সময়ের জনমাধ্যম

মশা ঠেকাতে মশাই অস্ত্র, অভিনব উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের

Last Updated on 30 seconds by zajira news

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, জাজিরা নিউজ: মশার উৎপাত কমাতে এবার মশাকেই কাজে লাগানো হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে। ওয়াশিংটনের এক বাসিন্দা নিজের বাড়ির আঙিনায় বিশেষভাবে প্রস্তুত করা পুরুষ মশা ছেড়ে দিচ্ছেন।

শুনতে অদ্ভুত লাগলেও এর পেছনে রয়েছে মশার বংশবিস্তার বন্ধ করার বৈজ্ঞানিক কৌশল। এ উদ্যোগের উদ্যোক্তা টড মন্টগোমারি।

তার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এমন পুরুষ এশিয়ান টাইগার মশা ছাড়া হচ্ছে, যেগুলোর শরীরে রয়েছে ‘ওলবাকিয়া’ নামের একটি প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়া। পুরুষ মশা মানুষকে কামড়ায় না।

এই মশাগুলো যখন ওলবাকিয়াবিহীন স্ত্রী মশার সঙ্গে মিলিত হয়, তখন তাদের উৎপাদিত ডিম থেকে নতুন মশার জন্ম হয় না। ফলে ধীরে ধীরে নির্দিষ্ট এলাকায় মশার সংখ্যা কমে আসার কথা।

আবাসিক এলাকায় এ ধরনের কর্মসূচি যুক্তরাষ্ট্রে এবারই প্রথম বলে জানানো হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, গ্রীষ্মের শেষ নাগাদ পুরো এলাকায় প্রায় ছয় লাখ পুরুষ এশিয়ান টাইগার মশা ছাড়া হবে।

মন্টগোমারি এএফপিকে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ার সময় বাড়ছে। এর ফলে রোগবাহী মশার বিস্তার এবং সক্রিয় থাকার সময়ও দীর্ঘ হচ্ছে। তার ভাষায়, পরিস্থিতি এখন একটি ‘টিকটিক করা সময়বোমা’র মতো।

মন্টগোমারির প্রতিষ্ঠান এই পদ্ধতিকে ‘জ্যাপ মেলস’ নামে বাজারজাত করছে। তবে এটি নির্দিষ্ট প্রজাতির মশার ক্ষেত্রেই কার্যকর। এশিয়ান টাইগার মশা যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় প্রজাতি নয়; কিন্তু ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগের জীবাণু ছড়াতে পারে।

উত্তর ভার্জিনিয়ায় স্থানীয়ভাবে ডেঙ্গু সংক্রমণের প্রথম ঘটনা শনাক্ত হওয়ার পর মশাবাহিত রোগ নিয়ে উদ্বেগও বেড়েছে।

কেন্টাকির বাসিন্দা মন্টগোমারি আগে প্রতিরক্ষা খাতে কাজ করতেন। ২০২৩ সালে তিনি মশা নিয়ন্ত্রণে রাসায়নিক কীটনাশকের বিকল্প তৈরির লক্ষ্য নিয়ে নিজের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। বর্তমানে তিনি কীটতত্ত্ব বিষয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়াশোনা করছেন।

তিনি জানান, দেশীয় উদ্ভিদ ও পরাগায়নকারী প্রাণীর প্রতি আগ্রহ থেকেই এ উদ্যোগের চিন্তা আসে। বাড়ির আশপাশে নিয়মিত কীটনাশক প্রয়োগের বিষয়টি তাকে তুলনামূলক নিরাপদ বিকল্প খুঁজতে উৎসাহিত করে।

এই পদ্ধতির প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন অনেক গ্রাহকও। বিশেষ করে পরিবার ও পোষা প্রাণীকে রাসায়নিক কীটনাশকের সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব থেকে দূরে রাখতে চান তারা।

কর্মসূচির একজন গ্রাহক স্যান্ড্রা মারকুয়ার্ট বলেন, বাড়ির বাগানে বসা বা কাজ করা একসময় মশার কারণে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। কীটনাশক ব্যবহার না করেই সমস্যার সমাধান পাওয়ায় তিনি সন্তুষ্ট।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওলবাকিয়া-ভিত্তিক পদ্ধতিটি কার্যকর হওয়ায় এখন তিনি স্বামীর সঙ্গে বাড়ির বারান্দায় বসে খাবার খেতে এবং বাগানে সময় কাটাতে পারছেন।

বর্তমানে ২৫ জন গ্রাহক এ কর্মসূচির আওতায় রয়েছেন। প্রত্যেক গ্রাহক ১৬ সপ্তাহ ধরে প্রতি সপ্তাহে প্রায় দেড় হাজার করে পুরুষ মশা পাচ্ছেন।

ওলবাকিয়া এমন একটি ব্যাকটেরিয়া, যা মশার শরীরে প্রাকৃতিকভাবেও থাকতে পারে। নির্দিষ্ট ধরনের ওলবাকিয়া বহনকারী পুরুষ মশা এমন স্ত্রী মশার সঙ্গে মিলিত হলে, যাদের শরীরে সংশ্লিষ্ট ব্যাকটেরিয়া নেই বা ভিন্ন ধরনের ওলবাকিয়া রয়েছে, তখন তাদের ডিম স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হয় না। ফলে মশার প্রজনন চক্র বাধাগ্রস্ত হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ চলছে। সিঙ্গাপুরে ‘প্রজেক্ট ওলবাকিয়া’ নামে বড় পরিসরের একটি কর্মসূচি ২০১৬ সালে শুরু হয়। বর্তমানে সেখানে প্রতি সপ্তাহে এক কোটির বেশি পুরুষ মশা ছাড়ার কর্মসূচি চলছে।

‘নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ওলবাকিয়া-ভিত্তিক পদ্ধতিতে এডিস ইজিপ্টাই মশার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হয়েছে। একই গবেষণায় ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি ৭০ শতাংশের বেশি কমার প্রমাণও পাওয়া গেছে।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা ও ক্যালিফোর্নিয়ায় একই ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। গত মে মাসে সেখানে প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ মশা ছাড়ার অনুমতি চেয়ে আবেদন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

মশা নিয়ন্ত্রণে রাসায়নিক ব্যবহারের বিকল্প হিসেবে এই জৈবিক পদ্ধতি ভবিষ্যতে কতটা কার্যকর ও নিরাপদ হবে, তা নিয়ে অব্যাহত রয়েছে বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ।