সময়ের জনমাধ্যম

সরকারি গেজেটে জুলাই শহীদ ৮৪৩, নেই নতুন আবেদন

ফাইল ছবি

Last Updated on 12 hours by zajira news

অনলাইন ডেস্ক, জাজিরা নিউজ: সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের শুরুতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের দমন–পীড়নে রক্তাক্ত এক অধ্যায় পেরিয়ে তা গণ–অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ৩৬ দিন আন্দোলনের পর ওই বছরের ৫ আগস্ট পতন ঘটে শেখ হাসিনা সরকারের।

এরপর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত ব্যক্তিদের জুলাই শহীদ এবং আহত ব্যক্তিদের জুলাই যোদ্ধার স্বীকৃতি দেয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে জুলাই শহীদদের তালিকা প্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। তখন সংখ্যাটি ছিল ৮৩৪। এরপর জুন মাসে আরও ১০ জনের নাম যুক্ত হলে জুলাই শহীদের সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৪৪। তাঁদের তালিকার গেজেটও প্রকাশিত হয়।

এরপর আগস্ট মাসে শহীদের তালিকা থেকে আটজনের নাম বাদ দেয় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। কারণ হিসেবে বলা হয়, তালিকায় চারজনের নাম দুবার এসেছে। আর বাকি চারজন সরাসরি জুলাই আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলেন না। ফলে সরকারি গেজেট অনুযায়ী সে সময় জুলাই শহীদের সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৩৬।

জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহীদ ও আহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা চূড়ান্তকরণ, আহতদের চিকিৎসা এবং তাঁদের পরিবারকে সহায়তা করতে গঠিত হয় জুলাই গণ–অভ্যুত্থান অধিদপ্তর। তাদের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে গেজেট থেকে একজনের নাম বাদ দেওয়া হয়। ফেব্রুয়ারিতে বাদ পড়ে আরও তিনজনের নাম।

এপ্রিল মাসে আবার নতুন করে ১২ জনের নাম শহীদের তালিকায় যুক্ত করে গেজেট প্রকাশ করা হয়। এরপর ১৩ মে আরও একজনের নাম শহীদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে সরকারি গেজেটে এখন জুলাই শহীদের সংখ্যা ৮৪৩। আর আহতের সংখ্যা ১৪ হাজার ৩৭০।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, এখন পর্যন্ত গেজেট হয়েছিল ৮৫৬ জনের। যাচাই–বাছাইয়ে বেশ কয়েকজনের নাম শহীদের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। যে নামগুলো বাদ পড়েছে, ওই গেজেট নম্বরে আর কোনো শহীদের নাম যুক্ত হবে না। ফলে জুলাই শহীদের সংখ্যা এখন পর্যন্ত ৮৪৩।

জুলাই শহীদদের সংজ্ঞায় গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে তৎকালীন সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা ওই সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সদস্যদের আক্রমণে মৃত্যুবরণকারীদের শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

শহীদদের নাম প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করা হয়। বিভিন্ন সময় কিছু নাম যুক্ত হয়েছে। আবার শহীদ নন বলে শনাক্ত হওয়ায় কিছু নাম বাদ পড়েছে। আবার অনেকের স্বজন নিখোঁজ রয়েছে। ফলে জুলাই শহীদদের তালিকাকে এখনো পূর্ণাঙ্গ বলা যায় না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনেকে।

জুলাই অভ্যুত্থানের সময় দ্রোহযাত্রায় নেতৃত্বদানকারী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ প্রথম আলোকে বলেন, শহীদের চূড়ান্ত তালিকা নির্ধারণ করা সরকারের দায়িত্ব। সরকারের কাছে নিজস্ব তথ্য না থাকলে জাতিসংঘের তথ্য যাচাই করে হলেও সুনির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করা উচিত। তাঁর মতে, ক্ষতিপূরণ, জনঅর্থের ব্যবহার ও ইতিহাসের দায়বদ্ধতার কারণে দ্রুত বিভ্রান্তি দূর করে নির্ভুল তালিকা প্রকাশ করা প্রয়োজন।

সরকারের মন্ত্রী, রাজনৈতিক দলের নেতা এবং সরকারি–বেসরকারি বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন জুলাই আন্দোলনে শহীদের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিচ্ছেন। কেউ বলছেন, দেড় হাজার, দুই হাজার আবার কেউ বলছেন হাজার হাজার মানুষ শহীদ হয়েছেন।

জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। দায়িত্ব নেওয়ার পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া একাধিক ভাষণে জুলাই শহীদের সংখ্যা কোথাও হাজার, কোথাও দেড় হাজার আবার কোথাও হাজার হাজার হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

জুলাই শহীদের সংখ্যা হিসেবে সবেচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ‘১ হাজার ৪০০’ এবং ‘২ হাজারের বেশি’। এর মধ্যে ১ হাজার ৪০০ সংখ্যাটি জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের বরাতে ব্যবহার করা হয়।

জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে গত বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) তথ্যানুসন্ধানী দলের প্রতিবেদনে বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত বিক্ষোভ–সংশ্লিষ্ট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াতে পারে ১ হাজার ৪০০ জনে।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে হতাহত ব্যক্তিদের জন্য গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে গঠন করা হয় জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন। এটি সরকার অনুমোদিত অরাজনৈতিক, স্বেচ্ছাসেবা ও জনকল্যাণমূলক বেসরকারি সংস্থা। ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইটের হোম পেজে শহীদের সর্বশেষ সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে ৮২০ জনের বেশি। আর ওয়েবসাইটে শহীদের যে তালিকা রয়েছে, সেখানে ৮৩৫ জনের নাম রয়েছে।

অন্যদিকে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদের সংখ্যা নিয়ে একটি তালিকা প্রকাশ করে ‘জুলাই রেভল্যুশনারি অ্যালায়েন্স’ নামের একটি সংগঠন। তাদের দাবি, শহীদের সংখ্যা দেড় হাজারের বেশি। আর তারা তালিকা করেছে ৬৫০ জনের।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থান অধিদপ্তর সূত্র বলছে, এ মুহূর্তে তাদের কাছে আর কোনো জুলাই শহীদবিষয়ক আবেদন নেই। তবে জুলাই আহতদের তালিকায় আরও ১ হাজারের বেশি নাম যুক্ত হবে। তালিকায় থাকা শহীদের সংখ্যা কমতে পারে জানিয়ে ওই সূত্র বলছে, অধিদপ্তরে জনবলসংকটের কারণে অনেক কাজই সময়মতো শেষ করা যাচ্ছে না। চূড়ান্ত তালিকা কবে নাগাদ হবে তারও নিশ্চয়তা দিতে পারেনি অধিদপ্তর।

জানতে চাইলে জুলাই গণ–অভ্যুত্থান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আনোয়ারুল নাসের প্রথম আলোকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যাচাই-বাছাই কার্যক্রম বন্ধ রাখার বিষয়ে একটি পরিপত্র জারি হয়েছিল। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হবে। এ জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি বৈঠক করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। সূত্র, প্রথম আলো