সময়ের জনমাধ্যম

যুদ্ধের আশঙ্কা, নাকি দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি—খাবার-পানি মজুতের পরামর্শ দিচ্ছে বিভিন্ন দেশ

ছবি: এ আই সম্পাদিত

Last Updated on 30 seconds by zajira news

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, জাজিরা নিউজ: বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে নাগরিকদের অন্তত তিন দিন থেকে এক সপ্তাহের খাবার ও পানি ঘরে রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সরকারি এই আহ্বানের পর অনেক জায়গায় টিনজাত খাবার, বোতলজাত পানি, টর্চলাইট ও ব্যাটারিচালিত রেডিও কেনার প্রবণতা বেড়েছে। এতে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, বড় কোনো যুদ্ধ বা বৈশ্বিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা থেকেই কি এমন নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে?

সম্প্রতি যুক্তরাজ্য সরকার ‘বি রেডি’ নামে জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করেছে। এর উদ্দেশ্য, বড় ধরনের সংকট কিংবা বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের পর প্রথম ৭২ ঘণ্টা নাগরিকেরা যেন নিজেদের মৌলিক প্রয়োজন নিজেরাই পূরণ করতে পারেন। এ জন্য পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের দৈনিক তিন লিটার পানীয় জল, দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য শুকনো ও টিনজাত খাবার, প্রয়োজনীয় ওষুধ, পাওয়ার ব্যাংক এবং হাতল ঘুরিয়ে চালানো যায় এমন রেডিও রাখার পরামর্শ দিয়েছে সরকার।

ব্রিটিশ প্রশাসনের ব্যাখ্যা, ঝড়, আকস্মিক বন্যা বা সাইবার হামলায় জাতীয় বিদ্যুৎব্যবস্থা অচল হলে জরুরি সহায়তা দ্রুত সবার কাছে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে। নাগরিকেরা প্রাথমিক কয়েক দিন নিজেদের মজুত ব্যবহার করতে পারলে উদ্ধারকারী দলগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের সহায়তায় বেশি মনোযোগ দিতে পারবে।

সরকারি প্রচারণার প্রভাব পড়েছে যুক্তরাজ্যের বাজারেও। সুপারমার্কেট চেইন আইসল্যান্ডে টিনজাত খাবারের বিক্রি প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। ইলেকট্রনিক পণ্য বিক্রেতাদের হিসাবে, রেডিও বিক্রি বেড়েছে ১৬০ শতাংশ এবং টর্চলাইটের বিক্রি হয়েছে প্রায় তিন গুণ। তবে খুচরা বিক্রেতারা জানিয়েছেন, পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক আছে এবং দেশে খাদ্যসংকট দেখা দেয়নি।

যুক্তরাজ্যের বাইরে আরও কয়েকটি দেশেও জরুরি প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নিউজউইকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কানাডা, জাপান, মেক্সিকো ও নেদারল্যান্ডসের পরিবারগুলোকে অন্তত তিন দিনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে।

সুইডেন ও নরওয়ে নাগরিকদের এক সপ্তাহের এবং জার্মানি প্রায় ১০ দিনের রসদ মজুতের পরামর্শ দিচ্ছে। তবে দেশভেদে প্রস্তুতির ধরন আলাদা। জাপানে ভূমিকম্প ও সুনামির ঝুঁকি মোকাবিলা প্রধান বিবেচ্য; অস্ট্রেলিয়া ও মেক্সিকোতে ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার প্রস্তুতি গুরুত্ব পাচ্ছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রস্তুতি পরিকল্পনায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক অস্থিরতাও স্থান পেয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের ‘প্রিপেয়ার্ডনেস ইউনিয়ন স্ট্র্যাটেজি’তে জলবায়ুজনিত ঝুঁকির সঙ্গে সাইবার হামলা ও বহিরাগত আগ্রাসনের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

স্ক্যান্ডিনেভীয় দেশ সুইডেনের ‘ইফ ক্রাইসিস অর ওয়ার কামস’ নির্দেশিকায় জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয়র পাশাপাশি যুদ্ধকালীন টিকে থাকার প্রস্তুতিও তুলে ধরা হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর ইউরোপে এ ধরনের নির্দেশিকা বহুদিনের প্রচলিত ব্যবস্থা; এগুলোকে আসন্ন যুদ্ধের ঘোষণা বা পূর্বাভাস হিসেবে দেখার কারণ নেই।

সামরিক প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের দ্য গার্ডিয়ানের সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর ‘ফোর্ট্রেস আমেরিকা’ উদ্যোগের আওতায় গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিগুলোকে বাইরের সরবরাহ ছাড়াই অন্তত ৯০ দিন সচল রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে ঘাঁটিগুলোর নিজস্ব জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, সাইবার নিরাপত্তা জোরদার এবং জরুরি মজুত দ্বিগুণ করা। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ৯০ দিনের প্রস্তুতি সামরিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা ও কার্যক্রম বজায় রাখার অভ্যন্তরীণ পরিকল্পনা। সাধারণ নাগরিকদের জন্য এ ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

বিবিসি, নিউজউইক, স্কাই নিউজ ও দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন এবং সরকারি নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব প্রস্তুতির পেছনে কোনো একক কারণ নেই; একই সঙ্গে তাৎক্ষণিক যুদ্ধ আসন্ন—এমন প্রমাণও পাওয়া যায়নি। বরং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত চরম আবহাওয়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় পক্ষের সাইবার হামলা এবং বিদ্যুৎ বা যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হওয়ার মতো নানা ঝুঁকি মোকাবিলায় এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি নির্দেশনাগুলোকে যুদ্ধের সংকেত ভেবে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। মহামারি, যুদ্ধজনিত বৈশ্বিক অস্থিরতা ও চরম আবহাওয়ার সময়ে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে নাগরিকদের প্রাথমিক প্রয়োজন মেটানোর সক্ষমতা গড়ে তোলাই এসব প্রস্তুতির মূল লক্ষ্য।