Last Updated on 20 hours by zajira news
অনলাইন ডেস্ক, জাজিরা নিউজ; সামাজিক মাধ্যমের অবিরাম স্ক্রল ও অটো প্লে’র মতো বিভিন্ন ফিচার পরিকল্পিতভাবেই কি শিশুদের মস্তিষ্কে আসক্তি তৈরি করছে? এগুলো কি কেবল বিনোদন, নাকি মানুষের অবচেতন মনকে নিয়ন্ত্রণের সূক্ষ্ম কৌশল?
এমনই সব প্রশ্ন ও অভিযোগ উঠেছে মেটা ও গুগলের বিরুদ্ধে দায়ের করা ঐতিহাসিক এক মামলার বিচারে। গার্ডিয়ান লিখেছে, ফেইসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা ইউটিউব মানুষকে নেশাগ্রস্ত করে তুলছে? না কি এসবই পরিকল্পিত? লস অ্যাঞ্জেলেসে চলা এই মামলার রায় বদলে দিতে পারে ডিজিটাল দুনিয়ার ভবিষ্যৎ।
এ সপ্তাহের শুরুতে মেটা ও গুগলের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ক্ষতি নিয়ে যুগান্তকারী এক মামলার সমাপনী বক্তব্য অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে প্রসিকিউটর বা সরকারি আইনজীবী মার্ক ল্যানিয়ার দাবি করেছেন, এ মামলাটি ‘এবিসিডির মতো সহজ’। এসব প্রযুক্তি কোম্পানি ‘শিশুদের মস্তিষ্ককে নেশাগ্রস্ত করার’ দায়ে দোষী।
তবে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। মেটা বলেছে, তরুণ প্রজন্মের জন্য ‘নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করা সবসময়ই তাদের কাজের মূল লক্ষ্য’।
লস অ্যাঞ্জেলেসে ছয় সপ্তাহ ধরে চলা এই বিচারে অটো প্লে ভিডিও বা একটার পর একটা ভিডিও নিজে থেকেই চলা, অবিরাম স্ক্রল ও বারবার নোটিফিকেশনের শব্দের মতো নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
এ মামলাটিকে ১৯৯০-এর দশকের তামাক কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে হওয়া মামলার সঙ্গেও তুলনা করা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, এসব ফিচার আসলে কীভাবে কাজ করে এবং এর ফলাফল কী? এগুলো কি মানুষকে ব্যবহারকারীর বদলে নেশাগ্রস্ত করে তুলছে, নাকি তারা কেবল গ্রাহকদের চাহিদাই পূরণ করছে? অবিরাম স্ক্রলিং
একটা সময় সামাজিক মাধ্যমের ফিড বা পোস্টের তালিকা শেষ হত। তবে এখন এ স্ক্রলিং আর থামছেই না।
২০২১ সাল পর্যন্ত মেটা’তে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা হুইসেলব্লোয়ার বা কোম্পানির ভেতরের তথ্য ফাঁসকারী আর্তুরো বেজার বলেছেন, “এসব সামাজিক মাধ্যমে সবসময় এমন কিছু থাকে, যা আপনাকে বারবার ডোপামিন বা মস্তিষ্কে ভালো লাগার অনুভূতি দেয় এবং এর যোগান সীমাহীন।
“এসব ফিডের মূল প্রতিশ্রুতিই হচ্ছে, এখানে সবসময় আকর্ষণীয় ও আনন্দদায়ক কিছু থাকবে, যা কখনোই শেষ হবে না। এটিই অবিরাম স্ক্রলের মূল কারসাজি।”
বিচারে উপস্থাপিত কোম্পানির অভ্যন্তরীণ নথিতে দেখা গেছে, মেটা’র অন্যান্য কর্মীরাও ব্যবহারকারীদের মধ্যে বাড়তে থাকা ‘রিওয়ার্ড টলারেন্স’ বা একই জিনিসে বারবার আনন্দ না পাওয়া বা আরও বেশি কিছুর পাওয়ার নেশা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন।
২০২০ সালের এক ইমেইল আলাপে মেটার একজন কর্মীকে ইনস্টাগ্রাম সম্পর্কে বলতে দেখা যায়, “ওহ খোদা! ইনস্টাগ্রাম তো ড্রাগের (মাদক) মতো!” জবাবে তার এক সহকর্মী বলেছেন, “হা হা, মানে সব সামাজিক মাধ্যমই তাই। আমরা মূলত ড্রাগ বিক্রেতার মতো কাজ করছি।”
বেজার গার্ডিয়ান’কে বলেছেন, “আপনি প্রতিনিয়ত নতুন কিছু খুঁজছেন ও যখন কাঙ্ক্ষিত কিছু খুঁজে পাচ্ছেন… তার ঠিক পরেই আপনার মনোযোগ কেড়ে নেওয়ার মতো আরও নতুন কিছুর প্রতিশ্রুতি থাকছে। আর এ প্রক্রিয়ার কোনো সীমাবদ্ধতা নেই।”
‘লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স’-এর সামাজিক মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক সোনিয়া লিভিংস্টোন বলেছেন, “তরুণদের স্ক্রল করা খেয়াল করলে দেখবেন তারা খুব দ্রুত আঙুল চালায়। তারা কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে সিদ্ধান্ত নেয় সোয়াইপ, সোয়াইপ, সোয়াইপ, তারপর একটু দেখা, আবার সোয়াইপ, সোয়াইপ, আবার দেখা।
“তাদের মনে সবসময় এই অনুভূতি কাজ করে যে, পরের জিনিসটি হয়ত আরও ভালো হবে এবং সেটা দেখতে তো কেবল এক দুই সেকেন্ডই লাগবে।”
নেটফ্লিক্সের হোমস্ক্রিন থেকে শুরু করে ইউটিউব বা ইনস্টাগ্রাম এখন সব জায়গাতেই ভিডিও নিজে নিজেই চলতে শুরু করে, যাকে বলে অটো প্লে। তবে আর্তুরো বেজারে বলেছেন, এমনটি যখন ফেইসবুকের সাধারণ নিয়মে পরিণত হচ্ছিল তখন গ্রাহকরা তা ‘ঘৃণা করতে শুরু করেন’।
“মানুষ বিষয়টিকে বিরক্তিকর মনে করার ফলে বেশি সংখ্যক মানুষ বেশি ভিডিও দেখতে শুরু করলেন এবং বিজ্ঞাপনদাতারা খুশি হলেন তবে কিছু ব্যবহারকারী মোটেও খুশি ছিলেন না।
“অটো প্লে মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিকে উসকে দেয়। কোনো কিছু সামনে চললে তা আসলে কী হচ্ছে তা বোঝার জন্য আমরা অন্তত কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকি। আর এ সুযোগটাই নেয় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো।”
আইনজীবী ল্যানিয়ার এই অবিরাম স্ক্রল ও অটো প্লে’কে রেস্টুরেন্টে বিনামূল্যে পাওয়া ‘তরতিয়া চিপস’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন, যা একবার খাওয়া শুরু করলে মানুষ আর থামতে পারে না।
নোটিফিকেশন ও লাইক সামাজিক মাধ্যমের এমন কিছু হাতিয়ার, যা মানুষকে বিশেষ করে শিশুদের বিভিন্ন প্লাটফর্মের সঙ্গে আটকে রাখে।
‘নটিংহ্যাম ট্রেন্ট ইউনিভার্সিটি’র আচরণগত আসক্তি বিষয়ের অধ্যাপক মার্ক গ্রিফিথ বলেছেন, লাইক পাওয়ার প্রতিযোগিতায় জেতাটা “পুরস্কার পাওয়ার মতো বিষয়, যা আপনাকে সাময়িক আনন্দের অনুভূতি দেয়।
“আপনি যখন কোনো কিছু উপভোগ করেন তখন আপনার দেহ ডোপামিন ও অ্যাড্রিনালিন তৈরি করে। এতে প্রচুর পরিমাণে সুখের রাসায়নিক উপাদান নিঃসৃত হয়। এক অর্থে আপনি আপনার দেহের এনডোরফিনের ওপর নির্ভরশীল বা আসক্ত হয়ে পড়েন।” তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, বিষয়টি নিকোটিন বা কোকেনের আসক্তির মতো নয়।
“কিছু মানুষের জন্য বিষয়টি সত্যিই আসক্তির। তবে এ আসক্তির কঠোর মানদণ্ড অনুসারে, খুব কম মানুষই সেই পর্যায়ে পড়ে।”
আসক্তির বদলে সামাজিক মাধ্যমের এ বৈশিষ্ট্যকে ‘মোরিশ’ বা ‘আরও পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা’ বলে বর্ণনা করেছেন তিনি।
সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহারকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমটি অভ্যাসগত ব্যবহার, যা আপনার কাজের ক্ষতি করতে বা ব্যক্তিগত সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে, তবে জীবনকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয় না। দ্বিতীয়টি সমস্যামূলক ব্যবহার, যার প্রভাব অনেক বেশি গুরুতর।
এ সপ্তাহে আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় ইনস্টাগ্রামের প্রধান নির্বাহী অ্যাডাম মোসেরি বলেছেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় সামাজিক মাধ্যম ‘আসক্তি’ নয়। মানুষ যেমন একটি ভালো টেলিভিশন শো’র প্রতি আসক্ত হতে পারে, সামাজিক মাধ্যমও ঠিক তেমন। তবে তা নেশাজাতীয় দ্রব্যের মতো ক্ষতিকর আসক্তি নয়।
লস অ্যাঞ্জেলেসে মেটা ও গুগলের বিরুদ্ধে চলা এ মামলার জুরিরা শুক্রবার থেকে তাদের বিচারবিশ্লেষণ শুরু করেছেন।
এ মামলায় তাদের রায়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। কারণ এ রায় সামাজিক মাধ্যমের ডিজাইন বা কাঠামোর জন্য বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানির দায়বদ্ধতা নতুন করে নির্ধারণ করতে পারে।


