Last Updated on 12 hours by zajira news
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, জাজিরা নিউজ: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সামরিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে ওয়াশিংটনের কাছে ৭ দফা দাবি উত্থাপন করেছে ইরান। কাতারের মধ্যস্থতায় পাঠানো প্রস্তাবে যুদ্ধের অবসান, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিদেশে আটকে থাকা সম্পদ ফেরত এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি হ্রাসের কথা বলা হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানকে ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকির মধ্যেই তেহরানের পক্ষ থেকে এই কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এ তথ্য প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজায়ি জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন তাদের উত্থাপিত সাতটি শর্ত সম্পূর্ণভাবে মেনে না নেওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে না। একই সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতেও রাজি নয় তেহরান।
এদিকে ইরানের প্রস্তাব পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিষয়টি বর্তমানে পর্যালোচনা করছে ওয়াশিংটন। তবে ওই কর্মকর্তা নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম খালিজ টাইমসের প্রতিবেদনে ইরানের সাত দফা দাবির বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। দাবিগুলো হলো—
১. আঞ্চলিক সংঘাতের অবসান: লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের সব সংঘাতপূর্ণ এলাকায় চলমান যুদ্ধ ও সামরিক তৎপরতা বন্ধ করতে হবে।
২. নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া: ইরানের সমুদ্রবন্দরগুলোকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা সব ধরনের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে।
৩. সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: তেহরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বাতিল করতে হবে।
৪. আটকে থাকা অর্থ ফেরত: বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জব্দ অবস্থায় থাকা ইরানের সব আর্থিক সম্পদ ফিরিয়ে দিতে হবে।
৫. মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি হ্রাস: অঞ্চলটির বিভিন্ন দেশ ও স্থানে মোতায়েন করা মার্কিন সেনাসদস্যের সংখ্যা এবং সামরিক উপস্থিতি কমাতে হবে।
৬. ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ: সংঘাতের ফলে ইরানের যে আর্থিক ও অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
৭. ভবিষ্যতে হামলা না চালানোর নিশ্চয়তা: ইরানের ভূখণ্ডে নতুন করে কোনো মার্কিন সামরিক হামলা হবে না—এ বিষয়ে স্থায়ী নিশ্চয়তা দিতে হবে।
এদিকে ইরানের প্রস্তাব ঘিরে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত থাকলেও দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে মতবিরোধ রয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো, প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনা শুরু করতে হলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টিও আলোচনার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে আবারও সামরিক অভিযান চালানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
এর জবাবে তেহরান বলেছে, নতুন করে সংঘাত শুরু হলে আগের তুলনায় আরও বিস্তৃত ও ভয়াবহ পাল্টা হামলা চালানোর সক্ষমতা ও প্রস্তুতি তাদের রয়েছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর আশঙ্কা থেকেই যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতাকারীরা তৎপরতা বাড়িয়েছেন। তবে দুই পক্ষের কঠোর অবস্থানের কারণে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানো কঠিন হয়ে উঠছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক হামলার মধ্য দিয়ে ইরানকে কেন্দ্র করে নতুন সংঘাতের সূচনা হয়। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইসরাইল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করে ইরান। পরবর্তী সময়ে লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর তৎপরতার মধ্য দিয়েও সংঘাতের বিস্তৃতি ঘটে।
এই উত্তেজনার মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের ওপর নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ইরানের সাত দফা প্রস্তাবের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কী সিদ্ধান্ত নেয়, তার ওপর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা অনেকাংশে নির্ভর করছে। দুই পক্ষ সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে অঞ্চলটিতে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যাবে।


