Last Updated on 5 hours by zajira news
অনলাইন ডেস্ক, জাজিরা নিউজ: রিসোর্টের হলরুমের সারি সারি ডেস্কে রাখা ৫০টি মনিটর, ৪৪টি সিপিইউ ও ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন। এমনকি ছিল ল্যাপটপ, প্রিন্টার, কি–বোর্ড, মাউস, কানেকশন বোর্ডসহ নানা ইলেকট্রনিক সরঞ্জামও । রিসোর্টের আরেক অংশে তৈরি করা হয়েছিল ছয়টি সাউন্ডপ্রুফ (শব্দনিরোধ) কক্ষ।
সম্প্রতি কক্সবাজারের হিমছড়ির মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্টে এসব সরঞ্জামের সন্ধান পায় পুলিশ।
পুলিশের দাবি, পর্যটকদের থাকার জন্য ব্যবহৃত রিসোর্টটির আড়ালে একটি কম্পিউটার ল্যাব তৈরি করা হয়েছিল। সেখান থেকে অনলাইনভিত্তিক আর্থিক প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড (স্ক্যাম) পরিচালিত হয়ে থাকতে পারে।
তবে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন কী কাজে ব্যবহার করা হতো, কোন প্ল্যাটফর্মে সেগুলো ব্যবহার করা হয়েছে কিংবা এর সঙ্গে কারা যুক্ত—এসব বিষয় নিশ্চিত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেউ। জব্দ করা এসব আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষা শেষে তথ্য জানা যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার রাতে এ ঘটনায় পাঁচ চীনা ও এক তাইওয়ানের নাগরিককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) বিকেলে তাঁদের কারাগারে পাঠান আদালত। রামু থানায় হওয়া সাইবার সুরক্ষা আইনের একটি মামলায় তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। মামলায় আরও চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাঁরা পলাতক। এ ছাড়া আরও ৩০০ চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিককে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা চলতি বছরের ১ মার্চ থেকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। তবে বাংলাদেশে অবস্থানের উদ্দেশ্য ও কার্যক্রম সম্পর্কে তাঁরা সন্তোষজনক তথ্য দিতে পারেননি।
পুলিশের এজাহার অনুযায়ী, মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্ট ছাড়া উখিয়ার ইনানী এলাকার ড্রিম হলিডে রিসোর্ট, অর্কিড–ব্লু রিসোর্ট ও ইলিয়াস ব্রাদার্স নামের একটি আবাসিক ভবনে ২৫০ থেকে ৩০০ চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিক অবস্থান করছিলেন।
চীনা নাগরিক ঝান ইউয়ান ফান ‘বাবর আলী’ নাম ব্যবহার করে চলতি বছরের এপ্রিল থেকে চারটি স্থাপনা ভাড়া নেন।
পুলিশের দাবি, রিসোর্টগুলো ভাড়া নেওয়ার পর সেগুলো শুধু থাকার জন্য ব্যবহার করা হয়নি। পুরোনো ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন করে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী সাজানো হয়। নিরাপত্তাকর্মী ও অন্যান্য জনবল নিয়োগসহ ব্যবস্থাপনার একটি বড় অংশও তাঁরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেন।
মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্টের মহাব্যবস্থাপক আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ‘নাম–পরিচয় থেকে শুরু করে রিসোর্ট ভাড়া নেওয়া পর্যন্ত সবকিছুতেই ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করেছেন বিদেশিরা। যেটা আমরা ধরতে পারিনি।’
মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্টের কম্পিউটার ল্যাবেই দিনের কার্যক্রম চালাতেন চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিকেরা। এরপর তাঁরা সেখান থেকে ড্রিম হলিডে, অর্কিড–ব্লু ও ইলিয়াস ব্রাদার্সের আবাসিক ভবনে চলে যেতেন।
গতিবিধি সন্দেহ হওয়ায় গত ২৫ আগস্ট মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্টে অভিযান চালান পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। তবে অভিযানের বিষয়টি আঁচ করতে পেরে তাঁরা সেখান থেকে পালিয়ে যান। ওই দিনই মূলত আইফোন, কম্পিউটারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।
জব্দ তালিকা অনুযায়ী, সেখানে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, ৫০টি মনিটর, ৪৪টি সিপিইউ, ৩০টি কি–বোর্ড, দুটি ল্যাপটপ, দুটি প্রিন্টার, ৪০টি মাউস, একটি আইপিএস ও ২৪টি কানেকশন বোর্ড ছিল। এ ছাড়া ১৫টি নোট খাতা, একটি ডায়েরি, চারটি গ্রামীণফোন ও একটি রবি সিম পাওয়া যায়। জব্দ করা মালামাল পরে রিসোর্টের মহাব্যবস্থাপক আবু বক্কর সিদ্দিকের হেফাজতে রাখা হয়।
২৬ আগস্ট ঢাকায় অবস্থিত চীনা দূতাবাসের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল রিসোর্টটি পরিদর্শন করে।
পুলিশের দাবি, প্রতিনিধিদলের সদস্যরা মৌখিকভাবে মতামত দেন, সংশ্লিষ্ট চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিকেরা প্রতারণা ও অনলাইনভিত্তিক অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন।
এর দুই দিন পর ২৮ আগস্ট কাউন্টার টেররিজমের অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) ৯ সদস্যের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। এরপর দলের সদস্যরা পুলিশকে জানান, ‘সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কৃত্রিম বাজার বিশ্লেষণ, ভুয়া প্রলোভন, ক্লোন বা ভুয়া ট্রেডিং প্ল্যাটফর্মে অর্থ জমা ও অর্থ আত্মসাতের মতো অনলাইনভিত্তিক আর্থিক প্রতারণার সংঘবদ্ধ অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন।’
রিসোর্টে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন একসঙ্গে কেন রাখা হয়েছিল, সেটি ধরেই তদন্ত আগাচ্ছে পুলিশ। চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিকদের বিরুদ্ধে করা মামলার বাদী হয়েছেন রামু থানার পুলিশ পরিদর্শক মিন্টু দত্ত। তিনি গনমাধ্যমকে বলেন, আইফোনসহ এসব সরঞ্জাম তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার হতো বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ফোনগুলো কী কাজে ও কোন ধরনের প্ল্যাটফর্মে ব্যবহার করা হয়েছে, তা ফরেনসিক পরীক্ষার পর জানা যাবে।
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, এই ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন অনলাইন প্রতারণা নেটওয়ার্কের অংশ কি না, এটিই এখন জানার বিষয়। দ্রুত বিষয়টি উদ্ঘাটন করতে হবে।
এ ছাড়া ওই কম্পিউটার ল্যাবে কী কাজ চলত, এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক কোনো অনলাইন প্রতারণা চক্রের যোগসূত্র রয়েছে কি না, এসব তথ্যের খোঁজ করতে হবে।


