সময়ের জনমাধ্যম

খ্রিস্টধর্ম প্রচার করতে সৌদি আরবে গিয়ে, ফিরলেন মুসলিম হয়ে

সিস্টার ডেইজি। ছবি সংগৃহীত

Last Updated on 2 hours by zajira news

ধর্ম ডেস্ক, জাজিরা নিউজ:ক্যাথলিক পরিবারে জন্ম, বোন সন্ন্যাসিনী, পরিবারের অন্য সদস্যরাও গির্জার সঙ্গে যুক্ত। শৈশব থেকেই ধর্মীয় পরিবেশে বেড়ে ওঠা সেই নারী একসময় খ্রিস্টধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছিলেন সৌদি আরবে।

কিন্তু সেখানে গিয়ে যিশু ও মরিয়ম (আ.) সম্পর্কে মুসলমানদের বিশ্বাস, পবিত্র কুরআনের বর্ণনা এবং পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত আজানের সুর তার মনে সৃষ্টি করে গভীর আলোড়ন। দীর্ঘ সাত বছরের সংগ্রাম, পারিবারিক বাধা ও নানা প্রশ্নের পথ পেরিয়ে একদিন আল্লাহর সামনে সিজদায় অবনত হন তিনি। এটি সিস্টার ডেইজির ইসলাম গ্রহণের এক আত্মিক যাত্রার গল্প।

সিস্টার ডেইজি যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার একটি ধর্মপ্রাণ আইরিশ ক্যাথলিক পরিবারে বেড়ে ওঠেন। তাঁর পরিবারে ধর্মীয় অনুশাসনের প্রভাব ছিল অত্যন্ত গভীর। তাঁর নিজের বোন ছিলেন একজন কারমেলাইট সন্ন্যাসিনী। পরিবারের একাধিক চাচাও ছিলেন গির্জার যাজক। ফলে শৈশব থেকেই গির্জা, প্রার্থনা এবং খ্রিস্টীয় ধর্মীয় বিশ্বাস ছিল তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ঈসা (আ.) ও মরিয়ম (আ.)-কে ঘিরে প্রার্থনার মধ্যেই কাটত তাঁর জীবনের অনেকটা সময়। কিন্তু ধর্মীয় পরিবেশে বেড়ে উঠলেও কিছু প্রশ্ন তাঁকে ছোটবেলা থেকেই ভাবিয়ে তুলত। বিশেষ করে খ্রিস্টধর্মের ত্রিত্ববাদ এবং যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার ধারণা নিয়ে তাঁর মনে সংশয় তৈরি হতো।

তাঁর মনে প্রশ্ন জাগত, ঈশ্বর যদি সর্বশক্তিমান হন, তাহলে তিনি কীভাবে মৃত্যুবরণ করতে পারেন? কিংবা ঈশ্বরের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের সঙ্গে যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তাঁর মনে ধীরে ধীরে সত্য অনুসন্ধানের আকাঙ্ক্ষা গভীর হতে থাকে।

পরবর্তী সময়ে গির্জার দিকনির্দেশনা এবং মার্কিন দূতাবাসে চাকরির সুবাদে সিস্টার ডেইজি সৌদি আরবে যাওয়ার সুযোগ পান। সেখানে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনাও ছিল তাঁর।

তাঁর ধারণা ছিল, আরবের মানুষ যিশু ও মরিয়ম সম্পর্কে খুব বেশি জানেন না। তাই তাঁদের কাছে খ্রিস্টধর্মের শিক্ষা তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সৌদি আরবে গিয়ে তিনি এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হন, যা তার পূর্বধারণাকে নাড়িয়ে দেয়।

তিনি দেখতে পান, সেখানকার মুসলমানেরা যিশু ও মরিয়ম সম্পর্কে গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করেন। শুধু তা-ই নয়, তাঁরা বাইবেল সম্পর্কেও জানেন এবং পবিত্র কুরআনে ঈসা (আ.) ও মরিয়ম (আ.) সম্পর্কে বর্ণিত বিভিন্ন ঘটনা ও অলৌকিক নিদর্শনের কথা তুলে ধরেন।

মুসলমানদের কাছ থেকে এসব বিষয় জানার পর ডেইজির মনে নতুন নতুন প্রশ্ন তৈরি হতে থাকে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে গির্জার দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁর মনে জেগে ওঠা সব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর তিনি পাননি বলে বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ইসলামের প্রতি তাঁর আগ্রহ আরও বাড়তে থাকে।

সৌদি আরবের তায়েফ অঞ্চলের পাহাড়ি পরিবেশ সিস্টার ডেইজির জীবনে বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল। চারপাশের পাহাড় থেকে ভেসে আসা আজানের ধ্বনি তাঁর মনে এক গভীর অনুভূতির জন্ম দিত। মুসলমানদের ইবাদত, আল্লাহর প্রতি তাঁদের নিবেদন এবং ধর্মীয় জীবনের আন্তরিকতা তাঁকে ভাবিয়ে তুলত।

যে দেশে তিনি গিয়েছিলেন খ্রিস্টধর্মের শিক্ষা প্রচার করতে, সেই দেশেই তিনি ইসলাম সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শুরু করেন। ঈসা (আ.) ও মরিয়ম (আ.) সম্পর্কে কুরআনের বক্তব্য, মুসলমানদের বিশ্বাস এবং আজানের সুর—সবকিছু মিলিয়ে তাঁর মনে সত্য অনুসন্ধানের আকাঙ্ক্ষা আরও প্রবল হয়ে ওঠে।

একসময় যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গেলেও সৌদি আরবে পাওয়া সেই অভিজ্ঞতা তাঁর মন থেকে মুছে যায়নি। বরং সেখানকার স্মৃতি তাঁকে ইসলামের বিষয়ে আরও জানার জন্য অনুপ্রাণিত করতে থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসার পর বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনীনির্ভর চলচ্চিত্র ‘দ্য মেসেজ’-এর একটি অংশ দেখার পর ইসলাম সম্পর্কে জানার আগ্রহ তার মধ্যে আরও গভীর হয়। তিনি ইসলাম নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন এবং নিজের দীর্ঘদিনের প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে থাকেন।

কিন্তু তার এই পরিবর্তন পরিবারের সদস্যদের উদ্বিগ্ন করে তোলে। বিশেষ করে তাঁর সন্ন্যাসিনী বোন বিষয়টি সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি। তাকে বিভিন্ন সন্ন্যাসী, যাজক ও বিশপের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়, যাতে তিনি নিজের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন।

বর্ণনা অনুযায়ী, প্রায় সাত বছর ধরে তাঁকে নানা প্রশ্ন, সমালোচনা ও বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। প্রতি সপ্তাহে ধর্মীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করতে হতো। তবে এসব বাধা তার সত্য অনুসন্ধানের পথ বন্ধ করতে পারেনি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইসলাম সম্পর্কে জানার আগ্রহ আরও দৃঢ় হয়।

বর্ণনায় আরও বলা হয়েছে, পরবর্তী সময়ে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুশয্যায় সেই সন্ন্যাসী নিজের আচরণের জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করেন এবং ডেইজির কাছে ক্ষমা চান।

দীর্ঘ সংগ্রামের একপর্যায়ে সিস্টার ডেইজিকে নিয়ে যাওয়া হয় ফাদার টম নামের একজন প্রভাবশালী যাজকের কাছে। পরিবারের প্রত্যাশা ছিল, তার বক্তব্যে ডেইজি হয়তো নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবেন।

কিন্তু সেখানে তিনি ভিন্ন ধরনের একটি পরামর্শ পান। বর্ণনা অনুযায়ী, ফাদার টম তাঁকে বোঝান, অন্য কেউ কী বলছেন, তা-ই শেষ কথা নয়। বরং সত্য অনুসন্ধান করতে হবে এবং নিজের বিবেক ও ঈশ্বরের কাছে সত্য বলে প্রতীয়মান বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে।

এই বক্তব্য ডেইজির মনে গভীর প্রভাব ফেলে। দীর্ঘদিন ধরে যেসব প্রশ্নের উত্তর তিনি খুঁজছিলেন, সেগুলো নিয়ে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার মানসিক শক্তি পান। ইসলামের প্রতি তার বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে এবং তিনি নতুন জীবনের পথে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

অবশেষে সিস্টার ডেইজি তার ছোট দুই পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে একটি ফিলিস্তিনি মসজিদে যান। সেখানে একজন ফিলিস্তিনি নারী তাঁকে নামাজের নিয়ম শেখাতে সাহায্য করেন। জীবনে প্রথমবারের মতো তিনি মুসলমানদের মতো নামাজ আদায় করেন এবং আল্লাহর সামনে সিজদায় অবনত হন।

সেই প্রথম সিজদার অভিজ্ঞতা তার জীবনে ছিল আবেগঘন এক মুহূর্ত। বর্ণনা অনুযায়ী, সিজদায় গিয়ে তিনি অঝোরে কেঁদেছিলেন। দীর্ঘদিনের প্রশ্ন, অনুসন্ধান, দ্বিধা ও সংগ্রামের পর সৃষ্টিকর্তার সামনে নিজেকে সমর্পণ করার মধ্যে তিনি গভীর প্রশান্তি অনুভব করেন।

যে নারী একসময় খ্রিস্টধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন, তিনিই শেষ পর্যন্ত ইসলামের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে আল্লাহর সামনে সিজদাবনত হন। তার কাছে এই অভিজ্ঞতা ছিল জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

সিস্টার ডেইজির ইসলাম গ্রহণের পেছনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ঈসা (আ.) ও মরিয়ম (আ.) সম্পর্কে ইসলামের শিক্ষা। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি উপলব্ধি করেন, ইসলাম তাঁকে ঈসা (আ.) ও মরিয়ম (আ.)-কে অস্বীকার করতে শেখায় না; বরং তাঁদের সম্পর্কে ইসলামের নির্ধারিত মর্যাদা ও বিশ্বাসের সঙ্গে পরিচিত করে।

ইসলামের বিশ্বাস অনুযায়ী, আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। ঈসা (আ.) আল্লাহর সম্মানিত নবী ও রাসুল এবং মরিয়ম (আ.) একজন পবিত্র ও মর্যাদাবান নারী। পবিত্র কুরআনে তাঁদের জীবন, ঈসা (আ.)-এর অলৌকিক জন্ম এবং তার নবুওয়ত সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।

ডেইজির কাছে ইসলামের এই শিক্ষা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। তার দীর্ঘদিনের প্রশ্ন ও অনুসন্ধানের মধ্যে ঈসা (আ.) এবং মরিয়ম (আ.)-এর পরিচয় ও মর্যাদার বিষয়টি বিশেষ স্থান দখল করে ছিল। ইসলামের শিক্ষা তার কাছে নতুনভাবে সেই বিষয়গুলো বোঝার সুযোগ তৈরি করে দেয়।

বর্ণনায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, পরবর্তী সময়ে ডেইজির জীবনযাপনে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখে তার মেয়েও ইসলাম গ্রহণ করেন।

সিস্টার ডেইজির এই কাহিনি আমাদের সামনে সত্য অনুসন্ধান, ধৈর্য এবং বিশ্বাসের এক আবেগঘন চিত্র তুলে ধরে। শৈশবের ধর্মীয় পরিবেশ থেকে শুরু করে সৌদি আরবের অভিজ্ঞতা, দীর্ঘ সাত বছরের সংগ্রাম এবং প্রথম সিজদার মুহূর্ত প্রতিটি ধাপ তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।

তার যাত্রার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েও তিনি সত্য অনুসন্ধান বন্ধ করেননি। পারিবারিক বাধা ও সামাজিক চাপের মধ্যেও নিজের প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। সূত্র, সময় টিভি