Last Updated on 11 hours by zajira news
অনলাইন ডেস্ক, জাজিরা নিউজ: টানা পাঁচ দিনের পূজা-অর্চনার আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে বিদায় নিয়েছেন দেবী দুর্গা। সেই সঙ্গে সমাপ্তি ঘটেছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবের।
বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর ওয়াইজঘাটে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে হাজারো ভক্তের উপস্থিতিতে দেবী দুর্গার প্রতিমাগুলো বিসর্জন দেওয়া হয়।
দুপুর থেকেই ঢাক-ঢোল, কাঁসর-ঘণ্টার বাদ্যের তালে তালে রাজধানীর বিভিন্ন মন্দির ও মহল্লা থেকে শোভাযাত্রা করে প্রতিমাগুলো বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে আনা হয়। পরে নৌকাযোগে সেগুলো নদীর মাঝখানে নিয়ে বিসর্জন দেওয়া হয়। এ সময় চারদিকে ছিল বিষাদের সুর।
ভক্তদের কারও চোখে দেখা যায় অশ্রু, কারও ঠোঁটে শোনা যায় দেবীর বন্দনা। কেউ শেষ মুহূর্তে মায়ের কাছে মঙ্গল কামনা করেন। কেউবা নদীর পানি নিজের ও পরিবারের সদস্যদের শরীরে ছিটিয়ে নেন।
ওয়াইজঘাটে প্রতিমা বিসর্জন দেখতে আসা নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী কনিকা রায় বলে, দশমীর লগ্ন শুরু হয়ে যাওয়া মানেই মন খারাপের শুরু। খুব কষ্ট লাগছে, মা চলে যাচ্ছেন। এই কয়েক দিন মা ছিলেন, তাই আনন্দে কেটেছে। মায়ের কাছে চাওয়া, মা যেন এ দেশ থেকে সব ধরনের অপশক্তি দূর করে দেশকে শান্তিময় করেন। সবাইকে ভালো রাখেন।
পুরান ঢাকার হাজারীবাগ গণকটুলী থেকে আসা চন্দনা জানান, এই কয়েকটা দিন ছিল খুবই আনন্দের। মা দুর্গা তাদের মাঝে ছিলেন, তাই চারপাশ আনন্দে ভরে উঠেছিল। কিন্তু আজ মা চলে যাচ্ছেন, সেই কষ্টে বুকটা ভরে উঠছে। আবারও এক বছর মায়ের আসার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এবারের পূজায় তিনি বিশেষ প্রার্থনা করেছেন, যেন দেশ শান্তিময় হয় এবং সবার জীবনে সুখ ও সমৃদ্ধি নেমে আসে।
ধানমন্ডি থানা পূজা উদযাপন কমিটির যুগ্ম সম্পাদক শ্রী রাজিব কুন্ডু গনমাধ্যমকে বলেন, আমরা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে মাকে বিদায় জানাতে এসেছি। মা আমাদের মঙ্গলের জন্য, অসুর বধ করার জন্য ধরাধামে এসেছিলেন। আমরা মায়ের কাছে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ চাই, যাতে অশুভ শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। অন্যায়-অপরাধ দূর হোক। আগামীতে দেশ যেন সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয় এবং সব মানুষের মঙ্গল হয়, এটাই মায়ের কাছে প্রার্থনা।
দশমীর সকালে মণ্ডপ ও মন্দিরে পূজার অন্যতম প্রধান আচারে অংশ নেন নারীরা। দুর্গার পায়ে সিঁদুর নিবেদন করে তারা দেবীর শক্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এরপর একে অপরের গায়ে সিঁদুর মেখে জীবনের সমৃদ্ধি কামনা করেন।
প্রতিমা বিসর্জন ঘিরে রাজধানীতে নেওয়া হয় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা। বিসর্জন কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত কয়েক স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকবে। প্রতিমা বিসর্জনের শোভাযাত্রায় পুলিশের বিশেষ দল সোয়াট ও গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সদস্যদের পাশাপাশি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কয়েক শ সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন। এ ছাড়া আনসার গার্ড ব্যাটালিয়ন, ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দলসহ অন্যান্য দলের সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করছেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) ফারুক হোসেন বলেন, প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে ওয়াইজঘাটসহ সংশ্লিষ্ট এলাকায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পোশাকধারী ও সাদাপোশাকের পুলিশের পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। পুলিশের পাশাপাশি নৌ পুলিশ, কোস্টগার্ড ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও কাজ করছে।
তিনি বলেন, গতবার বিসর্জনের জন্য একটি স্থান থাকলেও এবার তিনটি স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া সড়ক একমুখী করা হয়েছে, যাতে প্রতিমা নিয়ে আসা ট্রাকগুলো নির্ধারিত পথে প্রবেশ করতে পারে এবং বিসর্জন শেষে সহজে বের হয়ে যেতে পারে। প্রতিমা বিসর্জন নির্বিঘ্ন করতে পর্যাপ্ত ট্রাফিক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
ফারুক হোসেন বলেন, বিসর্জনের সময় অনেকেই নৌকায় করে মাঝনদীতে যান। এ ক্ষেত্রে নারী, শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিদের মাঝনদীতে না যাওয়ার অনুরোধ করছি। সেখানে নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকলেও দুর্ঘটনা ঘটলে তাদের ঝুঁকি বেশি হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, সাধারণত সন্ধ্যার মধ্যে প্রতিমা বিসর্জন শেষ করার কথা বলা হয়। তবে সব প্রতিমা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিসর্জন দেওয়া সম্ভব না-ও হতে পারে। তাই শেষ প্রতিমাটি বিসর্জন না হওয়া পর্যন্ত পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন।
পুরোহিতদের শাস্ত্রমতে, এবার দেবী দুর্গার আগমন হয়েছে ঘোটকে (ঘোড়ায়) এবং গমন করছেন নৌকায়। দেবীর ঘোড়ায় আগমনকে ছত্রভঙ্গ অবস্থা, অস্থিতিশীলতা ও যুদ্ধের আশঙ্কার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়। অন্যদিকে, নৌকায় গমনকে শুভ বলে মনে করা হয়, যা সাধারণত বন্যা বা শস্যবৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রতি শরতে দেবী দুর্গা স্বামীর বাড়ি কৈলাস ছেড়ে কন্যারূপে পিতৃগৃহে আগমন করেন। পক্ষকাল পর তিনি ফিরে যান স্বামীগৃহে। এই পাঁচ দিন ভক্তরা দেবীর বন্দনা, পূজা ও উৎসবে মেতে ওঠেন। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবীকে বিদায় জানালেও অন্তরে থেকে যায় আগামী বছর তার পুনরাগমনের প্রত্যাশা।


