সময়ের জনমাধ্যম

ফ্ল্যাট কিনবেন নাকি অন্য কোথাও বিনিয়োগ করবেন ?

Last Updated on 29 seconds by zajira news

অনলাইন ডেস্ক, জাজিরা নিউজ: রাজধানীর বছিলায় ফ্ল্যাটের বুকিং দিয়েছেন চাকরিজীবী এ কে এম আজহার। খুব মোটা বেতনের চাকরি করেন না তিনি। সংসারে তিনিই একমাত্র উপার্জনশীল। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে তাঁর পরিবার।

ফ্ল্যাট কেনার জন্য একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে ৫ বছরের মেয়াদে ২০ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন আজহার। এখনো নিজের ফ্ল্যাটে উঠতে পারেননি। কিন্তু প্রতি মাসে ৪৫ হাজার ২৫০ টাকা করে ঋণের কিস্তি দিতে হচ্ছে। ঋণের মেয়াদ কম হওয়ায় কিস্তির পরিমাণও বেশি হয়েছে। ফলে তাঁর মাসিক আয়ের বড় অংশ চলে যাচ্ছে ঋণের কিস্তিতে। এর সঙ্গে আছে বর্তমান বাসার ভাড়া ও সংসারের অন্যান্য খরচ।

আজহারের মতো অনেকের কাছেই নিজের একটি ফ্ল্যাট থাকা জীবনের অন্যতম বড় লক্ষ্য। এর বাস্তবতাও আছে। কিন্তু বিনিয়োগের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি একটু ভিন্ন। নিজের বসবাসের জন্য ফ্ল্যাট কেনা আর বিনিয়োগ হিসেবে ফ্ল্যাট কেনা—দুটি বিষয় এক নয়। বিনিয়োগের দৃষ্টিকোণ থেকে তাই দেখা উচিত, ফ্ল্যাট কেনার মধ্য দিয়ে অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার হচ্ছে কি না।

ধরা যাক, আপনি রাজধানীতে মাসে ৪০ হাজার টাকার ভাড়া বাসায় থাকেন। আপনার কোনো ঋণ নেই এবং দীর্ঘদিনের সঞ্চয় হিসেবে হাতে আছে ৫০ লাখ টাকা। এখন আপনি চাইলে এই টাকা দিয়ে ফ্ল্যাট কেনার উদ্যোগ নিতে পারেন, বাকি টাকা নিতে হবে ব্যাংকঋণ হিসেবে।

ফ্ল্যাট কিনলে মাসে ৪০ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হবে না, বিষয়টি ঠিক এভাবে দেখা ঠিক নয়; বরং দেখতে হবে, ফ্ল্যাট কেনার জন্য যে টাকা ব্যয় করছেন, তা অন্য কোনো খাতে বিনিয়োগে করলে কত আয় হতে পারত। একই সঙ্গে ঋণের সুদ, কিস্তি, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, কর ও অন্যান্য খরচও হিসাবের মধ্যে আনতে হবে।

এই বিষয়টি অর্থনীতিতে অপরচুনিটি কস্ট হিসেবে পরিচিত। অর্থাৎ, এক জায়গায় টাকা খরচ করার কারণে অন্য জায়গায় টাকা বিনিয়োগ করে যে লাভ করতে পারছেন না বা যেটা আপনাকে ছেড়ে দিতে হচ্ছে, সেটিও বিবেচনায় আনা দরকার।

ধরা যাক, ঢাকায় একটি ফ্ল্যাট কিনতে আপনার এক কোটি টাকা লাগবে। একই ধরনের ফ্ল্যাট ভাড়া ও গ্যারেজভাড়াসহ মাসে খরচ ৪০ হাজার টাকা। বছরে খরচ হবে ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এই হিসাব দেখে অনেকেই মনে করতে পারেন, কয়েক বছর এমন ভাড়া বাসায় থাকার চেয়ে ফ্ল্যাট কিনে ফেলাই ভালো।

কিন্তু এক কোটি টাকা দিয়ে ফ্ল্যাট না কিনে সেই অর্থ অন্য কোনো খাতে বিনিয়োগ করলে কী হতে পারে, তা–ও দেখতে হবে। গড়ে ৮ শতাংশ রিটার্ন বা মুনাফা পাওয়া গেলে ১ কোটি টাকা থেকে বছরে প্রায় ৮ লাখ টাকা আয় হতে পারে। অর্থাৎ, মাসে গড়ে প্রায় ৬৬ হাজার ৬৬৭ টাকা। অবশ্য ৮ শতাংশের কমবেশি হতে পারে।

অর্থাৎ, ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে আপনি বছরে ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা ভাড়া সাশ্রয় করছেন, আবার একই সঙ্গে ১ কোটি টাকা অন্য কোথাও বিনিয়োগ করে সম্ভাব্য যে আয় করতে পারতেন, তা হারাচ্ছেন। তাই ফ্ল্যাটের প্রকৃত আর্থিক সুবিধা বুঝতে হলে ভাড়া সাশ্রয়ের সঙ্গে বিনিয়োগের সম্ভাব্য আয়, এ দুয়ের তুলনা করতে হবে।

এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—ফ্ল্যাটের দাম ভবিষ্যতে কতটা বাড়বে। ফ্ল্যাটের দাম দীর্ঘ মেয়াদে বাড়লে মালিকের সম্পদের মূল্যও বাড়বে, কিন্তু তার নিশ্চয়তা নেই। এর মূল্য অনেকটাই নির্ভর করে কোন এলাকায় ফ্ল্যাট, ভবনের বয়স, নির্মাণমান, যোগাযোগব্যবস্থা, নগর উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ চাহিদার ওপর।

অন্যদিকে ভাড়া বাসায় থাকলে আপনার মূলধন ব্যবহারযোগ্য থাকে। প্রয়োজনে বিনিয়োগের ধরনে পরিবর্তন আনা যায়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টাকার মান কমে যায়, সেটাও বিবেচনায় রাখতে হবে। অন্যদিকে ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের অর্থ এক জায়গায় আটকে থাকে, জরুরি সময় তা দ্রুত নগদায়ন করা সহজ নয়।

ঋণ নিয়ে ফ্ল্যাট কিনলে হিসাব আরও জটিল হয়। ধরা যাক, আপনার হাতে ৫০ লাখ টাকা আছে এবং আরও ৫০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ১ কোটি টাকার ফ্ল্যাট কিনবেন। তখন ৫০ লাখ টাকা একবারে ফ্ল্যাটে চলে যাবে। পাশাপাশি প্রতি মাসে ঋণের কিস্তি দিতে হবে। এই ঋণের সুদ ফ্ল্যাটের প্রকৃত খরচ অনেকটাই বাড়িয়ে দেবে।

এ ক্ষেত্রে ফ্ল্যাটের সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে ঋণের মোট সুদও তুলনা করা প্রয়োজন। শুধু ফ্ল্যাটের দাম বাড়লেই যে বিনিয়োগে লাভ হবে, এমন নয়। কেনার সময় নিবন্ধন, কর, ফি, অন্যান্য ব্যয় ও মালিকানার সময় রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও মোট বিনিয়োগ ব্যয়ের অংশ।

তবে সব হিসাব টাকার অঙ্কে করা যায় না। নিজের বাড়িতে থাকার নিরাপত্তা, পছন্দমতো পরিবেশ তৈরির স্বাধীনতা, বাড়িওয়ালার সঙ্গে সম্পর্কের ঝামেলা না থাকা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী ঠিকানা—অনেকের কাছে এসবের গুরুত্ব আছে। অনেকে মনে করেন, অবসরজীবনের জন্য নিজের বাসা থাকা আর্থিক নিরাপত্তার অংশ। সার্বিকভাবে সম্পদ বাড়ে।

বিবেচনার বিষয় কী
ভাড়া দেব, নাকি কিস্তি দেব—নিজের থাকার জন্য ফ্ল্যাট কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এভাবে তুলনা করা ঠিক নয়। বিনিয়োগের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে যে বিষয়গুলো আমলে নিতে হবে, সেগুলো হলো—ফ্ল্যাটে বিনিয়োগ করলে সম্ভাব্য লাভ কত, বিকল্প বিনিয়োগে সম্ভাব্য লাভ কত, ঋণের খরচ কত এবং মূলধন আটকে গেলে কী হবে বা তার পরিণতি সহ্য করার ক্ষমতা আছে কি না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ফ্ল্যাট কেনার পরও হাতে পর্যাপ্ত জরুরি সঞ্চয় থাকবে কি না। পুরো সঞ্চয় ফ্ল্যাটে ঢেলে দিয়ে ঋণ নেওয়া হলে পরিবারের আর্থিক ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।

ফ্ল্যাট শেষ পর্যন্ত শুধু বিনিয়োগ নয়; একই সঙ্গে তা সম্পদও বটে। তাই সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আর্থিক রিটার্নের পাশাপাশি নিজের আয়, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও ঝুঁকি নেওয়ার সামর্থ্য বিবেচনায় রাখতে হবে। সূত্র, দৈনিক প্রথম আলো