Last Updated on 3 hours by zajira news
অনলাইন ডেস্ক, জাজিরা নিউজ: কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে খুলনার এক পর্যটকের মৃত্যুর পর প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে একের পর এক নিরাপত্তা ব্যর্থতার অভিযোগ।
জেলা প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়াই পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আবহাওয়ার ঝুঁকি উপেক্ষা, অতিরিক্ত ওজনের যাত্রী উড্ডয়ন, উপযুক্ত লাইফ জ্যাকেট না দেওয়া এবং জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থা না রাখাসহ একাধিক মৌলিক নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ মিলেছে।
জেলা প্রশাসন, প্রত্যক্ষদর্শী, স্থানীয় বাসিন্দা এবং প্যারাসেইলিং খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এসব ত্রুটির সমন্বিত কারণেই শেষ পর্যন্ত শনিবার সৈকতে প্রাণ যায় খুলনার শৌভিক রায়ের।
অভিযোগের তীর ‘ফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টস প্যারাসেইলিং’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের দিকে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক মোহাম্মদ ফরিদের বিরুদ্ধে অতীতেও নিরাপত্তা অবহেলার অভিযোগ এসেছিল।
বিভিন্ন সময়ে প্রশাসন প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ করে দিলেও তা বারবার চালু করা হয় বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। দুর্ঘটনার পর থেকে ফরিদকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান বলেন, ২০২৫ সালের পর থেকে জেলার কোনো প্রতিষ্ঠানকেই প্যারাসেইলিং পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, “জেলা প্রশাসনের কোনো অনুমোদন ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। একই সঙ্গে তারা ন্যূনতম নিরাপত্তা মানও অনুসরণ করেনি। দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুল হাসান সিয়াম বলেন, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে কয়েকদিন ধরেই কক্সবাজারে প্যারাসেইলিং বন্ধ রাখার নির্দেশ ছিল। কিন্তু ‘ফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টস’ গোপনে কার্যক্রম চালিয়ে যায়।
সিয়াম বলেন, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নির্দেশনা অনুযায়ী বাতাসের গতি ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটারের বেশি হলে প্যারাসেইলিং বন্ধ রাখতে হয়। কিন্তু দুর্ঘটনার দিন কক্সবাজারে বাতাসের গতি ছিল প্রায় ৪০ কিলোমিটার। সেই পরিস্থিতিতেও পর্যটকদের নিয়ে উড্ডয়ন চালানো হয়।
তিনি বলেন, শুধু তাই নয়, প্যারাসেইলিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ ৯০ থেকে ৯৫ কেজি ওজনের সীমা থাকলেও প্রায় ১১০ কেজি ওজনের শৌভিক রায়কে উড্ডয়নের অনুমতি দেওয়া হয়। প্রশাসনের অভিযোগ, তার ওজন অনুযায়ী উপযুক্ত লাইফ জ্যাকেটও দেওয়া হয়নি।
নিরাপত্তা বিধি অনুযায়ী প্যারাসেইলিং চলাকালে একটি উদ্ধারকারী জেট-স্কি বা রেসকিউ বোট প্রস্তুত রাখতে হয়। কিন্তু দুর্ঘটনার সময় এমন কোনো উদ্ধার ব্যবস্থা সক্রিয় ছিল না বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। এ ছাড়া ব্যবহৃত স্পিডবোটটির বৈধ ফিটনেস সনদ ছিল কিনা, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
দরিয়ানগরের বাসিন্দা মোহাম্মদ শিমুল ঘটনার সময় সেখান উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যেই শৌভিক রায় সমুদ্রে পড়ে যান।
“আমি দেখেছি, স্পিডবোটটি তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করলেও স্রোতের কারণে দ্রুত কাছে পৌঁছাতে পারেনি। পরে সৈকত থেকে প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মী সাঁতরে গিয়ে তাকে উদ্ধার করেন। এতে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়।”
শিমুল বলেন, উদ্ধার করার সময় শৌভিকের শরীরে লাইফ জ্যাকেট ছিল না। পরে সেটি ঘটনাস্থল থেকে কিছু দূরে পানিতে ভাসতে দেখা যায়। এতে ধারণা করা হচ্ছে, পানিতে পড়ার পর কোনো একসময় লাইফ জ্যাকেটটি খুলে যায়।
ঘটনার একটি ভিডিওতে দেখা যায়, শৌভিককে তীরে আনার পর তাকে একটি বিচ বাইকে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। এর আগে সৈকতেই তার পেট চেপে ফুসফুস থেকে পানি বের করার চেষ্টা করেন উদ্ধারকারীরা।
কক্সবাজারে বর্তমানে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান প্যারাসেইলিং পরিচালনা করছে বলে জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
তাদের দাবি, অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযোগ না থাকলেও ২০২১ সালে কার্যক্রম শুরু করার পর থেকেই ফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টসের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা অবহেলার অভিযোগ রয়েছে। সেগুলোর তদন্ত হওয়া উচিত।
স্যাটেলাইট ভিশন সি স্পোর্টসের প্রশিক্ষক সোহেল রানা; যিনি মালয়েশিয়ায় প্যারাসেইলিং প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতিটি প্যারাসেইলিং স্পটে বাতাসের গতি পরিমাপের যন্ত্র থাকতে হয় এবং ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটারের বেশি বাতাস থাকলে কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়।
তার মতে, প্রতিটি অংশগ্রহণকারীর ওজন মাপা, শারীরিক সক্ষমতা যাচাই, উপযুক্ত মাপের লাইফ জ্যাকেট ও হারনেস ব্যবহার নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক।
এ ছাড়া ১১৫ থেকে ১৫০ হর্সপাওয়ারের বিআইডব্লিউটিএ অনুমোদিত ইঞ্জিনযুক্ত স্পিডবোট, একজন চালকের পাশাপাশি একজন সহকারী এবং সার্বক্ষণিক প্রস্তুত উদ্ধারকারী জেট স্কি থাকার কথাও বলেন তিনি।
জেলা প্রশাসন ও স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, শৌভিক রায়ের ওজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ লাইফ জ্যাকেট ছিল না। স্পিডবোটে চালক ছাড়া আর কোনো সহকারী ছিলেন না। প্রতিষ্ঠানের একটি জেট স্কি থাকলেও সেটি সৈকতেই পড়ে ছিল, উদ্ধারকাজে ব্যবহার করা হয়নি।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা সুবক্তবিন সোহেল বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, শৌভিক রায়ের মৃত্যু পানিতে ডুবে হয়েছে। তবে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে।
কক্সবাজার সদর থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী বলেন, নিহতের পরিবারের সদস্যরা সোমবার সকালে কক্সবাজারে পৌঁছেছেন। তারা আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সূত্র, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম


