সময়ের জনমাধ্যম

গ্যালারিতে বসে আর্জেন্টিনার রুদ্ধশ্বাস জয় দেখলাম, এ যেন এক মহাকাব্য

Last Updated on 57 mins by zajira news

স্পোর্টস ডেস্ক, জাজিরা নিউজ: সাধারণত আমার জায়গাটা সবুজ মাঠে, ফুটবল পায়ে। কিন্তু আজ আমি ছিলাম একদম ভিন্ন ভূমিকায়, মায়ামির গ্যালারিতে, হাজারো দর্শকের ভিড়ে একজন সাধারণ ফুটবলপ্রেমী হয়ে।

গ্যালারিতে বসে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও কেপ ভার্দের শেষ ৩২-এর রুদ্ধশ্বাস ম্যাচটি দেখা আমার জীবনের অন্যতম সেরা এক অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে।

মাঠের উত্তাপ আর গ্যালারির উত্তেজনা মিলিয়ে ফুটবল যে কেন পৃথিবীর ১ নম্বর খেলা, তা আরও একবার হাড়ে হাড়ে টের পেলাম।

কাগজ-কলমের হিসাবে ম্যাচের আগে সবাই ধরে নিয়েছিল, আর্জেন্টিনা অনায়াসেই জিতবে। আমিও বলেছিলাম, এই ম্যাচে আর্জেন্টিনার জয়ের সম্ভাবনা ৯০ ভাগ আর কেপ ভার্দের ১০ ভাগ। ভেবেছিলাম, ২-০ ব্যবধানে জিতে মেসিরা শেষ ১৬-তে পা রাখবে। শুধু আমি নই, স্টেডিয়ামের অধিকাংশ মানুষের ধারণা ছিল এমনই।

কিন্তু মাঠের খেলা যে এমন ভিন্ন আমেজে, এতটা রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনায় রূপ নেবে, তা কে ভেবেছিল! কেপ ভার্দে যে লড়াকু ফুটবল খেলেছে, তা এককথায় অবিশ্বাস্য। এই বিশ্বকাপে সাবেক ও বর্তমান মিলিয়ে তিনটি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নকে ৯০ মিনিট পর্যন্ত আটকে রাখার কীর্তি দেখাল তারা। প্রথমে স্পেন, তারপর উরুগুয়ে এবং সর্বশেষ মেসির আর্জেন্টিনা।

১-১ হয়ে যাওয়ার পর গ্যালারিতে বসে ভাবছিলাম, খেলাটা হয়তো অতিরিক্ত সময়ে গড়াবে। আমি নিজে ব্রাজিলের সমর্থক, কিন্তু ফুটবল খেলাটা এতটাই আনন্দদায়ক যে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের ম্যাচটাও আমি দারুণ উপভোগ করেছি। গোল যেমনটা আশা করেছিলাম, তার চেয়েও অনেক বেশি গোল হয়েছে এই ম্যাচে।

মাঠের অধিকাংশ দর্শকই স্টেডিয়ামে এসেছিলেন মূলত একজন মানুষের জন্য—লিওনেল মেসি। এই বিশ্বকাপে মেসি প্রতিটি ম্যাচেই গোল করেছেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে রেকর্ড টানা ৮টি ম্যাচে গোল করার অনন্য রেকর্ড গড়েছেন। কেপ ভার্দের সঙ্গে পুরো ম্যাচে মেসির খেলায় ছিল কিছু জাদুকরি ঝলক। আর তাতেই তিনি নিজেকে চেনালেন। তাঁর প্রথম গোলটার সময় যে ‘ফার্স্ট টাচ’ এবং ওয়ান টাচে একটা একটু এগোলেন, তা ছিল এককথায় অসাধারণ। আর্জেন্টিনার এই জয়ে মেসির অবদান বিশাল। এমনকি ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার গোলটিও এসেছে মেসির কর্নার থেকেই। তাই দিন শেষে আমার চোখে তিনিই ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়।

মায়ামির স্টেডিয়ামের পরিবেশ ছিল এককথায় ‘১০০ প্লাস’। গ্যালারি একদম কানায় কানায় পূর্ণ ছিল, চারদিকে শুধু আকাশি-সাদা জার্সির ঢেউ। গ্যালারিতে বসে ফুটবল–রোমাঞ্চ অনুভব করা যাচ্ছিল প্রতিমুহূর্তে। মাঠে অনেক বড় বড় প্রোফাইলের মানুষ খেলা দেখতে এসেছিলেন। দেখলাম ব্রাজিলের কিংবদন্তি কাফু এসেছিলেন, ডেভিড বেকহাম এসেছিলেন সস্ত্রীক। ছিলেন কলম্বিয়ান সংগীত তারকা শাকিরাও। ফুটবল–উন্মাদনার পাশাপাশি এখানে চমৎকার সময় কাটছে, এর আগের দিন আমি শাকিরার কনসার্টেও গিয়েছিলাম!

আমার হোটেল থেকে স্টেডিয়ামে যেতে সাধারণত ৩০ মিনিট সময় লাগে। তবে প্রচুর মানুষ আর ট্রাফিকের কথা মাথায় রেখে ম্যাচ শুরু হওয়ার দুই ঘণ্টা আগেই রওনা দিয়েছি। রাস্তাঘাটে ট্রাফিক থাকলেও তেমন কোনো বড় সমস্যা ছাড়াই সময়মতো গ্যালারিতে পৌঁছাতে পেরেছি।

অতিরিক্ত সময়ের শুরুতেই যখন স্কোর ২-১, গ্যালারির আমরা সবাই ভেবেছিলাম, খেলা মনে হয় এখানেই শেষ। আমার চারপাশে থাকা আর্জেন্টাইন সমর্থকেরা নাচ-গান আর উল্লাস শুরু করে দিয়েছিল। ওদের চোখেমুখে যেমন টেনশন দেখেছি, তেমনি দেখেছি আনন্দের জোয়ার। কিন্তু ঠিক তখনই প্রতি–আক্রমণে গতিময় ফুটবল খেলে দারুণভাবে ম্যাচে ফিরে আসে কেপ ভার্দে। কেপ ভার্দের দ্বিতীয় গোলটি ছিল অবিশ্বাস্য!

বাঁ প্রান্তে বল পেয়ে সিডনি কাবরাল ভেতরের দিকে কাট করে ঢুকলেন, এরপর ডান পায়ে দুর্দান্ত এক বাঁকানো শট। বল সোজা গিয়ে জড়াল দূরের পোস্টে। অনেক দিন মনে রাখার মতো এক গোল, যা চলতি বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গোল বললেও ভুল হবে না। ওই গোলের পরমুহূর্তের জন্য স্টেডিয়ামের কিছু কেপ ভার্দের সমর্থক বাদে বাকিরা একদম স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। গ্যালারিতে বসে মনে হচ্ছিল যেন আনন্দ আর বেদনার এক মহাকাব্য দেখছি।

তবে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা তো সহজে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। আর্জেন্টিনা যখন আবারও গোল করে এগিয়ে গেল, তখন পুরো স্টেডিয়ামের মানুষ চিৎকার করে নাচতে শুরু করল। এক দারুণ রোমাঞ্চকর ও উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচ উপহার দিল দুই দলই। খেলা শেষে আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা যে পরিমাণ আনন্দ-উল্লাস করেছে, তা দেখার মতো ছিল। স্টেডিয়াম থেকে বেরোনোর সময় সেই রোমাঞ্চের রেশ তখনো আমার কাটেনি, আমিও শিহরিত ছিলাম।

আমার জীবনে গ্যালারিতে বসে আর্জেন্টিনার ম্যাচ দেখার এটি দ্বিতীয় অভিজ্ঞতা। এর আগে ২০২২ বিশ্বকাপে মেক্সিকোর বিপক্ষে মেসিদের ম্যাচে আমি গ্যালারিতে ছিলাম, যে ম্যাচে একটা গোল করেছিলেন মেসি। আজ মায়ামির গ্যালারিতে বসে আরও একবার মেসির জাদু আর বিশ্ব ফুটবলের আসল সৌন্দর্য উপভোগ করলাম। ফুটবল সত্যি অনন্য!

লেখক: জামাল ভুঁইয়া, বাংলাদেশ ফুটবল দলের অধিনায়ক। সূত্র, প্রথম আলো