা গেছে। এতে উদ্ধারকারীদের মধ্যে নতুন করে আশার সৃষ্টি হয়।
ডিক্স জানান, সুড়ঙ্গের মুখে জমে থাকা ধ্বংসাবশেষের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ মিটার সরানো হয়েছিল। এর এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে দুই শ্রমিককে জীবিত বের করে আনতে সক্ষম হন উদ্ধারকারীরা।
এদিকে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশ করা ভিডিওতে দেখা যায়, কাদায় ভরা একটি সুড়ঙ্গের মুখ দিয়ে উদ্ধারকারীরা প্রথম শ্রমিককে বের করে আনছেন। তাকে দাঁড়াতে সহায়তা করার পর একপর্যায়ে উদ্ধারকারীদের পিঠে করে হেলিকপ্টারের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় তিনি হাত উঁচিয়ে সাড়া দিচ্ছিলেন। অপর শ্রমিক কবির মহারাজনকে কাদায় মাখা অবস্থায় স্ট্রেচারে করে বের করে আনেন উদ্ধারকারীরা। এ সময় তার দুই হাত ছিল প্রার্থনার ভঙ্গিতে।
জানা গেছে, এই উদ্ধার অভিযান সফল করতে শুধু ভারী যন্ত্রপাতিই নয়, প্রকল্পের সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক সম্পর্কে প্রকৌশলীদের জ্ঞানও কাজে লাগানো হয়েছে। বন্যার পর প্রকৌশলীদের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ উদ্ধার অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়কেন্দ্রে পরিণত হয়। গ্রুপটিতে ৫০০-এর বেশি সদস্য ছিলেন।
উদ্ধারকারীরা বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গের নকশা ও প্রবেশপথের তথ্য চাইলে প্রকৌশলীরা সেগুলো হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাতেন। এমনকি নিখোঁজ শ্রমিকদের নাম ও মোবাইল নম্বরও সেখানে শেয়ার করা হয়, যাতে তাদের সর্বশেষ অবস্থান শনাক্তে টেলিযোগাযোগ কর্তৃপক্ষের সহায়তা নেওয়া যায়।
উল্লেখ্য, বন্যার পানিতে পুরো উপত্যকায় প্রায় ২২ লাখ টন কাদা ও ধ্বংসাবশেষ জমেছে। ফলে অনেক সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ খুঁজে পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছিল।
নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেত বলেন, বন্যায় সুড়ঙ্গের চারপাশের ভূখণ্ড ও ভিতরের কাঠামো বদলে গেছে। কাদা, পাথর, মাটি ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ সুড়ঙ্গের ভিতরেও ঢুকে পড়েছে। এটি সাধারণভাবে সুড়ঙ্গ বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা নয়।
প্রসঙ্গত, গত ২৬ আগস্ট চীন-নেপাল সীমান্তের পাহাড়ে হিমবাহ ও শিলাধসের পর সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় ত্রিশূলি উপত্যকার একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রায় ১২টি প্রকল্প বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ছয়টি প্রকল্প থেকে প্রায় ৯০০ মানুষ নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। দুই শ্রমিককে উদ্ধারের আগে কোনো সুড়ঙ্গে শ্রমিকের জীবিত থাকার খবর নিশ্চিত করা যায়নি। তাই গতকালের উদ্ধার অভিযানকে ‘অলৌকিক’ বলে অভিহিত করেছেন উদ্ধারকারীরা।
সূত্র জানায়, তবে ত্রিশূলি-৩এসহ অন্যান্য জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গেও অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। নেপাল সরকার এর আগে জানিয়েছিল, একাধিক সুড়ঙ্গে ১০০ জনের বেশি শ্রমিক জীবিত থাকতে পারেন।

