সময়ের জনমাধ্যম

৯/১১-এর ২৫ বছর: ৪ উড়োজাহাজে ১৯ ছিনতাইকারীর হামলায় বদলে যায় বিশ্ব

Last Updated on 28 seconds by zajira news

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, জাজিরা নিউজ: সময়টা তখন সকাল ৮টা ৪৬ মিনিট। ঠিক এর আগমুহূর্ত পর্যন্তও নিউইয়র্ক ছিল আর দশটা দিনের মতোই—অফিসগামী মানুষের ঢল, স্কুলে যাওয়ার তাড়ায় ব্যস্ত শিশু, রাস্তায় গাড়ির জট। কেউ জানতেন না, পরের কয়েক মিনিটেই ইতিহাসের গতিপথ চিরকালের জন্য বদলে যাবে।

এরপর যা ঘটেছিল, তা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ভূগোল আর রাজনীতিই বদলায়নি—বদলে দিয়েছে গোটা বিশ্বের নিরাপত্তা-দৃষ্টিভঙ্গি, ধর্মীয় সহাবস্থানের সমীকরণ, এমনকি কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন। ২৫ বছর আগে ২০০১ সালের আজকের দিনের (১১ সেপ্টেম্বর) সেই ভয়াবহ সকালের রেশ এখনো টাটকা। আজও প্রতিবছর নিউইয়র্কে নিহত ব্যক্তিদের নাম পড়া হয়, নীরবতা পালন করা হয়, বিশ্বজুড়ে আলোচনা চলে ঘটনার আড়ালে চাপাপড়া সত্যিটা নিয়ে। প্রশ্ন একটাই—সেদিন আসলেই কী ঘটেছিল?

যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলের সময় অনুযায়ী সকাল ৮টা ৪৬ মিনিট। আমেরিকান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ১১ হঠাৎ আছড়ে পড়ে নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের নর্থ টাওয়ারে। প্রথম মুহূর্তে অনেকেই ভেবেছিলেন, এটি নিছক দুর্ঘটনা। কিন্তু ঠিক ১৭ মিনিট পর, সকাল ৯টা ৩ মিনিটে, ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ১৭৫ আছড়ে পড়ে সাউথ টাওয়ারে। এ দ্বিতীয় আঘাতেই গোটা বিশ্ব বুঝে যায়—এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং সুপরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলা।

নর্থ টাওয়ারে আঘাতের পরপরই আকাশে দেখা যায় আগুনের বিশাল কুণ্ডলী, শহরজুড়ে নেমে আসে ধুলার আস্তরণ। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছিলেন, ভবন থেকে মানুষ লাফিয়ে পড়ছিল, রাস্তায় ধুলোয় ঢাকা মানুষ ছুটে পালাচ্ছিল, চারদিকে শুধু আর্তচিৎকার। আহত ও নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন অফিসকর্মী, পর্যটক, এমনকি স্কুলশিশুও।

এভাবে বিপদ যখন একের পর এক নেমে আসছিল, তখন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট ছিল একেবারেই স্বাভাবিক। প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ তখন ক্ষমতায় মাত্র ৯ মাস, নিউইয়র্কের মেয়র রুডি জুলিয়ানির মেয়াদও শেষের পথে। বেসবল তারকা ডেরেক জিটার তখনো নিউইয়র্ক ইয়াঙ্কিজের অধিনায়ক, যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় গানের সাপ্তাহিক তালিকা ‘বিলবোর্ড হট ১০০’–এর শীর্ষে জেনিফার লোপেজ ও জা রুলের গান ‘আই’ম রিয়েল’।

ঘটনাক্রমে সেদিন ছিল নিউইয়র্ক শহরের প্রাইমারি নির্বাচনের দিনও। সকাল ছয়টায় ভোটকেন্দ্র খোলার কয়েক ঘণ্টা পরই ঘটে এ ট্র্যাজেডি। সেদিনের প্রতিটি মুহূর্তই ছিল আতঙ্কের। চারটি উড়োজাহাজ একযোগে ছিনতাই হয়েছিল, আর প্রতিটির গন্তব্য ছিল আলাদা। ঘটনাপ্রবাহ ছিল অনেকটা এমন—

– সকাল ৭টা ৫৯ মিনিট: বোস্টনের লোগান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৭৬ যাত্রী, ১১ ক্রু এবং ৫ ছিনতাইকারীসহ উড়াল দেয় আমেরিকান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ১১।

– সকাল ৮টা ১৫ মিনিট: একই বিমানবন্দর থেকে ৫১ যাত্রী, ৯ ক্রু ও ৫ ছিনতাইকারী নিয়ে উড়াল দেয় ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ১৭৫।

– সকাল ৮টা ২০ মিনিট: ওয়াশিংটনের ডালেস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৫৩ যাত্রী, ৬ ক্রু ও ৫ ছিনতাইকারী নিয়ে ওড়ে আমেরিকান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৭৭।

– সকাল ৮টা ৪২ মিনিট: নিউ জার্সির নিউয়ার্ক লিবার্টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৩৩ যাত্রী, ৭ ক্রু ও ৪ ছিনতাইকারী নিয়ে ওড়ে ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৯৩।

– সকাল ৮টা ৪৬ মিনিট: ফ্লাইট ১১ আছড়ে পড়ে নর্থ টাওয়ারে।

– সকাল ৯টা ৩ মিনিট: ফ্লাইট ১৭৫ আছড়ে পড়ে সাউথ টাওয়ারে।

– সকাল ৯টা ৩৭ মিনিট: ফ্লাইট ৭৭ আঘাত হানে পেন্টাগনে।

– সকাল ৯টা ৫৯ মিনিট: ধসে পড়ে সাউথ টাওয়ার।

– সকাল ১০টা ৩ মিনিট: ফ্লাইট ৯৩ পেনসিলভানিয়ার একটি মাঠে বিধ্বস্ত হয়।

– সকাল ১০টা ২৮ মিনিট: ধসে পড়ে নর্থ টাওয়ার।

উল্লেখ্য, চতুর্থ উড়োজাহাজ ‘ফ্লাইট ৯৩’–এর লক্ষ্য ছিল ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল ভবন—মার্কিন কংগ্রেসের প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু যাত্রী ও ক্রুরা সাহস দেখিয়ে ছিনতাইকারীদের প্রতিরোধ করায় উড়োজাহাজটি লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি, বরং পেনসিলভানিয়ার শ্যাঙ্কসভিলের কাছে একটি ফাঁকা মাঠে বিধ্বস্ত হয়।

ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার চত্বরে শুধু জোড়া টাওয়ারই নয়, ধ্বংস হয়েছিল আরও পাঁচটি ভবন। ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কারের কাজ চলে মাসের পর মাস, আনুষ্ঠানিকভাবে সর্বশেষ স্টিলের টুকরো সরানো হয় ২০০২ সালের ৩০ মে। এসব হামলায় নিহত হন মোট ২ হাজার ৯৭৭ জন। তাঁরা ছিলেন বিশ্বের ৯০টি দেশের। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২ হাজার ৭৫৩ জন প্রাণ হারান নিউইয়র্কে, পেন্টাগনে ১৮৪ জন, আর পেনসিলভানিয়ায় ৪০ জন।

ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার তখন যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শক্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো, আর টুইন টাওয়ার ছিল শহরের সবচেয়ে উঁচু ভবন। হামলার সময় এ ভবন কমপ্লেক্সে ১৬ হাজার ৪০০ থেকে ১৮ হাজার মানুষ অবস্থান করছিলেন বলে মনে করা হয়। নর্থ টাওয়ারে হামলায় কেউ বাঁচতে পারেননি, তবে সাউথ টাওয়ারের ওপরের তলা থেকে ১৮ জন বেঁচে যান।

১৯৪১ সালে পার্ল হারবারে জাপানি হামলায় প্রায় ২ হাজার ৪০০-এর বেশি মার্কিন নাগরিক নিহত হওয়ার পর, ৯/১১-ই যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ঘটা সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে চিহ্নিত হয়। শুধু মহামারি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগই এর চেয়ে বেশি মার্কিন নাগরিকের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার এর আগেও একবার হামলার শিকার হয়েছিল। ১৯৯৩ সালে ভবনের নিচে একটি ভ্যানে বোমা বিস্ফোরণে ছয়জন নিহত ও বহু মানুষ আহত হন। ৯/১১ হামলায় নিহত হয়েছিলেন ১৯ হামলাকারীও। শুধু ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে দুটি বিমান হামলায় প্রাণ হারান ২ হাজার ৭৫৩ জন। আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধার করতে গিয়ে প্রাণ যায় ৩৪৩ ফায়ার সার্ভিসের কর্মী ও ৬০ পুলিশ সদস্যের।

শুধু তাৎক্ষণিক মৃত্যুই নয়, এ হামলার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিও ছিল ভয়াবহ। ধ্বংসস্তূপ থেকে ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত ধুলার কারণে বহু মানুষ পরবর্তী বছরগুলোতে ক্যানসার ও শ্বাসতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি অসুখে আক্রান্ত হন। নিউইয়র্ক সিটির স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গ্রাউন্ড জিরোতে কাজ করা প্রায় ১০ হাজার ফার্স্ট রেসপন্ডার পরবর্তী সময়ে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন।

এ ভয়াবহ হামলার নেপথ্যে ছিল চরমপন্থী সংগঠন আল-কায়েদা। এটির জন্ম ১৯৮০-এর দশকে আফগানিস্তানে, তৎকালীন সোভিয়েত বাহিনীর আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে। ১৯৯০-এর দশক থেকে সংগঠনটি বৈশ্বিক পরিসরে হামলা চালাতে শুরু করে। ১৯৯৩ সালে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে প্রথম বোমা হামলার পেছনেও ছিল তাদের হাত, এমনটাই মনে করা হয়। এরপরের বছরগুলোতে বিভিন্ন দেশে হোটেল, দূতাবাস ও জাহাজে হামলা চালায় সংগঠনটি। কিন্তু ৯/১১ ছিল তাদের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে সুপরিকল্পিত অভিযান।

হামলার পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে কেউ কেউ ছিলেন মার্কিন নাগরিক বা গ্রিন কার্ডধারী, যা তাঁদের যুক্তরাষ্ট্রে অবাধে প্রবেশ ও ফ্লাইট প্রশিক্ষণ স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ করে দেয়। মনে করা হয়, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি, বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও আগ্রাসী ইসরায়েলকে দিয়ে চলা অব্যাহত সমর্থনের প্রতিশোধ নেওয়াই ছিল এসব হামলার মূল উদ্দেশ্য।

দীর্ঘ প্রায় এক বছর ধরে পরিকল্পনাকারীরা যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করে উড়োজাহাজ চালানোর প্রশিক্ষণ নেন এবং লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করেন। তাঁরা এতটাই নিখুঁতভাবে মার্কিন সমাজে মিশে গিয়েছিলেন যে স্থানীয় প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কর্মীরাও কিছু সন্দেহ করেননি।

ঘটনার দিন হামলাকারীরা ধারালো অস্ত্র ও বক্স-কাটার ব্যবহার করে উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেন। প্রতিটি উড়োজাহাজ দূরপাল্লার যাত্রার জন্য পূর্ণ জ্বালানি নিয়ে উড়ছিল বলে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড ছিল আরও ভয়াবহ। তবে ফ্লাইট ৯৩-এর যাত্রীরা যেভাবে সাহস দেখিয়ে ককপিটে প্রবেশের চেষ্টা করেছিলেন, তাতে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হোয়াইট হাউস বা ক্যাপিটল ভবন রক্ষা পায়।

উড়োজাহাজের নিরাপত্তাব্যবস্থায় থাকা ফাঁকফোকর, সীমিত স্ক্যানিং–সুবিধা এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময়ে দুর্বলতা—এসবই হামলাকারীদের সুযোগ করে দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে গঠিত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনেও উঠে আসে, গোয়েন্দা তথ্য সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে হয়তো এ হামলা ঠেকানো সম্ভব ছিল।

হামলার ঠিক পরপরই যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত মুসলিম ও আরব বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিকদের জীবনে নেমে আসে নতুন সংকট। বহু মসজিদে আগুন দেওয়া হয় বা ভাঙচুর করা হয়, মুসলিমদের ওপর নেমে আসে হত্যার হুমকি ও হয়রানি। ২০১১ সালে মার্কিন কংগ্রেসে দেওয়া সাউদার্ন পোভার্টি ল সেন্টারের সাক্ষ্য অনুযায়ী, শুধু মুসলিম বলে মনে হওয়ার কারণেই অনেককে মারধর, আক্রমণ এমনকি বন্দুকের মুখে ফেলা হয়েছিল।

মিনেসোটার ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমর ৯/১১ ও এর পরবর্তী বৈষম্য নিয়ে এবিসি নিউজকে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী হিসেবে তাঁরাও (মুসলিমরা) সেদিন আক্রান্ত হয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, ‘এ দেশ, এ কমিউনিটি তাঁদেরও। হামলায় মুসলিম ফায়ার সার্ভিসের কর্মীসহ বহু মুসলিম নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন।’

মার্কিন কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোর (এফবিআই) তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণাজনিত অপরাধ বেড়ে যায় প্রায় ১৬১৭ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ইসলামভীতি থেকে সৃষ্ট ঘৃণামূলক অপরাধের অন্যতম সর্বোচ্চ সংখ্যা এটি। এমন অপরাধের ঘটনা ২০০০ সালে ছিল ২৮টি। ২০০১ সালে তা একলাফে বেড়ে দাঁড়ায় ৪৮১টিতে।

হামলার ছয় দিন পর, ২০০১ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর, তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ওয়াশিংটনের ইসলামিক সেন্টারে গিয়ে মুসলিমবিরোধী ঘৃণাকে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেছিলেন, ‘সন্ত্রাস ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা নয়। ইসলাম মানে শান্তি, আর সন্ত্রাসীরা শান্তির প্রতিনিধিত্ব করে না। তারা প্রতিনিধিত্ব করে অশুভ শক্তি ও যুদ্ধের।’

সে সময়ের পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপ বলছে, হামলার পরও যুক্তরাষ্ট্রের ৫৯ শতাংশ মানুষ মুসলিম মার্কিনদের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন, যদিও ৪০ শতাংশ মানুষ মনে করতেন, হামলাকারীরা অন্তত আংশিকভাবে ধর্মীয় কারণেই এ হামলা চালিয়েছিলেন।

কিন্তু যাঁরা মুসলিমদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন, তাঁরা আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন—যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে মুসলিমদের নিশানা করে বোমা হামলার হুমকি, অগ্নিসংযোগ ও হামলা তখন খবরের শিরোনামে পরিণত হয়।

মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের আরব আমেরিকান স্টাডিজ সেন্টারের পরিচালক স্যালি হাওয়েল বলেন, ৯/১১ পরবর্তী সময়ে মুসলিম ও সন্ত্রাসবাদ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এতটাই ভয় তৈরি হয়েছিল যে সন্ত্রাস মোকাবিলার নামে নাগরিকদের ওপর নজরদারি, হয়রানি ও ফাঁদে ফেলার মতো নতুন নতুন সুযোগ তৈরি করা হয়। বছর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ইসলামবিদ্বেষী তথা ঘৃণামূলক অপরাধের সংখ্যা কমেছিল, পরে আবার বেড়ে যায়। কিন্তু তত দিনে ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলের ইসলামোফোবিয়া রিসার্চ অ্যান্ড ডকুমেন্টেশন প্রকল্পের প্রধান হাতেম বাজিয়ান জানান, তাঁদের এক জরিপে প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ জানিয়েছিলেন, পশ্চিমা বিশ্বে মুসলিম হিসেবে বসবাস করা অবস্থায় তাঁরা নিজেদের পরিবার ও সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে অন্তত কিছুটা হলেও উদ্বিগ্ন থাকেন।

প্রতিটি নির্বাচনী মৌসুমে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত মুসলিমদের মধ্যে এ নিরাপত্তাহীনতা আরও বেড়ে যায়। ইসলামভীতি ক্রমেই পরিণত হয় একটি রাজনৈতিক হাতিয়ারে।প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বেশ কিছু পরিচিত মুখ ও গণমাধ্যম ভাষ্যকার মুসলিম এবং আরব মার্কিনদের নিয়ে ভয় উসকে দিয়ে নিজেদের সমর্থকগোষ্ঠীকে আরও উজ্জীবিত করার চেষ্টা করেন।

খ্রিষ্টান হওয়া সত্ত্বেও সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বিরুদ্ধে দুই মেয়াদেই মুসলিমবিরোধী বাগাড়ম্বর ব্যবহার করা হয়েছিল। তাঁর জন্মস্থান ও ধর্ম নিয়ে বর্ণবাদী এবং জেনোফোবিক (বিদেশি বা ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের প্রতি ভয়/বিদ্বেষ) গুজব ছড়িয়ে তাঁর প্রতি অবিশ্বাস তৈরির চেষ্টা হয়েছিল।

বিরোধীরা মিথ্যা দাবি করেছিলেন যে ওবামা যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ না করায় প্রেসিডেন্ট হওয়ার যোগ্যই নন অথবা তিনি গোপনে ইসলাম ধর্ম পালন করেন। যদি তা সত্যও হতো, তবু প্রেসিডেন্ট হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা তৈরি করত না।হাতেম বাজিয়ানের ভাষায়, ওবামাকে গোপন মুসলিম হিসেবে তুলে ধরে ইসলামভীতিকে ভোটের বাক্সে রূপান্তরিত করা হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৬ সালের নির্বাচনী মৌসুমেও মুসলিমবিরোধী মনোভাব অব্যাহত ছিল। সে সময় ইসলামভীতিজনিত ঘৃণামূলক অপরাধ আবার বেড়ে যায়। এফবিআইয়ের হিসাবে ২০০১ সালে এমন ঘটনা ঘটেছিল ৪৮১টি, যা পরের বছরই কমে দাঁড়ায় ১৫৫টিতে। এরপর ২০১৫ সালে তা আবার বেড়ে হয় ২৫৭, আর ২০১৬ সালে ৩০৭। অবশ্য, এর পর থেকে এ সংখ্যা ক্রমশ কমেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রাজনৈতিক অঙ্গনে ছড়ানো মুসলিমবিরোধী বক্তব্যের সঙ্গে এই ঘৃণা বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। নিজের প্রথম দফার নির্বাচনী প্রচারজুড়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসলাম ধর্ম ও মুসলিমদের সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিলেন, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

আদালতে এ পদক্ষেপ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, শেষ পর্যন্ত ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্ট এর একটি সংশোধিত সংস্করণ বহাল রাখে। এ নিষেধাজ্ঞা প্রভাবিত করেছে ইরান, সোমালিয়া, ইয়েমেন, সিরিয়া ও লিবিয়ার মতো মুসলিম-অধ্যুষিত দেশের ভ্রমণকারী ও অভিবাসীদের। সঙ্গে যুক্ত হয় উত্তর কোরিয়া এবং ভেনেজুয়েলার কিছু নাগরিকও, আর ২০২০ সালে আরও কয়েকটি দেশ এ তালিকায় যুক্ত হয়।

২০১৭ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত, প্রেসিডেন্ট বাইডেন নিষেধাজ্ঞাটি বাতিল করার আগপর্যন্ত—মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগে তথ্য অনুযায়ী, এর কারণে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধার মুখে পড়েন। ট্রাম্প ও তাঁর সমর্থকেরা এ আদেশকে ইসলামভীতিমূলক বলার বিরোধিতা করে দাবি করেন, ‘এটি ছিল সন্ত্রাস থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে রক্ষা করার পদক্ষেপ।’

তবে অধিকারকর্মীরা মনে করেন, এখন আর কার্যকর না থাকলেও এ আদেশ মুসলিমদের প্রতি ঘৃণা ও ভয়কে বৈধতা দিয়েছিল, যা যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন ও জীবনযাপন তাঁদের জন্য আরও কঠিন করে তুলেছিল। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমরা থেমে থাকেননি। ধীরে ধীরে তাঁরা সরকারে, টেলিভিশনে ও জনজীবনের নানা ক্ষেত্রে প্রতিনিধিত্ব অর্জন করেছেন।

২০০৭ সালে প্রথম মুসলিম হিসেবে কংগ্রেসে নির্বাচিত হন মিনেসোটার ডেমোক্র্যট প্রতিনিধি কিথ এলিসন। এরপর ২০১৮ সালে ভোটাররা প্রথমবারের মতো দুজন মুসলিম নারীকে কংগ্রেসে পাঠান—ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি ইলহান ওমর ও রশিদা তালিব।

রশিদা তালিব এবিসি নিউজকে বলেছিলেন, তাঁর মুসলিম পরিচয় ও পটভূমি তাঁকে বুঝতে সাহায্য করে ইসলামভীতি ও জেনোফোবিয়া থেকে কী ক্ষতি হতে পারে। তাঁর ভাষায়, ‘শুধু ধর্মের ভিত্তিতে মানুষকে নিশানা করলে, দেশ আরও অনিরাপদ হয়ে ওঠে এবং তা ঘৃণা ও বর্ণবাদকেই আরও উসকে দেয়।’

পিউ রিসার্চ সেন্টারের হিসাবে, যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম জনসংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। ২০২০ সালে তা প্রায় ৩৮ লাখ ৫০ হাজারে পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হয়। গত ২০ বছরে দেশজুড়ে মসজিদও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মীয় সম্প্রদায় নিয়ে গবেষণা করা সংগঠন কো–অপারেটিভ কংগ্রেগেশনাল স্টাডিজ পার্টনারশিপের (সিসিএসপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে মসজিদের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ২০৯টি। তা ২০২০ সালে দ্বিগুণের বেশি বেড়ে দাঁড়ায় অন্তত ২ হাজার ৭৬৯টিতে। হাতেম বাজিয়ানের মতে, পশ্চিমা বিশ্বে ইসলামকে যেভাবে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরা হয়, বাস্তবতা তার থেকে অনেক দূরে।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপ বলছে, বেশির ভাগ মার্কিন কোনো মুসলিমকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না অথবা তাঁদের সম্পর্কে তেমন কিছু জানেন না বলে স্বীকার করেন। প্রতিষ্ঠানটির জ্যেষ্ঠ গবেষক বশির মোহাম্মদের মতে, যাঁরা ব্যক্তিগতভাবে কোনো মুসলিমকে চেনেন, তাঁদের মধ্যে ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি তুলনামূলক বেশি ইতিবাচক থাকে।

স্যালি হাওয়েল বলেন, মুসলিমদের এভাবে আড়ালে থাকাই ইসলামভীতিকে শক্তি জোগায়। মুসলিমরা যখন তাঁদের প্রতিষ্ঠান, নাম, হিজাব কিংবা রেস্তোরাঁর হালাল সাইনবোর্ডের মাধ্যমে অমুসলিমদের কাছে দৃশ্যমান হয়ে ওঠেন, তখনই লোকজন বুঝতে পারেন, তাঁদের সহকর্মী বা প্রতিবেশীরাও আসলে মুসলিম—আর এতেই কাটতে শুরু করে অজানা ভয়।

বিশ্ব যখন ৯/১১-এর স্মৃতিচারণায় ব্যস্ত, তখন নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে একটি দাবি। মার্কিন সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার টাকার কার্লসন সম্প্রতি দাবি করেছেন, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা ৯/১১ হামলা সংঘটিত হওয়ার আগেই এ সম্পর্কে জানত। একটি প্রামাণ্যচিত্র সিরিজে তিনি এ বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার বাইরে থাকা নানা তথ্যও সামনে এনেছেন।

ব্রিটিশ সাংবাদিক, টেলিভিশন উপস্থাপক ও লেখক পিয়ার্স মরগানের অনুষ্ঠান ‘আনসেন্সরড নিউজ’-এ কার্লসন বলেন, ইসরায়েলের নেতৃত্ব কখনোই ৯/১১ হামলা নিয়ে তাদের মনোভাব লুকায়নি; বরং তাদের ধারণা ছিল, এ হামলা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ককে আরও গভীর করে তুলেছে।

কার্লসন স্পষ্ট করে বলেন, তিনি কখনোই দাবি করেননি যে ইহুদিরা এ হামলা চালিয়েছে; বরং তাঁর ভাষ্য, এমন অভিযোগ তোলা আসলে প্রকৃত প্রশ্নগুলো ধামাচাপা দেওয়ার একটি কৌশল, যা সত্যিকারের অনুসন্ধানকে দুর্বল করে দেয়।

কার্লসন উল্লেখ করেন, হামলার পরপরই ইসরায়েলি নেতা (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ক্যামেরার সামনে বলেছিলেন, ‘এ ঘটনা আসলে ভালো। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র এমন এক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে, যেখানে ইসরায়েল কয়েক দশক ধরে অস্তিত্বের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।’ তিনি ৯/১১ হামলার সঙ্গে পার্ল হারবারে জাপানি হামলার তুলনাও করেছিলেন।

কার্লসন এ প্রসঙ্গে বহুল আলোচিত ‘ইসরায়েলি আর্ট স্টুডেন্টস’ ইস্যুও সামনে আনেন, যা নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে খুবই সীমিত ধারণা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর কথায়, যুক্তরাষ্ট্রে এ তথাকথিত শিল্পশিক্ষার্থীদের কেউ কেউ প্রকৃতপক্ষে শিল্পশিক্ষার্থী ছিলেন না, বরং ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের যুক্তরাষ্ট্রে গ্রেপ্তার করে কিছুদিন আটকে রাখা হলেও পরে কোনো অভিযোগ ছাড়াই ছেড়ে দেওয়া হয়। কার্লসন দাবি করেন, এফবিআইয়ের নথি অনুযায়ী ওই শিক্ষার্থীদের কয়েকজন হামলার দৃশ্য ধারণ করেছিলেন এবং দৃশ্যত হামলার বিষয়ে আগে থেকেই তাঁদের ধারণা ছিল।

এই ‘ইসরায়েলি আর্ট স্টুডেন্টস’-এর প্রথম খোঁজ পাওয়া যায় ২০০০ সালের শেষ দিকে, যখন তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সামরিক স্থাপনায় হাজির হতে শুরু করেন। সেখানে তাঁরা ছবি বিক্রি ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করতেন। তাঁরা বারবার এমন সব স্থাপনায় যাতায়াত করতেন, যেখানে সাধারণত সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার থাকে না, এমনকি কোনো কোনো সামরিক কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বাড়িতেও তাঁদের দেখা গেছে।

ওই সময়কার গণমাধ্যম প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০১ সালের শুরু থেকে হামলার আগপর্যন্ত এমন কর্মকাণ্ডের অভিযোগে অন্তত ১৪০ জন ইসরায়েলি নাগরিককে আটক করা হয়। হামলার পর আটক করা হয় আরও প্রায় ৬০ জনকে। অভিযোগ আছে, এ দলের কিছু সদস্য হামলাকারীদের আবাসস্থলের কাছাকাছি এলাকায় বাড়ি ভাড়াও নিয়েছিলেন।

৯/১১-এর পরপরই জর্জ ডব্লিউ বুশ তথাকথিত ‘ওয়ার অন টেরর’ বা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দেন।

২০০১ সালের ৭ অক্টোবর আফগানিস্তানে শুরু হয় ‘অপারেশন এনডিউরিং ফ্রিডম’। এ সামরিক অভিযানে তালেবান ক্ষমতাচ্যুত হলেও যুদ্ধ চলতে থাকে বহু বছর।

২০০৩ সালে ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ থাকার অজুহাতে ইরাকেও যুদ্ধ শুরু করে মার্কিন বাহিনী। দেশটির অভ্যন্তরে বিমানবন্দর ও সীমান্তে নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও কঠোর করা হয়। চালু করা হয় প্যাট্রিয়ট অ্যাক্ট, যার মাধ্যমে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও নাগরিকদের ওপর নজরদারির নিয়ম আরও জোরদার হয়।

৯/১১-এর প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে গোটা বিশ্বে। ২০ বছর পর মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর হাতে ক্ষমতাচ্যুত তালেবানই ২০২১ সালে আবারও আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ফিরে আসে। এক অভূতপূর্ব ও ঝোড়ো গতির অভিযানে পশ্চিমা-সমর্থিত দুর্নীতিবাজ আশরাফ গনি সরকারকে হটিয়ে দিয়ে।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষত ইরাক ও সিরিয়ায় বেড়ে যায় অস্থিতিশীলতা। ন্যাটো ও জাতিসংঘ যুক্তরাষ্ট্রের ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ অভিযানে সমর্থন জোগায়, গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি করে এবং সামরিক সহায়তা দেয়। ৯/১১-এর পর বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭০টির বেশি দেশ তাদের সন্ত্রাসবিরোধী আইন শক্তিশালী করে এবং সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি করে। হামলার আর্থিক ক্ষতিও ছিল বিশাল। যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে দেখা দেয় বড় ধরনের পতন, বিমা খাতে হয় বিপুল ক্ষতি, দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে বিমান ও পর্যটন খাতে।

নিউইয়র্ক সিটির অবকাঠামোগত ক্ষতির পরিমাণ ছাড়িয়ে যায় ৬০ বিলিয়ন (৬ হাজার কোটি) ডলার। শুধু গ্রাউন্ড জিরো থেকে ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করতেই ব্যয় হয় ৭৫০ মিলিয়ন (৭৫ কোটি) ডলার। ক্ষতিপূরণ তহবিল থেকে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারের জন্য বিতরণ করা হয় ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ। হামলার পরের তিন মাসেই নিউইয়র্ক সিটির অর্থনীতি হারায় প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার চাকরি।

আল-কায়েদার তৎকালীন প্রধান ওসামা বিন লাদেন আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্ত এলাকায় প্রায় এক দশক ধরে আত্মগোপনে ছিলেন। ২০১১ সালে মার্কিন নেভি সিল বাহিনী পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে এক বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাঁকে হত্যা করে। বিন লাদেনকে হত্যার ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ অভিযানের এক বড় প্রতীকী বিজয় হিসেবে দেখানো হলেও, যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা বিশ্বেই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রবণতা থেমে যায়নি। দেশে দেশে এখনো নামে-বেনামে সন্ত্রাসীরা রয়েছে সক্রিয়।

দুটি টাওয়ার ধসে পড়তে সময় লেগেছিল মাত্র কয়েক ঘণ্টা, কিন্তু তার রেশ বয়ে বেড়াচ্ছে পুরো একটি প্রজন্ম। ৯/১১ শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের কালো দিন নয়—এটি বদলে দিয়েছে গোটা বিশ্বের নিরাপত্তাদর্শন, রাজনীতির ভাষা, এমনকি মানুষে মানুষে আস্থার সমীকরণও।

আর ঠিক যখন মনে হচ্ছিল ৯/১১-এর গল্প বলা শেষ, তখনই সামনে এসেছে এ হামলা নিয়ে ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের আগাম জানাশোনার চাঞ্চল্যকর দাবি। এটা প্রমাণ করে, এ হামলার পেছনের প্রকৃত সত্য নিয়ে প্রশ্নের শেষ নেই, বরং তা সময়ে সময়ে নিচ্ছে নতুন মোড়। এখানেই উঠে আসে এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন—আফগানিস্তান থেকে ইরাক, লিবিয়া থেকে সিরিয়া, আর এখন ইরান পর্যন্ত বিস্তৃত এক দীর্ঘ যুদ্ধ ও ইসলামভীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কি নিজেই নিজের পাতা ফাঁদে আটকে পড়ল?

[তথ্যসূত্র: এবিসি নিউজ, ‘টুয়েন্টি ইয়ার্স আফটার নাইন/ইলেভেন, ইসলামোফোবিয়া কন্টিনিউস টু হান্ট মুসলিমস’ সেপ্টেম্বর ১১, ২০২১; সিবিএস, ‘নিউইয়র্ক সিটি চেঞ্জড ফরএভার অন নাইন/ইলেভেন, এ লুক ব্যাক অ্যাট হোয়াট আনফোল্ডেড’, সেপ্টেম্বর ১১, ২০২৫ ও আরটি]