Last Updated on 54 mins by zajira news
স্পোর্টস ডেস্ক, জাজিরা নিউজ: ফুটবলারদের নিয়ে দীর্ঘদিনের একটি প্রচলিত ধারণা—মাঠে তাঁরা অসাধারণ দক্ষ হলেও মাঠের বাইরে নাকি তেমন বুদ্ধিমান নন। আশির দশকের শেষভাগ থেকে নব্বইয়ের দশক, এমনকি পরবর্তী সময়েও খেলোয়াড়দের সরল, বোকাসোকা কিংবা বিবেচনাহীন হিসেবে উপস্থাপন করে নানা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা হয়েছে। কিন্তু আধুনিক ফুটবলের বাস্তবতা কি সেই ধারণাকে সমর্থন করে?
বর্তমান সময়ে একজন পেশাদার ফুটবলারের দায়িত্ব শুধু বল পাস দেওয়া, শট নেওয়া কিংবা প্রতিপক্ষকে ট্যাকল করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মাঠের বাইরেও তাঁকে সামলাতে হয় চাপ, প্রলোভন, প্রত্যাশা ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। তাই ম্যাচ শেষে সাংবাদিকের সামনে দেওয়া কয়েকটি সংক্ষিপ্ত উত্তরের ভিত্তিতে কারও বুদ্ধিমত্তা বিচার করা কতটা যুক্তিসংগত?
‘গোল করে কেমন লাগছে?’ কিংবা ‘জিতে কেমন অনুভূতি হচ্ছে?’—এ ধরনের প্রশ্নের উত্তরে খেলোয়াড়েরা সাধারণত প্রচলিত কথাই বলেন। এতে তাঁদের চিন্তাভাবনা বা ব্যক্তিত্ব প্রকাশের সুযোগ সীমিত। আবার কেউ সংবাদমাধ্যমের সামনে কম কথা বললে, লাজুক হলে কিংবা সতর্ক আচরণ করলে সেটিও তাঁর বুদ্ধির অভাব প্রমাণ করে না।
পেশাদার ফুটবলে প্রতিদিনই খেলোয়াড়দের নানা সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কখন আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, কার পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে, কখন নিজের অবস্থানে অনড় থাকতে হবে—এসব ক্ষেত্রে প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস, বিচক্ষণতা ও আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা। মাঠে প্রশংসা ও সমালোচনা, দুই পরিস্থিতিতেই মানসিক ভারসাম্য ধরে রাখা জরুরি।
দলবদলের সময় এই দক্ষতার পরীক্ষা আরও কঠিন হয়ে ওঠে। কোন ক্লাবে গেলে ক্যারিয়ার এগোবে, কোন কোচের অধীনে খেলার সুযোগ মিলবে, দলে নিজের অবস্থান কী হবে—এসব প্রশ্ন খেলোয়াড়ের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে। কিন্তু কখনো কখনো খেলোয়াড়ের স্বার্থের চেয়ে প্রতিনিধির কমিশন, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা অন্য হিসাব বেশি গুরুত্ব পায়।
বিশেষ করে তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য এমন পরিস্থিতি সামলানো কঠিন। অভিজ্ঞতার অভাবে তাঁরা চারপাশের পরামর্শদাতাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। অথচ নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত তাঁদেরই।
এক তরুণ ফুটবলারের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে শিক্ষণীয়। বিশ্বকাপে প্রত্যাশা অনুযায়ী খেলতে না পেরে তিনি হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। চারপাশের অনেকে তাঁকে সান্ত্বনা দিলেও তাঁর এক অভিজ্ঞ পরামর্শদাতা সরাসরি নিজের ব্যর্থতার দায় নিতে বলেন। কঠিন কথাটি শুনে তিনি ভেঙে না পড়ে বরং তা কাজে লাগান। বন্ধুদের সঙ্গে আগে থেকে পরিকল্পনা করা ছুটি বাতিল করে কঠোর অনুশীলনের জন্য প্রশিক্ষণ শিবিরে যোগ দেন। ফলে পরবর্তী মৌসুমের প্রস্তুতিতে তিনি দারুণ শারীরিক অবস্থায় ফিরতে পারেন।
এই ঘটনা দেখায়, সব সময় সান্ত্বনার চেয়ে কঠিন সত্য গ্রহণ করে ভুল সংশোধন করাই বেশি কার্যকর। সাধারণ মানুষের জীবনেও এমন পরিস্থিতি আসে—তা পড়াশোনা, চাকরি কিংবা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেই হোক। নিজের তাৎক্ষণিক ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ করে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যকে গুরুত্ব দেওয়া সহজ নয়।
ফুটবলারদের ক্ষেত্রেও মানসিক দৃঢ়তা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ তাই অপরিহার্য। তাঁদের ভুলের মূল্য অনেক বেশি, আবার সঠিক সিদ্ধান্তের সুফলও বড়। আধুনিক ফুটবল এখন বিশাল ব্যবসা; অর্থ, খ্যাতি, প্রচার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খেলোয়াড়দের জীবনকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ফুটবলারদের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে পুরোনো ধারণা হয়তো তাঁদের পেশার জটিলতা না বোঝার ফল। মাঠে প্রতিটি মুহূর্তে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ, সম্ভাবনা যাচাই এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। যে খেলায় এক সেকেন্ডের ভুলে ম্যাচের ফল বদলে যেতে পারে, সেখানে বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।
তাই ফুটবলারদের শুধু পায়ের দক্ষতা দিয়ে বিচার করার সময় এসেছে। আধুনিক ফুটবলে সফল হতে হলে পায়ের পাশাপাশি মাথা দিয়েও খেলতে হয়—আর মাঠের বাইরের লড়াইটিও এখন সমান কঠিন।

