সময়ের জনমাধ্যম

দেশে ফেরার ঝুঁকি কি নিবেন শেখ হাসিনা !

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা যা বলছে

Last Updated on 13 hours by zajira news

অনলাইন ডেস্ক, জাজিরা নিউজ: মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ভারতে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলছেন, ডিসেম্বর তিনি দেশে ফিরবেন এবং আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন। তবে শেখ হাসিনার এই বক্তব্যকে ‘রাজনৈতিক স্টান্টবাজি’ এবং ‘ঈদের পরে আন্দোলনের’ মতো মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ জুলাইয়ের সব পক্ষ শক্তি এক হয়ে যাবে। ১৬ বছরে আওয়ামী লীগ ভোগবাদী দলে পরিণত হয়েছে।

বিদেশের ভোগবিলাসের জীবন ছেড়ে বেশির ভাগ নেতা-কর্মী দেশেই আসবে না। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক শক্তিও শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের পেছনে নেই। সুতরাং শেখ হাসিনা দেশে ফেরার মতো এত বড় ঝুঁকি নেবেন না।

সবশেষ শুক্রবার (১০ জুলাই) বার্তা সংস্থা রয়টার্সে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার এবং আদালতে আত্মসমপর্ণের পরিকল্পনার কথা জানান।

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) টেলিফোনে তিনি এ সাক্ষাৎকার দেন। সম্প্রতি তিনি এনডিটিভিকে দেওয়া এক ইমেইল সাক্ষাৎকারেও দেশে ফেরার কথা বলেন। এর আগে রক্তাক্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ভারত পালিয়ে যাওয়ার পর শেখ হাসিনা বিভিন্ন মাধ্যমে, বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ার কলরেকর্ড ভাইরাল করার মাধ্যমে বহুবার বলেছেন—তিনি যেকোনো সময় দেশে ফিরবেন।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বক্তব্যকে ‘রাজনৈতিক স্টান্টবাজি’ মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বেপারী। তিনি বাংলানিউজকে বলেন, কোন ডিসেম্বর? বলেন নাই তো এই ডিসেম্বর আসবেন। ২০২৬ সালের ডিসেম্বর নাকি পরের কোনো ডিসেম্বরে। ওই বিএনপি যেমন বলত—ঈদের পরে আন্দোলন করব, কিন্তু ঈদের পরে আর আন্দোলন করত না, ওই রকমই হবে।

তিনি বলেন, রয়টার্স, এনডিটিভিকে দেশে ফিরবেন বলার আগেও বিভিন্নভাবে টেলিফোনিক আলাপগুলো ভাইরাল হয়েছে। সেখানে তিনি বলেছেন—আসতেছি। কিন্তু কিছু হয় নাই। এখনকার এই বলাটাকেও ওই একইভাবে দেখতেছি, খুব বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি না।

শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে কতটা ঝুঁকি নেবেন এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. নুরুল আমিন বলেন, মনে হয় ঝুঁকি নেওয়ার অত সাহস নেই। কারণ গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়েছে, তো অত সাহস মনে হয় হবে না। আর আন্তর্জাতিক লবি এখন আর আওয়ামী লীগের পেছনে নেই।

জুলাইয়ে নিহতের সংখ্যা নিয়ে আ.লীগের দাবি নাকচ, প্রকাশিত রিপোর্টেই অনড় জাতিসংঘ
জাতিসংঘে প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শিশু-কিশোরসহ প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হয়েছেন

তিনি বলেন, মনে হয় না উনি এত বড় ঝুঁকি নেবেন। আর দেশে এলে উনি (শেখ হাসিনা) আদালতের সম্মুখে ফাঁসির আসামি। ফাঁসির আসামি হিসেবে ওই ড্রেস পরতে হবে, ওই ট্রিটমেন্টটা পাবেন।ভারতও কিছুদিন পর শেখ হাসিনাকে ‘বোঝা’ মনে করবে বলে মনে করেন রাজনীতির এই শিক্ষক।

তিনি বলেন, কিছুদিন পরে দেখবেন ভারত শেখ হাসিনাকে একটা বোঝা মনে করবে। তার কারণ বর্তমান সরকার দেখেন চীনমুখী চলে গেছে। চীনের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক স্থাপন করছে। তিস্তার কাজটা যখন শুরু করবে, তখন তো ইন্ডিয়া যত চেষ্টা করুক আর আগের মত আসতে পারবে না। ইন্ডিয়া মনে হয় একটা নতুন চিন্তাভাবনা করছে যে শেখ হাসিনাকে আর কতটুকু সাপোর্ট দেবে তারা। এক্ষেত্রে আমার মনে হয় এইটা (শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বক্তব্য) একটা হুমকি দেওয়ার মতো হচ্ছে অথবা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সাহস যোগানোর জন্য বলছে—আসতেছি।

শেখ হাসিনা দেশে এলে তার পক্ষে কতটা জনমত তৈরি হবে? কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারবে কি না? এমন প্রশ্নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক বলেন, আমার মনে হয় এখন পর্যন্ত ওই পরিবেশ সৃষ্টি হয় নাই। উনি দেশে এলে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-সহ যারা গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে ছিল তারা সবাই সঙ্গে সঙ্গে এক হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের কর্মীরা সাহস পাবে না। তার ওপর তারা নিষিদ্ধ ঘোষিত একটা দল। তাদের তো অ্যারেস্ট করবে।

আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা আন্দোলনমুখী হবে না বলেও মনে করেন অধ্যাপক নুরুল আমিন। তিনি বলেন, আরেকটা বিষয় হলো আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা ১৫ বছর ক্ষমতায় থেকে দুর্নীতির মাধ্যমে প্রচুর টাকার মালিক হয়েছে। একবার টাকার মালিক হইলে তারা আর আন্দোলনমুখী হয় না। তারা ভোগবাদী নেতা-কর্মীতে পরিণত হয়। যেটা আমরা দেখেছি বিএনপির ক্ষেত্রেও। ১৫ বছর আমরা বিএনপিকে দেখেছি আন্দোলনকে তত তারা বেগবান করতে পারে নাই। তার কারণ ওই কয় বছর তারা ক্ষমতায় ছিল তাদের মধ্যে কিছু নেতাকর্মী একইভাবে টাকা পয়সার মালিক হয়ে গিয়েছিল। ফলশ্রুতিতে তারা আন্দোলন করতে পারে নাই। আওয়ামী লীগও ওইভাবে একটা ভোগবাদী পার্টিতে রূপান্তরিত হয়ে গেছে।

রক্তাক্ত জুলাই: পুলিশের গুলিতে সন্তান হারা পুলিশ বাবার জবানবন্দিঅধ্যাপক নুরুল আমিন বলেন, প্রমাণ দিতে পারি অনেক কাউন্সিলর, উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী প্রচুর টাকার মালিক হয়েছে। তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন জায়গায় চলে গেছে। তারা কখন আসবে? ওই যখন মনে করবে ২৪-এর অভ্যুত্থানের মত আরেকটা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সফল হওয়ার পরে আসবে। এর আগে আসবে না, ঝুঁকি নেবে না। যদি নেয় অল্প সংখ্যক নেবে, ব্যাপক আকারে ঝুঁকি নেবে না। ফলশ্রুতিতে শেখ হাসিনা এই বক্তব্য দিয়ে নেতা-কর্মীদের ব্যাপকভাবে উজ্জীবিত করতে পারবেন না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান (পলিটিক্যাল সায়েন্স) বিভাগের আরেক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আইনুল ইসলামও ভারতে আশ্রিত শেখ হাসিনার বক্তব্যকে ‘রাজনৈতিক স্টান্টবাজি’ মনে করছেন।

তিনি বাংলানিউজকে বলেন, এটা স্টান্টবাজি, এটা একটা রাজনীতি। মানে উনি আত্মসমর্পণ করবেন এরকম না। আমার মনে হয় উনি আসবেন বা আত্মসমর্পণ করবেন এরকম সম্ভাবনা খুবই কম। এটা তার কর্মীদের এক ধরনের উজ্জীবিত করা, এক ধরনের পলিটিক্যাল স্টান্টবাজি।

অধ্যাপক আইনুল ইসলাম আরও বলেন, আমার মনে হলো বাংলাদেশ সরকার রেডি আছে শেখ হাসিনাকে গ্রহণ করার জন্য। কারণ যদি উনি আসেন তাহলে তো ওনাকে আইন মোকাবেলা করতে হবে। … আর আইনকে ফাঁকি দেওয়ার জন্যই তো আসলে ওনারা দেশ থেকে চলে গেছেন। এখন আমার কাছে যথেষ্ট সন্দেহ হয় আসলে আইন মোকাবেলা করার জন্য আদৌ আসবেন কিনা। সুত্র, বাংলা নিউজ টুয়েন্টিফরডটকম