Last Updated on 22 hours by zajira news
অনলাইন ডেস্ক, জাজিরা নিউজ: নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ৩০ বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়ার পর দেশটির সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তিন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।
২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠানো হয়।মূলত প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্তে যুদ্ধের ময়দানে শিকার হিসেবে পাঠানো হতো তাঁদের।
এরপর তাঁদের ওপর প্রতিপক্ষ ড্রোন হামলা চালালে হামলাকারীদের অবস্থান ও দূরত্ব শনাক্ত করা হতো। এভাবে সেখানে ড্রোন হামলায় অন্তত ২০ বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্য পেয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)।
গতকাল বুধবার (১৪ অক্টোম্বর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-১০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহা. আসাদুজ্জামান।
এ ঘটনায় মানবপাচার চক্রের অন্যতম হোতা জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমান (৫৫) ও আবু তাহের ওরফে লেন্টুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
গত মঙ্গলবার গভীর রাতে ফরিদপুরের নগরকান্দার আটাইল এলাকা থেকে আসামি মিজানুরকে এবং ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ এলাকা থেকে আবু তাহের ওরফে লেন্টুকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এসআরবি জানিয়েছে, চলতি বছরের ৭ মে জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ওই ৩০ জন বাংলাদেশি রাশিয়ায় যান। নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে কাজের কথা বলে তাঁদের প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা করে নেওয়া হয়।
সেখানে পৌঁছার পর প্রতিশ্রুত চাকরি না দিয়ে তাঁদের রাশিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। এরপর ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।
মোহা. আসাদুজ্জামান বলেন, যাঁদের বাংলাদেশ থেকে নেওয়া হয়েছে, আসলে তাঁরা কেউ যুদ্ধ করার মতো যোগ্য নন। যুদ্ধের জন্য তাঁদের শারীরিক সক্ষমতা, প্রশিক্ষণ বা কৌশল—কোনো কিছুই ছিল না। তাহলে মাত্র ২১ দিনের প্রশিক্ষণে তাঁদের কেন পাঠানো হলো?
তিনি বলেন, ‘আমরা যেটা বুঝতে পেরেছি, প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করতে একধরনের শিকার হিসেবে তাঁদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।
যখন প্রতিপক্ষ তাঁদের ওপর ড্রোন হামলা চালায়, তখন ওই দেশটি শত্রুপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করে।’
এসআরবি জানায়, যুদ্ধক্ষেত্রে তিনটি ভাগে (প্রথম ভাগ, মধ্যভাগ ও শেষ ভাগ) তাঁদের মোতায়েন করা হয়েছিল। প্রথম দিনই ড্রোন হামলায় ১৭ জন মারা যান। পরে বিভিন্ন সময় আরো তিনজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে ৩০ জনের মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর বিষয়ে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে তারা।
সংবাদ সম্মেলনে আসাদুজ্জামান বলেন, জীবিত ব্যক্তিদের মধ্যে দুজন আহত অবস্থায় বাংলাদেশে ফিরেছেন। তাঁদের একজন রাজন।
এসআরবি জানায়, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা ভুক্তভোগী রাজন হোসেনকে (২১) কনস্ট্রাকশন সাইটের কাজের কথা বলে আট লাখ ২৫ হাজার টাকার বিনিময়ে রাশিয়ায় পাঠান। গত ৭ মে রাশিয়ায় পৌঁছার পর তাঁকে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়। টানা ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে তাঁকেসহ ৩০ বাংলাদেশিকে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়। সেখানে ড্রোন হামলায় রাজনের কোমরের হাড় ভেঙে যায় এবং দুই পায়ের শক্তি হারিয়ে ফেলেন তিনি। পরে বুকের ওপর ভর দিয়ে প্রায় চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তিনি ক্যাম্পে পৌঁছেন।
এক পর্যায়ে আহত অবস্থায় তিনি পালিয়ে দূতাবাসের সহায়তায় গত ২৩ আগস্ট দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে ক্ষতিপূরণ দাবি করলে মিজানুর রহমান ভুক্তভোগীর পরিবারের লোকজনকে গালমন্দ, মারধরের চেষ্টা এবং প্রাণনাশের হুমকি দেন।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর বাবা কালীগঞ্জ থানায় মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলা করেন। এ ছাড়া অন্য আটজনের মধ্যে দুজন মস্কোর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অন্য ছয়জন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছেন।
এসআরবি কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, এই মানবপাচারের সঙ্গে বাংলাদেশি চক্রের পাশাপাশি রাশিয়ার ইগর নামের এক ব্যক্তি এবং কিরগিজস্তানের জুলিয়া নামের এক নারী যুক্ত ছিলেন। তাঁদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও অভিযান চলছে। চক্রের আরেক সদস্য মোস্তাফিজুরকেও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
এ ছাড়া প্রাথমিক তথ্যের বরাতে এসআরবি জানায়, রাশিয়ার যুদ্ধে বিভিন্ন দেশের লোকজন একইভাবে যুক্ত হয়েছেন। আর বাংলাদেশ থেকে, বিশেষ করে গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, জামালপুর, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, গাজীপুর থেকেও গেছেন অনেকে।
আসাদুজ্জামান বলেন, ভুক্তভোগীদের বেশির ভাগ দরিদ্র পরিবারের সন্তান। কেউ কেউ ঋণ করে বিদেশে গিয়েছিলেন। এখন তাঁদের পরিবারের অনেকে স্বজনের মৃত্যুর খবর পেলেও মরদেহ দেখার বা দেশে ফিরিয়ে আনার সুযোগ পাচ্ছেন না। বিদেশে চাকরির প্রলোভনে অর্থ লেনদেন এবং যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বৈধতা যাচাইয়ের বিষয়ে সতর্ক থাকার আহবান জানিয়েছে এসআরবি।

