সময়ের জনমাধ্যম

ভুল ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার: এক বছর পর মুক্তি পাচ্ছেন নিরপরাধ আলমাস

কারাগারে থাকা নিরপরাধ মো. আলমাস। ছবি: সংগৃহীত

Last Updated on 26 seconds by zajira news

নিজস্ব প্রতিবেদক, জাজিরা নিউজ: দুই যুগ আগের একটি অস্ত্র মামলায় ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি মো. আলমাছের বদলে গ্রেপ্তার হয়ে প্রায় এক বছর কারাগারে কাটিয়েছেন নিরপরাধ মো. আলমাস।

অবশেষে তাঁকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। কারা কর্তৃপক্ষকে এ নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে।

আজ রোববার (৮ নভেম্বর) বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমদ ভূঞার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

নামের মিলের কারণে প্রকৃত দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির পরিবর্তে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছিলেন কারাবন্দী আলমাস।

রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে গত ৬ সেপ্টেম্বর আদালত এ বিষয়ে রুল জারি করেন। একই সঙ্গে কারাগারে থাকা আলমাস এবং অস্ত্র মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির পরিচয় ও সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাইয়ে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়।

ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের তত্ত্বাবধানে একজন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে দিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে আদেশ পাওয়ার ৪৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছিল।

সেই নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে অনুসন্ধান প্রতিবেদন আদালতে জমা পড়ে। এতে নিশ্চিত করা হয়, কারাগারে থাকা মো. আলমাস ওই অস্ত্র মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি নন। প্রকৃত দণ্ডিত ব্যক্তি মো. আলমাছ বর্তমানে কানাডায় অবস্থান করছেন।

এরপর আজ রিটটি আদেশের জন্য আদালতের কার্যতালিকায় ওঠে। আবেদনকারীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মো. তানভীর আহমেদ ও আবদুল্লাহ আবু সাঈদ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শিহাব উদ্দিন খান এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মহিউদ্দীন মো. হানিফ।

এর আগে ‘নামের মিলে ১০ মাস ধরে কারাগারে, প্রকৃত আসামি কে তদন্তের নির্দেশ’ শিরোনামে গত ৪ অক্টোবর প্রথম আলো একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, দুই ব্যক্তির নাম একই এবং তাঁদের বাবার নামেও আংশিক মিল রয়েছে। প্রায় ২২ বছর আগে অস্ত্র আইনের একটি মামলায় মো. আলমাছকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সেই সাজা কার্যকরের জন্য জারি করা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান মো. আলমাস।

অনুসন্ধান প্রতিবেদনে আলমাস ও মিরপুর থানার অস্ত্র মামলায় দণ্ডিত আলমাছকে সম্পূর্ণ আলাদা ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আলমাস ওই মামলার সাজাপ্রাপ্ত নন। প্রকৃত দণ্ডিত আলমাছ পলাতক এবং বর্তমানে কানাডায় রয়েছেন।

প্রতিবেদনে ভুল ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পেছনে তিনটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। সরেজমিন অনুসন্ধান এবং মামলার নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রথমত, গ্রেপ্তার হওয়া আলমাস ২০০৭ সালের আগে পরিবারসহ ঢাকা জেলার দোহারের দক্ষিণ বাহ্রা ডাকঘরের অধীন বাহ্রা গ্রামে থাকতেন।

অন্যদিকে, প্রকৃত আসামি আলমাছের গ্রামের নাম পূর্ব ধোয়াইর হলেও সেটিও একই ডাকঘরের আওতাভুক্ত। ডাকঘরের নাম ধরে ঠিকানা ব্যবহারের কারণে দুই ব্যক্তির ঠিকানায় মিল তৈরি হয়।

দ্বিতীয়ত, তাঁদের বাবার নামেও সাদৃশ্য রয়েছে। প্রকৃত আসামি আলমাছের বাবার নাম মো. খলিলুর রহমান, যিনি খলিল নামেও পরিচিত। অন্যদিকে, গ্রেপ্তার আলমাসের বাবার নাম শেখ খলিল। নামের এই মিলও পরিচয় শনাক্তে বিভ্রান্তির কারণ হয়েছে।

তৃতীয়ত, ২০০২ সালের অস্ত্র মামলার নথিতে দণ্ডিত আলমাছের গ্রামের ঠিকানা ‘পূর্ব ধোয়াইর’-এর পরিবর্তে ভুল করে ‘দক্ষিণ বাহ্রা’ লেখা হয়েছিল। পরবর্তী নথিপত্রেও সেই ভুল থেকে যায়। এমনকি রায় ঘোষণার পর জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানাতেও আলমাছের ঠিকানা ‘পূর্ব ধোয়াইর’-এর বদলে ‘দক্ষিণ বাহ্রা’ উল্লেখ করা হয়।

রিট আবেদন ও এর সঙ্গে যুক্ত নথিপত্র অনুযায়ী, ২০০২ সালের ১০ এপ্রিল মিরপুর থানায় মো. আলমাছ (২৪) ও মো. নাজমুল আলম মামুনের (২২) বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা করে পুলিশ।

পরবর্তী সময়ে ২০০৪ সালের ১৯ জুন ঢাকা মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১১ মামলাটির রায় দেন। এতে আলমাছকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ে তাঁর বর্তমান ঠিকানা হিসেবে মিরপুরের পাইকপাড়ার আহমেদনগর উল্লেখ করা হয়েছিল। মামলার অপর আসামি নাজমুল খালাস পান।

নথি অনুযায়ী, রায় ঘোষণার সময় আলমাছ পলাতক থাকায় তাঁর বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি করা হয়। ওই পরোয়ানার ভিত্তিতে ২০২৪ সালের ২০ মার্চের পর ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর আলমাসকে (বাবা শেখ খলিল) সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে আদালতে হাজির করে পুলিশ। পরে আদালতের নির্দেশে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর থেকেই তিনি বন্দী ছিলেন। সূত্র, প্রথম আলো