Last Updated on 10 hours by zajira news
অনলাইন ডেস্ক, জাজিরা নিউজ: রসায়নে চলতি বছর নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ফরাসি বিজ্ঞানী অঁরি কাগান এবং জাপানের বিজ্ঞানী কেনসো সোআই।
জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অরৈখিক প্রভাব এবং অসমমিত সংশ্লেষণে স্ব-অনুঘটনের ভূমিকা আবিষ্কারের জন্য তাঁদের রসায়নে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ সময় বুধবার (৭ অক্টোম্বর) বিকাল ৩টা ৪৫ মিনিটে সুইডেনের স্টকহোম থেকে এ বছরের রসায়নে নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্স। সর্বোচ্চ ১ থেকে ৩ জন ভাগাভাগি করে পেতে পারেন বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত এ পুরস্কার।
আয়নার সামনে দাঁড়ালে আমরা নিজেদের প্রতিবিম্ব দেখি। দেখতে হুবহু নিজের মতো, অথচ সেটি আমরা নই। ডান হাতের জায়গায় সেখানে দেখা যায় বাঁ হাত। জীবনের খুব পরিচিত এই ঘটনা যে রাসায়নের জগতেও এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, তা হয়তো অনেকেরই জানা নেই।
কিছু অণু আছে, যাদের গঠন দেখতে অনেকটা নিজের প্রতিবিম্বের মতো। দুটি অণুর পরমাণু একই, তাদের মধ্যে বন্ধনও একই—তবু তারা একে অপরের আয়নার প্রতিবিম্ব। রাসায়নের ভাষায় এদের বলা হয় এনান্টিওমার। অণুর এই বৈশিষ্ট্যের নাম কাইরালিটি। সমস্যা হলো, একটি রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অনেক সময় এই দুই ধরনের অণু একসঙ্গে তৈরি হয়। কিন্তু জীবন্ত শরীরের ক্ষেত্রে দুটির আচরণ এক নয়। একটি অণু হয়তো ওষুধ হিসেবে কাজ করবে, অথচ তার আয়নার প্রতিবিম্বটি শরীরে গিয়ে ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া ঘটাতে পারে।
১৯৬০-এর দশকের আলোচিত থালিডোমিড দুর্ঘটনার কথাই ধরা যাক। সেই সময় অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের ঘুমের ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত থালিডোমিডের একটি রূপ কাজ করলেও, এর ভেতরের অন্য রূপটির কারণে হাজার হাজার শিশু শারীরিক বিকলাঙ্গতা নিয়ে জন্ম নেয়। তাই ওষুধ তৈরিতে কীভাবে কেবল কাঙ্ক্ষিত নির্দিষ্ট রূপটিই বেশি পরিমাণে তৈরি করা যায়, তা আবিষ্কার করা অত্যন্ত জরুরি ছিল।
এই জটিল সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ২০২৬ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ফরাসি রসায়নবিদ হেনরি বি. কাগান এবং জাপানি রসায়নবিদ কেনসো সোয়াই।
তাঁদের গবেষণা দেখিয়েছে, রাসায়নিক বিক্রিয়ায় কীভাবে একটি আয়না-প্রতিবিম্ব অণুর পরিমাণ অন্যটির তুলনায় অনেক বেশি করা যায়। এমনকি এমন এক রাসায়নিক বিক্রিয়াও তৈরি করা সম্ভব, যেখানে শেষ পর্যন্ত প্রায় পুরো উৎপাদনই এক ধরনের অণু দিয়ে তৈরি হয়।
রসায়নের ডান–বামের রহস্য
গল্পটা কাগান বা সোয়াইকে দিয়ে শুরু হয়নি। এর শুরু উনিশ শতকে, ফরাসি বিজ্ঞানী লুই পাস্তুরের হাত ধরে। টারটারিক অ্যাসিড নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে পাস্তুর দেখলেন, একই পদার্থের স্ফটিক দুই রকম হতে পারে। একটি আরেকটির আয়নার প্রতিবিম্ব। আলাদাভাবে পরীক্ষা করে তিনি দেখলেন, একটি আলোকে ডান দিকে ঘুরিয়ে দেয়, অন্যটি বাঁ দিকে। এখান থেকেই বিজ্ঞানীরা বুঝলেন, কিছু অণুর দুটি আয়না-প্রতিবিম্ব রূপ থাকতে পারে। এদের বলা হয় এনান্টিওমার।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, জীবজগৎ এই দুই রূপের মধ্যে সাধারণত একটিকেই ব্যবহার করে। যেমন অ্যামিনো অ্যাসিডের দুটি রূপ থাকতে পারে, কিন্তু জীবনের প্রোটিনে ব্যবহৃত হয় তাদের একটি। কেন প্রকৃতি এমন একটিকে বেছে নিল, সেটাই ছিল বড় রহস্য।
১৯৫৩ সালে পদার্থবিদ চার্লস ফ্র্যাঙ্ক এর একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দেন। তাঁর ধারণা ছিল, শুরুতে কোনো একটি অণু সামান্য বেশি তৈরি হলে সেটিই আবার নিজের তৈরি হতে সাহায্য করতে পারে। ফলে সামান্য পার্থক্য ধীরে ধীরে অনেক বড় হয়ে উঠবে।
কিন্তু এই ধারণার বাস্তব প্রমাণ মিলতে আরও কয়েক দশক লেগে গেল। ১৯৮৬ সালে ফরাসি বিজ্ঞানী অঁরি কাগান দেখান, রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সামান্য একটি পার্থক্যকে অনেক বড় করা সম্ভব। অনুঘটকের দুই ধরনের অণুর অনুপাত সামান্য বদলালেও উৎপাদিত অণুর অনুপাত অনেক বেশি বদলে যেতে পারে। এই ঘটনাকে বলা হয় অরৈখিক প্রভাব।
এরপর জাপানি বিজ্ঞানী কেনসো সোয়াই খুঁজতে থাকলেন এমন একটি বিক্রিয়া, যেখানে তৈরি হওয়া অণুই আবার নিজের অণু তৈরিতে সাহায্য করবে। ১৯৯৫ সালে তিনি এমন একটি বিক্রিয়া পেলেন। শুরুতে এক ধরনের অণু অন্যটির চেয়ে মাত্র ২ শতাংশ বেশি ছিল। কিন্তু শেষে সেটিই ৮৭ শতাংশ হয়ে গেল।
সোয়াই এখানেও থামেননি। ২০০৩ সালে তিনি আরও চমকপ্রদ একটি বিক্রিয়া দেখালেন। শুরুতে কোনো কাইরাল অণু ছিল না। কিন্তু দৈবক্রমে একটি রূপ সামান্য বেশি তৈরি হওয়ার পর সেটিই নিজের তৈরিকে ত্বরান্বিত করতে লাগল। একসময় উৎপাদিত অণুর ৯৯.৯৯ শতাংশ পর্যন্ত একই রূপের হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ, শুরুতে সামান্য এক পার্থক্য—তারপর সেই পার্থক্যই নিজেকে বাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত প্রায় পুরো বিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
এই আবিষ্কার জীবনের শুরু নিয়ে নতুন প্রশ্নের দরজা খুলে দিয়েছে। জীবনের আদিম রাসায়নেও কি এমন কোনো ছোট্ট পক্ষপাত কাজ করেছিল? এর উত্তর এখনো জানা নেই।
তবে কাগান ও সোয়াই দেখিয়েছেন, রাসায়নের জগতে সামান্য একটি পার্থক্যও সময়ের সঙ্গে বিশাল হয়ে উঠতে পারে।
আর এর ব্যবহার শুধু জীবনের রহস্য বোঝার মধ্যে বা রসায়নের বইয়ের পাতাতেই সীমাবদ্ধ নয়। ওষুধ শিল্প থেকে শুরু করে নিত্যদিনের সুগন্ধি, প্রসাধন, কৃষি রাসায়নিক এবং আধুনিক ম্যাটেরিয়াল টেকনোলজি—সবক্ষেত্রেই উচ্চমানের বিশুদ্ধ অণু উৎপাদনে তাঁদের দেখানো নীতিগুলো দৈনন্দিন হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ইতিমধ্যে চিকিৎসাবিজ্ঞানে তিন বিজ্ঞানী ও পদার্থবিজ্ঞানে একজন পেয়েছেন এ বারের নোবেল পুরস্কার।
প্রত্যেক বিভাগের নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীরা পাবেন একটি নোবেল মেডেল, একটি সনদপত্র এবং মোট ১২ মিলিয়ন বা ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা। ২০২৫ সালে নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য ছিল ১ কোটি ১০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা। ২০২৬ সালে তা বাড়িয়ে ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি পুরস্কারে ১০ লাখ ক্রোনা বা প্রায় ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। নোবেল ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক হানা স্টিয়ারনে জানিয়েছেন, ২০২৬ সালে নোবেল পুরস্কারের ১২৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে এই অর্থ বাড়ানো হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এর মাধ্যমে পুরস্কারের আর্থিক মূল্য দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য ১০ মিলিয়ন ক্রোনা থেকে বাড়িয়ে ১১ মিলিয়ন করা হয়। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে এতে আর কোনো পরিবর্তন আসেনি। ২০২৬ সালে আবার ১০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা বাড়ানো হলো।
যেসব বিভাগে একাধিক নোবেলজয়ী থাকবেন, তাঁদের মধ্যে এই ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা ভাগ হয়ে যাবে। বর্তমান বাজারে এর মান প্রায় ১২ লাখ ৮ হাজার মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি টাকায় হবে প্রায় ১৪ কোটি ৯১ লাখ টাকার বেশি!

