Last Updated on 1 min by zajira news
সজিব হাসান, মালয়েশিয়া প্রতিনিধি: মালয়েশিয়ায় উৎপাদন খাতে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদেশি কর্মীর ওপর নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা করছে দেশটির সরকার। নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থানীয় কর্মী নিয়োগ, দক্ষ জনশক্তির ব্যবহার এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনে উৎসাহিত করা হবে।
এ ক্ষেত্রে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ মূলত ঝুঁকিপূর্ণ, কঠিন ও অপরিচ্ছন্ন কাজের মধ্যে সীমিত রাখার নীতিতে এগোতে চায় সরকার। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম দ্য স্টারের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
সোমবার (২ নভেম্বর) দেশটির পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ দেওয়ান রাকিয়াতে এ বিষয়ে বক্তব্য দেন বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী দাতুক সেরি জোহরি আবদুল গনি।
তিনি জানান, নতুন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স আবেদনের ক্ষেত্রে সরকার আরও কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। বিশেষ করে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানের মতো একই ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা এবং বিপুলসংখ্যক বিদেশি কর্মীর ওপর নির্ভরশীল ব্যবসার প্রস্তাব সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।
জোহরি বলেন, নতুন করে একই ধরনের শ্রমঘন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অনুমতি দিয়ে বিদেশি কর্মীর সংখ্যা বাড়ানো সরকারের উদ্দেশ্য নয়। বরং শিল্প খাতে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে প্রযুক্তির ব্যবহার, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ও ডিজিটাল রূপান্তরের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রী জানান, মালয়েশিয়ায় বর্তমানে প্রায় ২৬ লাখ নথিভুক্ত বিদেশি কর্মী রয়েছেন। তবে এ সংখ্যার মধ্যে অনথিভুক্ত শ্রমিকদের হিসাব অন্তর্ভুক্ত নয়। দীর্ঘদিন ধরে দেশটিতে কার্যক্রম পরিচালনা করা অনেক প্রতিষ্ঠান এখনও বিদেশি কর্মীর ওপর নির্ভরশীল। নীতিমালার অতিরিক্ত নমনীয়তাও এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জোহরি বলেন, বিদেশি কর্মীদের প্রধানত ঝুঁকিপূর্ণ, কঠিন ও অপরিচ্ছন্ন—এই তিন ধরনের কাজে (থ্রি-ডি) নিয়োগ দেওয়া উচিত। উৎপাদন খাতের অন্যান্য পদে স্থানীয় কর্মীদের উপযুক্ত বেতন ও সুযোগ-সুবিধা দিয়ে নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে।
এ জন্য মন্ত্রণালয় এবং মালয়েশীয় বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (মিডা) সঙ্গে যোগাযোগ করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদেশি কর্মী নিয়োগের নীতিগত সীমাবদ্ধতার বিষয়টি জানানো হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মালয়েশিয়ায় কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ (টিভিইটি) কর্মসূচির আওতায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৪ লাখের বেশি মানুষ রয়েছেন। তাঁদের স্থানীয় শিল্পে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে চায় সরকার। অথচ দক্ষতা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ থাকা সত্ত্বেও অনেক প্রতিষ্ঠান তাঁদের যথাযথ বেতন দিতে আগ্রহী নয় বলে অভিযোগ করেন জোহরি।
তিনি বলেন, কিছু উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান শত কোটি রিঙ্গিত মুনাফা করেও স্থানীয় কর্মীদের মাসে ২ হাজার রিঙ্গিত বেতন দিতে রাজি হচ্ছে না। তারা এখনও নতুন কর্মীদের জন্য ১ হাজার ৭০০ রিঙ্গিতের ন্যূনতম মজুরি দিতে চায়। এমনকি টিভিইটি সনদধারীদেরও বিদেশি কর্মীদের সমপরিমাণ বেতন দেওয়ার চেষ্টা করছে।
স্থানীয় কর্মীদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান মন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, বিদেশি কর্মীদের অনেককে নিয়োগকর্তার ব্যবস্থাপনায় আবাসন দেওয়া হলেও স্থানীয় কর্মীদের নিজেদের বাসাভাড়া ও অন্যান্য খরচ বহন করতে হয়। ফলে পর্যাপ্ত আর্থিক সুবিধা না থাকলে স্থানীয়রা এসব কাজে আগ্রহী হবেন না।
মালয়েশীয়রা কাজ করতে অনিচ্ছুক কিংবা অলস—এমন ধারণাও নাকচ করেন জোহরি। তিনি জানান, প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ মালয়েশীয় নাগরিক কাজের জন্য সিঙ্গাপুরে যাতায়াত করেন। তাঁদের মধ্যে ডিপ্লোমা, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীরাও রয়েছেন। কাজের ধরন অনেকটা একই রকম হলেও সিঙ্গাপুরে আর্থিক সুবিধা বেশি থাকায় তাঁরা সেখানে কাজ করতে যান। স্থানীয় কর্মীরা ই-হেইলিং চালকের কাজ বেছে নেওয়ার পেছনেও ভালো আয়ের বিষয়টি কাজ করছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
নতুন শিল্প মহাপরিকল্পনা ২০৩০-এর আওতায় উৎপাদন খাতে মধ্যম মাসিক বেতন ২০৩০ সালের মধ্যে ৪ হাজার ৫১০ রিঙ্গিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে চালু হওয়া এ পরিকল্পনার মাধ্যমে শিল্প খাতের কর্মীদের আয় ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করতে হবে বলে জানান মন্ত্রী।
এদিকে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদেশি শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি বিদ্যমান শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর আধুনিকায়নেও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। স্বয়ংক্রিয় উৎপাদনব্যবস্থা, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও দক্ষ জনশক্তির ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে শিল্প খাতকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পার্লামেন্টে বাকরি আসনের জনপ্রতিনিধি তান হং পিনের এক প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন জোহরি। তান জানতে চান, সস্তা শ্রমের সুযোগ নিতে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামের মতো দেশে চলে যাওয়ার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের অবস্থান কী। তিনি বলেন, কিছু প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে উচ্চমাত্রার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু করলেও তাদের এখনও হাতে-কলমে কাজের জন্য শ্রমিক প্রয়োজন। এ অবস্থায় শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী বিদেশি কর্মী নিয়োগের নীতিতে নমনীয়তা আনা হবে কি না, সে বিষয়েও জানতে চান তিনি।
জবাবে জোহরি বলেন, বিদ্যমান নীতিমালার সংস্কার না হলে ভবিষ্যতে মালয়েশিয়ার শিল্প ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই বিদেশি কর্মীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় জনশক্তির দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো জরুরি।
সূত্র, ফ্রি মালয়েশিয়া টুডে, দি স্টার, বারনামা

