Last Updated on 31 seconds by zajira news
অনলাইন ডেস্ক, জাজিরা নিউজ: রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক অংশীজনদের একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য পথনকশা (রোডম্যাপ) প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে পাঁচ দফা প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় বেলা ১১টায় (বাংলাদেশ সময় রাত ৯টায়) যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরের ১১ নম্বর কক্ষে রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব প্রস্তাব দেন। ‘রোহিঙ্গা সংকট: দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির অবসানে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিসহ টেকসই সমাধানের আহ্বান’ শীর্ষক এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠক যৌথভাবে আয়োজন করে বাংলাদেশ ও গাম্বিয়া।
উল্লেখ্য, রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধন চালানোর অভিযোগে ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মামলা করেছিল গাম্বিয়া। ওই মামলা এখন রায় ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রস্তাবগুলো হলো—আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসইভাবে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও অন্যান্য রাষ্ট্রকে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় সহায়তা করতে হবে এবং তাদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে হবে, যা প্রত্যাবাসনের অনুকূল; রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের বেসামরিক জনগণের ওপর সহিংসতা বন্ধ করতে হবে; পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে; ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে; আন্তসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে।
উচ্চপর্যায়ের এই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছাড়াও বক্তব্য দেন গাম্বিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মেদ বি এস জ্যালো, জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত জুলি বিশপ, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালেহ। বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান। বৈঠকে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান তারেক রহমান। মানবিক সহায়তার উদারতা রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনির্দিষ্টকালের জন্য কেবল বাংলাদেশই রোহিঙ্গাদের দায়ভার বহন করে যাবে—এমনটাও প্রত্যাশা করা যায় না। রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি হয়েছে মিয়ানমারে এবং এই সংকটের টেকসই সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত।
বৈঠক আয়োজনের সহযোগীসহ অন্য অংশীজনদের ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, কয়েক দশক ধরে রোহিঙ্গারা চরম বৈষম্য, নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৭৮ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের বড় বড় ঢল এসেছে। ১৯৮০-এর দশকেও রোহিঙ্গাদের কয়েকটি বড় দফার আগমন ঘটেছে। তৎকালীন বিভিন্ন সরকারের আমলে কিছু রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। তবে ২০১৭ সালে মিয়ানমারে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতির আরও মারাত্মক অবনতি ঘটে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৯ বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে মানবিক দায়িত্ব পালন করে আসছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। উপরন্তু মিয়ানমারে চলমান সহিংসতার কারণে এখনো মানুষ সেখান থেকে পালিয়ে আসছে।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতে প্রতিবছর হাজার হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন আরেকটি প্রজন্ম। রোহিঙ্গা মায়েরা তাঁদের সন্তানদের নিরাপদ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছেন, তরুণেরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে বেড়ে উঠছে এবং প্রবীণেরা নিজেদের ফেলে আসা ঘরবাড়ি ও গ্রামের স্মৃতি বুকে নিয়ে নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার আকুল আকাঙ্ক্ষা পোষণ করছেন।
মানবিকতার তাগিদেই বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দিয়ে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে তাদের খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে। প্রায় ছয় হাজার লার্নিং সেন্টারের (শিক্ষাকেন্দ্র) মাধ্যমে রোহিঙ্গা শিশুদের মিয়ানমারের পাঠ্যক্রম অনুযায়ী শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে তাদের পুনঃ একীভূত হওয়ার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।
তারেক রহমান বলেন, শিবিরগুলোতে বসবাসের পরিবেশ উন্নত করতে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে গেলেও এগুলো দীর্ঘ মেয়াদে বসবাসের উপযোগী কোনো আদর্শ স্থান নয়। দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির কারণে বাংলাদেশের ওপর সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপ ক্রমেই বাড়ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সংকটের মাশুল শুধু রোহিঙ্গাদেরই দিতে হচ্ছে না, কক্সবাজারের স্থানীয় আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর ওপরও এর তীব্র প্রভাব পড়ছে।
দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও হতাশা নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ ও নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর মধ্যে মানব পাচার, অবৈধ অভিবাসী পাচার, মাদক পাচারসহ বিভিন্ন ধরনের আন্তর্দেশীয় অপরাধ রয়েছে। এমনকি অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় করে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে পাড়ি দিচ্ছেন। একটি দেশে অমীমাংসিত থেকে যাওয়া এই সংকট পুরো অঞ্চলের জন্যই নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে।
মানবিক সহায়তার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রয়োজন যত বাড়ছে, মানবিক সহায়তার জীবনরেখা ততই সংকুচিত হচ্ছে। ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় (জেআরপি) ৯৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি সহায়তার আবেদন করা হলেও ২০২৬ সালের জন্য তা কমিয়ে প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে, যা দিয়ে কেবল ন্যূনতম জীবন রক্ষাকারী প্রয়োজন মেটানো সম্ভব।
‘এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে না’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের পাশে অব্যাহতভাবে দাঁড়ানো আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানান এবং বর্তমানে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে বলে উল্লেখ করেন।
রাখাইন রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গারা এখনো নির্বিচার আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ, জোরপূর্বক শ্রম, নিরাপত্তাহীনতাসহ নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং ‘আরাকান আর্মি’—উভয়ের বিরুদ্ধেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ কারণে সেখানে এখনো নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি হয়নি।
আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন শুধুই সহমর্মিতা না দেখিয়ে সংকটের মূল কারণ চিহ্নিত করে সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে। প্রতিশ্রুতি থেকে কার্যকর পদক্ষেপে এবং বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা থেকে এই বাস্তুচ্যুতির অবসানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।

